সন্ধ্যা নাগাদ ককরোচ আন্দোলনের বহু নেতা আটক হয়েছেন।
সন্ধ্যা নাগাদ ককরোচ আন্দোলনের বহু নেতা আটক হয়েছেন।

মতামত

ঢাকার সঙ্গে দিল্লির ছবির এত মিল কেন

দশ মিনিট পর পর নতুন আপডেট। ঘটনার পর ঘটনা। আটকের পর আটক। শনিবার সকালে ধ্রুব রাঠিকে দিয়ে শুরু। এরপর পর অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কার। এরপর নেহা বোরা।

সন্ধ্যা নাগাদ ককরোচ আন্দোলনের বহু নেতা আটক হয়েছেন। আটক হয়েছেন তৃণমূলে কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আটক হয়েছেন আম আদমির কেজরিওয়াল। আটক হয়েছেন সাত হাজারের কাছাকাছি ‘ককরোচ’। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নেহা বোরাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের যন্তর-মন্তরে যাওয়ার কথা ছিল। ১৩ কোটির বেশি নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বেআইনিভাবে বাদ দেওয়া সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে গারদে পোরার দাবি তুলে তাঁরাই এখন মোদির গারদে।

‘দিল্লি এখন দুর্গ, আর সারা দেশ এক কয়েদখানা’—রাহুল গান্ধীর এই কথার মধ্যে রাজনৈতিক চটকদারি আছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, দিল্লি এখন আক্ষরিক অর্থেই অবরুদ্ধ। সাধারণ লোকজন দিল্লিতে ঢুকতে বা বের হতে পারছেন না।

মেইল ট্রেন বন্ধ। মেট্রো রেল বন্ধ। বাস বন্ধ। ধরপাকড় চলছে। ১৬৩ ধারা জারি রয়েছে। বিশাল এলাকা জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ।

মোদি সরকার এমন মারমুখী কেন?—সরকারের দিক থেকে এর কোনো জবাব নেই।

যাঁরা আন্দোলনের সঙ্গে, তারা দেশদ্রোহী—এই কথা বলছেন মোদি সরকার ও বিজেপি সমর্থকেরা। এরপরও জেনজি থামছে না।

তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন অভিভাবকেরা। সেলিব্রেটি ও বুদ্ধিজীবীরাও রাস্তায় নামছেন। ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়!’ স্লোগান উঠছে। দেয়ালে দেয়ালে কালির স্প্রে দিয়ে কম বয়সী ছেলেমেয়েরা স্লোগান লিখছে। গ্রাফিতি আঁকছে।

এই দৃশ্যপটে ইতিহাস-পুনরাবৃত্তির অনিবার্য দর্শন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে যা যা ঘটেছে, সেই ছবিগুলোই যেন কোনো অদৃশ্য বায়োস্কোপওয়ালা একটার পর একটা ভারতের প্রেক্ষাগৃহে দেখিয়ে যাচ্ছেন।

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এ পোস্ট দিয়ে এ কথা জানিয়েছেন।

ঢাকায় আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা নিয়ে। আর ভারতে শুরু হয় মেডিকেলের প্রশ্নপত্র বা নিট পেপার ফাঁস নিয়ে।

ছেলে মেয়েরা প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ করতেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভরা আদালতে আন্দোলনকারীদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলে বসেছিলেন।

এই গালিকেই প্রতিবাদের পরিচয় হিসেবে নিয়ে তরুণেরা নিজেদের ‘তেলাপোকা’ ঘোষণা করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) খুলে রাস্তায় নামল।

ঠিক যেভাবে বাংলাদেশে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখে ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের বাচ্চারা পাবে’ উচ্চারিত হওয়ার পর ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে অপমানের ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল তরুণেরা, একইভাবে ভারতের জেনজিরা এখন নিজেদের বলছেন, ‘ককরোচ’।

বিক্ষোভের মুখে মোদির অতি ঘনিষ্ঠ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দেওয়ার পর তেলাপোকারা তাৎক্ষণিকভাবে যার যার ডেরায় ফিরলেও তাদের ‘উৎপাত’ একদম শেষ হয়ে গেছে, এমনটা সম্ভবত মোদি সরকারের কেউ ভাবেননি।

আবার এত শিগগিরই যে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের জালিয়াতির খবর আলোয় আসবে এবং তার পরপরই সদ্য আস্তানায় ফেরা তেলাপোকারা শুঁড় উঁচিয়ে দলে দলে রাস্তায় নামবে—এটিও কেউ আঁচ করতে পারেনি।

ককরোচের হাত থেকে দিল্লিকে ‘রক্ষা’ করতে সরকার যখন দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে বেকার তরুণদের ককরোচ বলে গালি দেওয়া সেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ শুক্রবার সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’

এখানেও আন্দোলনকারীদের ‘মাছি’ বলে প্রকারান্তরে তাদের উদযোগকে অতি তুচ্ছ বলে ‘রায়’ দেওয়া হয়েছে।

দিন শেষে এগুলো রাজনৈতিক ভাষা। রাজনৈতিক ভাষা যে কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথ বদলে দিতে পারে, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এবং ভারতের আজকের পরিস্থিতি তার বড় উদাহরণ।

আসলে কোনো এক রহস্যময় কারণে ক্ষমতার আসনে বসা মানুষ প্রায়শই ভুলে যান, শব্দেরও রাজনৈতিক জীবন রয়েছে।

তাঁরা ভুলে যান, একটি শব্দ উচ্চারণের মুহূর্তে শেষ হয়ে যায় না। তা মানুষের স্মৃতিতে ঢুকে পড়ে, ক্ষোভের সঙ্গে মিশে যায় এবং কখনো কখনো তা প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মতোই ভারতের ক্ষেত্রে এই সত্যটি এখন হাজির হয়েছে।

একইভাবে মোদি সরকারের দিক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও বিজেপির নেতারা মূল সমস্যা, অর্থাৎ জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির কথা বেমালুম চেপে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ইলন মাস্কের ফান্ডিং ও পশ্চিমা ডিপ স্টেটের সহায়তা দেওয়ার কথা সামনে আনছেন।

তবে এই আন্দোলনগুলো নেহাত ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়, এটি মূলত মানুষের অস্তিত্বের মর্যাদা রক্ষার চিরন্তন সংগ্রাম।

রাষ্ট্র যখন মানুষের মৌলিক সত্তাকে অস্বীকার করে, আইনের মুখোশ পরে নাগরিকের স্বাধীন ইচ্ছাকে শেকলে বাঁধতে চায়, তখন সমাজের গভীরে এক অমোঘ স্ফুলিঙ্গ জমা হতে থাকে।

তখন স্বৈরাচারী শাসন যতই বুলেট, কারফিউ আর ইন্টারনেটের ব্লকেড দিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাক না কেন, গণমানুষের জলোচ্ছ্বাসের সামনে কৃত্রিম দুর্গগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে।

বাংলাদেশে আন্দোলন যখন বাড়ছিল, তখন সে সময়কার সরকারি শিবির থেকে পুরো আন্দোলনকে বাইরের দেশগুলোর কারসাজি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল।

একইভাবে মোদি সরকারের দিক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও বিজেপির নেতারা মূল সমস্যা, অর্থাৎ জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির কথা বেমালুম চেপে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ইলন মাস্কের ফান্ডিং ও পশ্চিমা ডিপ স্টেটের সহায়তা দেওয়ার কথা সামনে আনছেন।

দিল্লিতে কী ঘটছে, তা বোঝার জন্য শুধু ধরপাকড় ও আটক মানুষের সংখ্যা গুনলে চলবে না। দেখতে হবে, কেন মানুষ রাস্তায় নামতে চাইছে, তাদের অভিযোগের উত্তর কীভাবে দেওয়া হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া মানুষের মনে কী ধরনের ধারণা তৈরি করছে।

কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার পুলিশ, প্রশাসন কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের শক্তির আরেকটি ভিত্তি হলো নাগরিকের আস্থা। সেই আস্থা একবার ক্ষয়ে যেতে শুরু করলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ধেয়ে আসে।

তখন ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের রাস্তা বন্ধ করা যায়, কিন্তু তাঁদের মনে জমে থাকা প্রশ্নকে একইভাবে আটকে রাখা যায় না।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের বর্তমান প্রতিবাদের তুলনা জরুরি হয়ে ওঠে।

দিল্লিতে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, দুটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, আন্দোলনের তাৎক্ষণিক দাবিও আলাদা। কিন্তু দুটি ঘটনার মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে।

সেটি হলো: তরুণদের অসন্তোষ একটি নির্দিষ্ট দাবি দিয়ে শুরু হলেও রাষ্ট্রের রিঅ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া সেই অসন্তোষকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপান্তরিত করতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আন্দোলন যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে, বিষয়টি শুধু কোটা নিয়ে ছিল না। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আন্দোলনের চরিত্রকেই এক সময় বদলে দিয়েছে।

যে প্রশ্নটি প্রথমে ছিল কোটার, সেটিই এক সময় ইনসাফ, নাগরিক মর্যাদা এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

তবে দিল্লির প্রতিবাদ দেশব্যাপী সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হবে কি না, তা এখনই বলা যাবে না।

কারণ সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা দৃশ্যত পেশাদারি কায়দায় আন্দোলনকারীদের সামাল দিচ্ছেন। বাংলাদেশের মতো সেখানে এখন পর্যন্ত হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে শুনিনি। তবে এত বড় দেশে এত জায়গায় একসঙ্গে চলা আন্দোলন যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছি না।

স্প্রে দিয়ে দেয়ালে লেখা হচ্ছে প্রতিবাদী স্লোগান।

২.

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের রাজনৈতিক সংকট আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো সরকারই সামাজিক ক্ষোভ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। তবে এই দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হুবহু এক ছিল না।

সব ক্ষেত্রেই সরকার পতন একই ধরনের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঘটেনি। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, সামাজিক আন্দোলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—একেক দেশে একেক মাত্রায় কাজ করেছে।

এ কারণে শুধু কয়েকটি দৃশ্যের মিল দেখে সব দেশের জন্য একই পরিণতি ধরে নিলে তা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে দেখার নামান্তর হবে।

তবু ইতিহাসের পাঠ বলছে, ক্ষমতা যখন নিজের সমালোচনাকে বিপদ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে।

প্রথম পথ হলো প্রশ্ন উঠলে তার জবাব দেওয়া, অভিযোগ তদন্ত করা, প্রয়োজনীয় সংস্কার করা এবং মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা। দ্বিতীয় পথ হলো প্রশ্নকারীদের মুখ চেপে ধরা, সমাবেশ সীমিত করা এবং বিরোধিতাকে নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা।

এই দ্বিতীয় পথটি কখনো তাৎক্ষণিকভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে, কিন্তু অভিযোগের মূল কারণ যদি না মেটানো হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকট থেকেই যায়।

যে সরকার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, সে প্রশ্নকে ভয় পায় না। যে প্রতিষ্ঠান নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে পারে, তাকে সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হয় না।

আর যে রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকারকে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি বলে স্বীকার করে, সে রাষ্ট্র জানে যে প্রতিবাদ সব সময় শত্রুতা নয়; অনেক সময় প্রতিবাদই রাষ্ট্রকে তার ভুল দেখিয়ে দেয়।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের মাটিতে মোদি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি। এটি তাঁর পলায়নপর মনোভাবের প্রকাশ নাকি নিজেকে উঁচু দেয়ালে ঘিরে রাখা এক অজেয় মহামানব হিসেবে প্রদর্শন করার চেষ্টা, সে প্রশ্নের মীমাংসা এখনো হয়নি।

চলমান আন্দোলন হয়তো শিগগিরই সেই প্রশ্নের জবাব সামনে হাজির করবে।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।

ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com

*মতামত লেখকের নিজস্ব।