মহিউদ্দিন আহমদের কলাম

১৩ নম্বর নির্বাচনের পথে দেশ 

১৯৭০ সালের মে মাসের পয়লা সপ্তাহ। বৈশাখের তাপপ্রবাহ চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ গরম। দু-এক দিনের মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন হবে। বেলা ১১টার দিকে দেখা গেল, একদল ছাত্র হুড়মুড় করে কলাভবনের করিডর দিয়ে দৌড়ে গেল। ঝটিকা মিছিল। তাদের কপালে লাল পট্টি। মুখে স্লোগান—দিকে দিকে দিচ্ছে নাড়া, মাও সে-তুংয়ের চিন্তাধারা; তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি; নির্বাচন নির্বাচন, বর্জন বর্জন। এরা একটি বিশেষ মতবাদের সৈনিক। তাদের গুরু বলেছেন, নির্বাচন হচ্ছে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা।

নির্বাচনে মুক্তি নেই, বিপ্লব করতে হবে। অনেকেই তাদের চেয়ে চেয়ে দেখল। তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না; কিন্তু যারা দৌড়ে গেল, তারা তো ঘেমেনেয়ে উঠেছে। তারা টিএসসিতে গিয়ে জমায়েত হলো। ছয় আনা দিয়ে কোকা–কোলা পাওয়া যায়। সেটি পান করে তারা কলিজা শীতল করল। কোকা–কোলার বোতল হাতে নিয়ে কেউ কেউ স্লোগানও দিল—মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক। 

এদিকে আরেক দল ছাত্র দ্রুতলয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাদের মাথায় সাদা টুপি। তারা স্লোগান দিচ্ছে সহশিক্ষা সহশিক্ষা, নাউজুবিল্লাহ নাউজুবিল্লাহ; তোমার আমার ঠিকানা, মক্কা আর মদিনা; বিশ্বকে দিচ্ছে নাড়া, বিশ্বনবীর চিন্তাধারা; পাকিস্তানের উৎস কী, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। 

সে বছর স্মরণকালের সবচেয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ডাকসু নির্বাচন হলো। এর আগে হলের কোটা থেকে ভিপি-জিএস ইত্যাদি হতো। এবার কোটা উঠে গেছে। সরাসরি ভোটে নির্বাচন।

কয়েক মাস পর জাতীয় নির্বাচন। সেখানেও বর্জনবাদীদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেল। একই ওয়াজ—নির্বাচন হচ্ছে বুর্জোয়াদের একটি ফাঁদ। নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তি নেই। সশস্ত্র বিপ্লব ঘটাতে হবে। এটা আমাদের শিখিয়েছেন চেয়ারম্যান মাও সে-তুং। অনেক ছাত্র ভুরু কুঁচকে বলে, মাও সে-তুং! তিনি কে?

মাওলানা ভাসানী বড় নেতা। তাঁর দলের নাম ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। সংক্ষেপে বলে ন্যাপ। তিনি নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছেন। তিনি কৃষকের দাবি আদায়ের জন্য অনেক বছর লড়াই করেছেন। কৃষকদের নিয়ে বড় বড় সমাবেশ করেন।

তাঁর নির্বাচনী মার্কা ধানের শীষ। নির্বাচনে তাঁর দলের অনেক মানুষ প্রার্থী হয়েছেন। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন—আসছে এবার নতুন দিন, ধানের শীষে ভোট দিন। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মার্কা নৌকা। তাদের মুখে স্লোগান—জয় বাংলা। হঠাৎ মাওলানার কী যে হলো! তিনি ঘোষণা দিলেন, নির্বাচনে যাবেন না। পল্টন ময়দানে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’। 

শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন, ফিসফাস। মাওলানা এ কথা কেন বললেন? এক দল বলছে, মাঠের অবস্থা ভালো না। চারদিকে নৌকার জোয়ার। সেই স্রোতে ধানের শীষ ডুবে যাবে। মুখ রক্ষা হবে না। তাই আগে থেকেই সরে যাওয়া ভালো। আরেক দল বলছে, মাওলানা তাঁর শিষ্য শেখ মুজিবুরের জন্য মাঠ ফাঁকা করে দিচ্ছেন। ভোট নষ্ট করতে চান না। পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এডিসি ছিলেন আরশাদ সামি খান। লোকে তাঁকে চেনে না। তাঁকে চেনাতে বলতে হয়—ইনি হচ্ছেন আদনান সামির বাবা। এ দেশে অনেক তরুণ আদনান সামির গানের ভক্ত।

ইতিমধ্যে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আরশাদ সামি অনেক দিন পর একটি বই লিখেছেন। তাতে তিনি গোমর ফাঁস করে দেন—নির্বাচন করার জন্য ইয়াহিয়া মাওলানাকে টাকা দিয়েছিলেন। পরে জানা গেল, টাকার ব্যাপারটা মাওলানা জানেন না। ইয়াহিয়া টাকা দিয়েছিলেন ঠিকই। শোনা যায় সে টাকা মেরে দিয়েছিলেন মাওলানার দলের সেক্রেটারি মশিউর রহমান। সে যা-ই হোক, বিপ্লবটা আর হয়নি। মহা ধুমধামে নির্বাচন হয়ে যায়। দেশের আকাশে তখন নতুন সূর্য শেখ মুজিবুর রহমান। দেশটা নকশালবাড়ি হয়ইনি। মক্কা-মদিনার পথেও যায়নি। তারপর অনেক ঘটনা ঘটে। কাঠখড় পোড়ে। মানুষ মারে আর মরে। পূর্ব পাকিস্তান হয়ে যায় বাংলাদেশ। 

দেশটা হুট করে স্বাধীন হয়ে গেল। দেশ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। আওয়ামী লীগ নামে একটি দল আছে। দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের একটি তালুক পেয়ে তারা দিশাহারা। পল্টনের মেঠো বক্তৃতা দিয়ে তো আর দেশ চালানো যায় না। তার ওপর আছে চুরিচামারি। শুরু হয়েছিল কম্বল চুরি দিয়ে, শেষের দিকে গোটা কয়েক ব্যাংক গিলে খেয়েছে। তারপর ভেগে গেছে। অতিভোজনের পর কলকাতা, দিল্লি, দুবাই, লন্ডন, টরন্টো আর ভার্জিনিয়ার ভিলায় আরামকেদারায় বসে ঢেকুর তুলছে।

দেশটা তো স্বাধীন হলো। তো চলবে কীভাবে? একসময় দেশের রাজা ছিল ইংরেজ। এ দেশে অনেকেই ইংরেজের রাজত্ব চায় না। তারা চায় হোম রুল, স্বরাজ, স্বাধীনতা। ইংরেজ রাজা বলেন, ‘তোমরা এখনো স্বাধীনতার যোগ্য হওনি। যখন সময় হবে, আমরাই তোমাদের স্বাধীনতা দিয়ে দেব।’

তারপর দেশ স্বাধীন হলো। ইংরেজ গেল। একে একে রাজা হলো গুজরাটি, পাঞ্জাবি আর পাঠান। আইয়ুব খান নামের এক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। তিনি বলতেন, দেশের মানুষের দুর্দশা দেখে আল্লাহপাক তাঁকে হেদায়েত করতে পাঠিয়েছেন। কাজটা কঠিন। কারণ, বাঙালির মধ্যে দেশপ্রেম নেই। তারা খালি বাংলা বাংলা করে। আইয়ুব খান একসময় ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর কলেজ ছিল লন্ডন শহর থেকে ৩২ মাইল দূরে স্যান্ডহার্স্ট নামের একটি ছোট শহরে। তিনি দেখেছেন, ব্রিটিশরা আসলেই রাজার জাত। তারা শিখিয়েছে, ঠিকমতো চাবকাতে না পারলে প্রজাদের বশে রাখা যায় না। 

আইয়ুব খানের পছন্দের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী। দেশের আলো-বাতাস তাঁর সহ্য হয়নি। তিনি থাকেন অক্সফোর্ডে। তিনি বাঙালিদের ওপর খুবই বিরক্ত। একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, বাঙালিরা নিজেদের দেখভাল করতে পারে না। তারা খুব ছোট মনের মানুষ। সব সময় দলাদলি করে। আইয়ুব খান বাঙালিদের নিয়ে খুব দুর্ভাবনায় আছেন। সাত কোটি বাঙালির মধ্যে মাত্র দুজনের মধ্যে দেশপ্রেম আছে—জব্বার খান আর মোনায়েম খান। এভাবে কি দেশ চলে?

দেশটা হুট করে স্বাধীন হয়ে গেল। দেশ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। আওয়ামী লীগ নামে একটি দল আছে। দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের একটি তালুক পেয়ে তারা দিশাহারা। পল্টনের মেঠো বক্তৃতা দিয়ে তো আর দেশ চালানো যায় না। তার ওপর আছে চুরিচামারি। শুরু হয়েছিল কম্বল চুরি দিয়ে, শেষের দিকে গোটা কয়েক ব্যাংক গিলে খেয়েছে। তারপর ভেগে গেছে। অতিভোজনের পর কলকাতা, দিল্লি, দুবাই, লন্ডন, টরন্টো আর ভার্জিনিয়ার ভিলায় আরামকেদারায় বসে ঢেকুর তুলছে।

আরেক দল আছে, তাদের মুখে একটিই কথা—আওয়ামী লীগ হটালে দেশ স্বর্গে পরিণত হবে। আওয়ামীরা দেশটাকে ‘হাবিয়া দোজখ’ বানিয়েছে। তাদের সরাতে পারলে এটা হবে ‘জান্নাতুল ফেরদাউস’; কিন্তু দেশটা আর জান্নাত হয় না। 

এভাবেই চলছে। হালের বলদ কথা না শুনলে, ডানে-বাঁয়ে উল্টাপাল্টা চললে পাচন দিয়ে পিটিয়ে তাকে সোজা পথে চালানো যায়। তারপরও বলদের খাইখরচ অনেক বেশি। কলের লাঙল এসে সব মুশকিল আসান করে দিয়েছে। তো দেশটা যারা চালায় তারা সবাই বুদ্ধিমান প্রাণী, মান্যগণ্য লোক; কিন্তু তারাও তো কথা শোনে না। তাদের বিদায় করা যায় কীভাবে—এই চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না। 

ইংরেজরা এ দেশে অনেক জিনিস আমদানি করেছিল। যেমন ব্লাউজ-পেটিকোট, শর্ট প্যান্ট-টাই, হারমোনিয়াম, এবিসিডি, শেক্‌সপিয়ার, রেলগাড়ি, ক্রিকেট আর ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র। তো সেই গণতন্ত্র দিয়ে দেশ চলছে দশকের পর দশক। তারপরও সেটি এস্তেমাল করা যাচ্ছে না। নির্বাচন হলে গণতন্ত্র পরিপুষ্ট হয়। দেশে একের পর এক ১২টা নির্বাচন হয়েছে। দেশের হাড়-পাঁজরে মাংস-চর্বি লাগেনি। ১২টা নির্বাচন সত্ত্বেও দেশের বারোটা বাজার বাকি নেই। আরেকটা হবে শিগগিরই।

বিপ্লবীরা আছে। ঢাকাইয়ারা বলে ‘ছুপা রুস্তম’। তারা মাঝেমধ্যে গা ঢাকা দিলেও সময়মতো উদয় হয়। তাদের কেউ কেউ হারানো দিনের গান শোনাচ্ছে, ‘নির্বাচন নির্বাচন, বর্জন বর্জন।’ কার মনে কী আছে কে জানে? চারদিকে শোরগোল। কারও মনে আশা, কারও মধ্যে হতাশা। আতঙ্কও ছড়াচ্ছে কেউ কেউ। এর মধ্য দিয়ে আমরা এক পা এক পা করে এগিয়ে চলেছি ১৩ নম্বর নির্বাচনের দিকে। নির্বাচনের একটি পথনকশাও ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল। এরপরও নির্বাচনটা না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে নির্বাচন হচ্ছে। তবে নির্বাচনটি হওয়া জরুরি।  

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক


* মতামত লেখকের নিজস্ব