আলীকদমে পাহাড়িপাড়ায় গাছ কেটে বন উজাড় করে ফেলছে চোরাচালানকারীরা। কিন্তু তাদের কাউকে ধরতে পারছে না বন বিভাগ ও প্রশাসন
আলীকদমে পাহাড়িপাড়ায় গাছ কেটে বন উজাড় করে ফেলছে চোরাচালানকারীরা। কিন্তু তাদের কাউকে ধরতে পারছে না বন বিভাগ ও প্রশাসন

মতামত

পাহাড়ে এত নিরাপত্তার মধ্যে বন উজাড় ও গাছ পাচার কীভাবে হয়

আলীকদমে সম্প্রতি পাড়াবন ধ্বংস করে গাছ পাচার ও বন প্রশাসনের অভিযান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়ে উঠেছে। আলীকদম-থানচি সড়কের ব্যাঙঝিরির পামিয়া ম্রোপাড়ার পাড়াবনের শতবর্ষী গাছগুলো পাচারকারীরা কেটে ফেলেছে।

কয়েকজন সাংবাদিকের পাড়াবন ধ্বংসের সংবাদ প্রকাশের পর বন বিভাগ ও প্রশাসনের কুম্ভকর্ণরা জেগে ওঠে। ঘটা করে তাঁরা অভিযানে গিয়ে কেটে ফেলা শতবর্ষী মা-গাছসহ কিছু গাছ জব্দ করেন। কিন্তু যথানিয়মে পাচারকারী কাউকে পাওয়া যায়নি। নাম-ঠিকানারও হদিস মেলেনি।

দুষ্টলোকেদের অভিমত: রহস্যময় এই পাচারকারীরা বহুস্তরের জন্য কামাইপুত্র। তাই গ্রেপ্তার দূরের কথা, কোনোকালে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। মাঝেমধ্যে ধরা পড়েন পেটের দায়ে কাজ করা গাছকাটা শ্রমিকেরা। আরও রহস্যজনক হলো সড়কে বন বিভাগসহ স্তরে স্তরে চেকপোস্ট রয়েছে, কিন্তু পাচারের সময় প্রাকৃতিক বনের গাছ ধরা পড়ে না। চেকপয়েন্টগুলো যেন বৃক্ষান্ধ।

গাছ পরিবহন করতে পাহাড়গুলো কেটে নতুন কাঁচা রাস্তা বানানো হয়েছে

পর্বতের মূষিক প্রসবের মতো এই রকম ঢাকঢোল পেটানো অভিযান আয়োজন প্রথম নয়। পার্বত্য অঞ্চলে বহুকাল ধরে বহু কারণে এটি একটি প্রচলিত প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন ধ্বংস ও গাছ পাচারবিরোধী অভিযানও এই প্রথম নয়। অনেক সময় হঠাৎ করে অতি উৎসাহী হয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের বাগানের গাছও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে বাগানিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। কিন্তু প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস ও মাতৃবৃক্ষ পাচারবিরোধী স্বতঃস্ফূর্ত অভিযান খুব একটা দেখা যায় না। শুধু সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশিত হলে অভিযানের হুড়োহুড়ি পড়ে।

পামিয়াপাড়ার মতো গাছ ধরা হয়, এমনকি মাঝেমধ্যে গাছ বহনের হাতিও ধরা পড়ে। জব্দ গাছ বন বিভাগ নিলামে বিক্রি করে। নিলাম ডাক নিয়েও আবার কথা ওঠে; পাচারের জন্য যে ব্যক্তি গাছ কেটেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনিই নিলাম পেয়ে যান। সবকিছু পারস্পরিক লাভালাভের হিসাব-নিকাশে হওয়ায় পাচারকারীরা বন বিভাগের রহস্যময় দৃষ্টিশক্তির বাইরে থাকেন। নিলামের পর অবৈধ গাছ বৈধকরণের পরিবহন পারমিট (টিপি) দেওয়া হয়। ওই টিপি হাতে পেয়ে অবৈধ গাছ পাচারকারী বৈধ কাঠ ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। তখন বৈধ কাঠ ব্যবসায়ী ও বন বিভাগ ভাই ভাই।

বৈধ টিপি দিয়ে নিলামের গাছের সঙ্গে আবার খিলাম, ঝিলাম বন উজাড় করে অবৈধ গাছ পাচার হয়ে যায়। পাহাড়ে এটি বন ধ্বংস ও গাছ পাচারের ইঁদুর-বিড়াল খেলার ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। এতে পাচারকারীদের পাচারের গাছ ধরা না পড়লে শতভাগ লাভ, ধরা পড়ে জব্দ হলে আরও বেশি লাভ। ইঁদুর-বিড়াল খেলার এই লাভের গুড়ে নানা প্রজাতির পিপীলিকাও দাঁত বসায়। এভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে বহুকাল ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরান অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলে তিন শ্রেণির বনভূমি রয়েছে। সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, সৃজিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল (প্রটেক্টেড ফরেস্ট) ও অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল (ইউএসএফ)। ব্যক্তিমালিকানা জমি ও সরকারি অবকাঠামোর জন্য ব্যবহৃত জমি ছাড়া সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বনভূমি। প্রশাসন ও বন বিভাগ বনভূমি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সম্মিলিতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে।

পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সড়কে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে চেকপোস্ট আছে। সড়কের যাতায়াতে সবকিছু দেখা হয়। এমনকি গাছ পরিবহনের যানবাহন পরীক্ষা করা হয়। জোত পারমিটের সঙ্গে বাগানের গাছের মিলিয়ে নেওয়া হয়। কোনো কিছুই চেকপোস্টের চোখ এড়িয়ে যায় না। কিন্তু কাটা ও পরিবহন নিষিদ্ধ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ কখন, কোন কোন সড়ক দিয়ে যায় হদিস মেলে না।

বিশাল বনভূমি নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থেই শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বনবাগানের গাছ ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহনের জন্য অনুমতিপত্র বা পারমিট প্রদান করা হয়। এটি জোত পারমিট বলা হয়। এই জোত পারমিটে ব্যক্তিমালিকানা বাগানের গাছ ছাড়া উল্লিখিত তিন শ্রেণির বনাঞ্চলের কোনো গাছ কাটা ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ব্রিটিশ আমল থেকে এই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

কিন্তু সর্বকালেই কমবেশি প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কেটে ধ্বংস করে গাছ পাচার হয়ে আসছে। সবচেয়ে বেশি বন ধ্বংস ও গাছ পাচার হয়েছে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি পরে। পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ হওয়ায় পাচারকারীরা অবাধে এবং প্রকাশ্যে পাচার করেছেন। তখন আওয়ামী লীগ সরকারের বন ও পরিবেশমন্ত্রী সাজেদা চৌধুরীর আত্মীয়স্বজন ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা বান্দরবানের মাতামুহুরী সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করেছে।

আলীকদম-থানচি সড়কের ব্যাঙঝিরির পামিয়া ম্রোপাড়ার পাড়াবনে গাছ কাটার ধুম পড়েছে ।

পরিবেশবিদদের মতে, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল প্রাকৃতিক উপায়ে জন্মে এবং প্রকৃত অর্থে সেটিই বন বোঝায়। সেখানে শত শত প্রজাতির ফল-ফুলের গাছ-বাঁশ ও লতাগুল্মের উদ্ভিদবৈচিত্র্যে পরিবেশের ভারসাম্য থাকে। ভারসাম্যমূলক পরিবেশ পানির উৎস জীবন্ত রাখে। প্রাকৃতিক বন থাকলে পানি থাকবে, পানি থাকলে প্রাণবৈচিত্র্য ভরপুর হয়ে উঠবে—এটিই প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের বাস্তুসংস্থানের শৃঙ্খলা। মানুষের সৃষ্ট বনে প্রকৃতির এই বাস্তুসংস্থানের শৃঙ্খলা থাকে না। তাই মানুষের সৃষ্ট বনকে বৃক্ষখামার অথবা বড়জোর বনবাগান বলা যেতে পারে।

বন অধিদপ্তর ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথভাবে ২০২৪ সালে পরিচালিত জাতীয় বৃক্ষ ও বন জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট প্রাকৃতিক বনের ৪০ শতাংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় রয়েছে। এই বিশাল বনাঞ্চলের মধ্যে পাড়াবনের অবদান অত্যধিক। পাড়াবন হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাড়া বা গ্রামসংলগ্ন এলাকায় ঐতিহ্যগতভাবে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। এনজিও ভাষায় ভিলেজ কমন ফরেস্ট (ভিসিএফ) বলা হয়।

ইউএনডিপির এক গবেষণায় তিন পার্বত্য জেলায় এখনো টিকে থাকা ৩৮৫টি পাড়াবনে ৪৫ হাজার ৬ একর প্রাকৃতিক বনাঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চয় সম্প্রতি পাচারের কবলে পড়া আলীকদমের পামিয়াপাড়ার পাড়াবনটি রয়েছে।

গবেষণায় পাড়াবনকে পাহাড়ে শত বছরের ঐতিহ্যগত একটি ভালো লোকজ চর্চা উল্লেখ করে বলা হয়। পাড়ার আশপাশে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থাকলে পাড়ার পানির উৎস ধরে রাখে এবং পানি থাকলে পাড়া স্থায়িত্বশীল হয়। গাছ পাচারে প্রাকৃতিক বন উজাড় হওয়ায় পাহাড়ে পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আগামী কয়েক দশকে শুধু পানির সংকটে বহু পাড়া উচ্ছেদ হবে।

কথা হচ্ছে, পরিবহন দূরের কথা, কাটাও নিষিদ্ধ প্রাকৃতিক বনের গাছ না হয় চুপিসারে কাটা হলো। কিন্তু পাচারকারীরা ওই গাছ কি আকাশ পথে পাচার করে নিয়ে যায়? হেলিকপ্টারে, কার্গো বিমানে? যদি তা না হয়, তাহলে সড়কপথে পাচার হয়।

বিভিন্ন প্রজাতির গাছের গায়ে শুধু মেশিন করাতের দাগ

প্রশ্ন সেখানেই, পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সড়কে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে চেকপোস্ট আছে। সড়কের যাতায়াতে সবকিছু দেখা হয়। এমনকি গাছ পরিবহনের যানবাহন পরীক্ষা করা হয়। জোত পারমিটের সঙ্গে বাগানের গাছের মিলিয়ে নেওয়া হয়। কোনো কিছুই চেকপোস্টের চোখ এড়িয়ে যায় না। কিন্তু কাটা ও পরিবহন নিষিদ্ধ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ কখন, কোন কোন সড়ক দিয়ে যায় হদিস মেলে না।

অনেক ব্যবসায়ী অসমর্থিতভাবে বলেন, পারমিটের ব্যবসায় লাভ নেই, তা নয়, কিন্তু কম। পারমিট ছাড়া প্রাকৃতিক বনের গাছ পাচার ব্যবসাতেই লাভ বেশি। ধরা না পড়লেও লাভ, ধরা পড়লে আরও বেশি লাভ।

  • বুদ্ধজ্যোতি চাকমা প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি

মতামত লেখকের নিজস্ব