মতামত

স্বাস্থ্য খাত নয়, স্বাস্থ্য হোক রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার

একসময় আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বড় রূপকল্প বা ভিশন ছিল ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ (ইউএইচসি) নিশ্চিত করা। ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ পরিকল্পনার আলোচনাতেও এ লক্ষ্য বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল কথা—দেশের প্রতিটি নাগরিক আর্থিক সংকটে না পড়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পাবেন; যখন যেখানে প্রয়োজন, ঠিক তখনই পাবেন।

কিন্তু বাস্তবতা কী? আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে ‘পিস-মিল’ বা জোড়াতালির বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের অভাব কখনোই ছিল না। কখনো হঠাৎ বিপুল বাজেটে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয় (যা পরে কারিগরি দক্ষতার অভাবে ধুলাবালু মেখে পড়ে থাকে), কখনো বিশাল ভবন তোলা হয়, আবার কখনো সাময়িক কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সংকট হলো, এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলো কোনো সুদূরপ্রসারী ‘কৌশলগত রূপকল্প’ বা সমন্বিত মহাপরিকল্পনার অংশ নয়। ফলে রাষ্ট্রের তহবিল খরচ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেটের নিজস্ব ব্যয় কমছে না, চিকিৎসার মান নিয়েও আস্থার সংকট কাটছে না।

কেবল চিকিৎসা অবকাঠামো বা ‘স্বাস্থ্য খাত’ নিয়ে পড়ে না থেকে যদি সামগ্রিক ‘স্বাস্থ্য’ ও সুস্থতাকে রাষ্ট্রের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং সুনির্দিষ্ট ৯টি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো, এই রূপান্তর বা মহাপরিকল্পনা শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা এককভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, খাদ্যে ভেজাল রোধ, পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরি, পুষ্টিনিরাপত্তা কিংবা স্বাস্থ্যবিমা চালুর মতো বিষয়গুলো খাদ্য, স্থানীয় সরকার, অর্থ, বাণিজ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

১. ৩০ মিনিটের ‘অ্যাকসেস রুল’ (ভৌগোলিক ম্যাপিং)

যেখানে-সেখানে অপরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে তোলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ভৌগোলিক ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তের একজন নাগরিক সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের যাতায়াত দূরত্বের মধ্যে একটি মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পান। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এই সময়সীমাকে ১৫ মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকতে হবে।

২. বৈশ্বিক মানদণ্ড ও ঝটিকা পরিদর্শন

চিকিৎসাসেবার মান শুধু কাগজে-কলমে বা নীতিমালায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একটি স্বাধীন ‘কোয়ালিটি এনশিওরিং অথরিটি’ বা মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিত হাসপাতালগুলোয় আকস্মিক পরিদর্শন করবে। অবহেলা, গাফিলতি বা নিম্নমানের সেবার প্রমাণ পেলে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. রোগ নির্ণয় ও ওষুধের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ

ল্যাবরেটরি টেস্ট বা রোগ শনাক্তকারী পরীক্ষাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা এবং বাজারে প্রচলিত প্রতিটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও থেরাপিউটিকসের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নকল, ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ প্রস্তুতকারকদের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি।

৪. খাদ্যে ভেজালে ‘জিরো টলারেন্স’

অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে মানুষ যেন অসুস্থই না হয়, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি। খাদ্যে ভেজাল এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করতে হবে। কারণ, অনিরাপদ ও দূষিত খাদ্যই এ দেশের সিংহভাগ দীর্ঘমেয়াদি রোগের মূল উৎস।

৫. মা ও শিশুর জন্য ‘ফুড স্ট্যাম্প’ (পুষ্টিনিরাপত্তা)

একটি সুস্থ ও মেধাবী প্রজন্মের ভিত্তি তৈরি করতে গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের পুষ্টির দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় কেবল নগদ অর্থ ভাতা হিসেবে না দিয়ে, সুনির্দিষ্ট পুষ্টিকর খাদ্য (যেমন দুধ, ডিম, আয়রন-ফর্টিফাইড চাল) পাওয়ার জন্য ‘ফুড স্ট্যাম্প’ বা পুষ্টি কার্ডের ব্যবস্থা করা দরকার। এটি অপুষ্টিজনিত রোগের ভবিষ্যৎ আর্থিক বোঝা এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমিয়ে দেবে।

৬. সুস্থ লাইফস্টাইল ও উপযুক্ত পরিবেশ

শুধু নতুন হাসপাতাল ভবন বানালেই স্বাস্থ্যের উন্নয়ন হয় না। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নাগরিকদের যেমন উদ্বুদ্ধ করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকে তার অনুকূল পরিবেশ দিতে হবে। প্রতিটি নগর ও গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্ত পার্ক, জিমনেসিয়াম, খেলার মাঠ এবং হাঁটার উন্মুক্ত জায়গা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন মানুষ রোগ প্রতিরোধের সুযোগ পায়।

৭. বাধ্যতামূলক সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা

চিকিৎসা করাতে গিয়ে দেশের লাখো মানুষ প্রতিবছর দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এই পকেটের খরচ শূন্যে নামিয়ে আনতে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা চালু করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিজীবীদের জন্য নিয়োগকর্তার মাধ্যমে এবং সুবিধাবঞ্চিত বা সাধারণ নাগরিকদের জন্য সরকারি অর্থায়নে একটি টেকসই ‘ইউনাইটেড হেলথ ইনস্যুরেন্স’ মডেল দাঁড় করানো সম্ভব।

৮. ডিজিটাল হেলথ আইডি ও সেন্ট্রালাইজড রেকর্ড

ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে প্রতিটি নাগরিকের একটি ইউনিক ‘হেলথ আইডি’ এবং কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থাকতে হবে। এর ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তে ডাক্তার দেখালে বা হাসপাতালে গেলে রোগীর আগের সব প্রেসক্রিপশন ও টেস্ট রিপোর্ট এক ক্লিকেই চিকিৎসকের সামনে চলে আসবে। এতে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমবে এবং অপ্রয়োজনীয় টেস্টের পেছনে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা বাঁচবে।

৯. চিকিৎসা শিক্ষার মান ও পেশাগত নৈতিকতা রক্ষা

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ভুঁইফোড় মেডিক্যাল কলেজ বা নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোর মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; প্রয়োজনে মানহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে। দক্ষ ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষাক্রমে রোগীদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং পেশাগত নৈতিকতার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া দরকার।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের চাবিকাঠি

স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে, এত বড় কর্মসূচির অর্থায়ন হবে কীভাবে? বাস্তবতা হলো, জিডিপির তুলনায় আমাদের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বৈশ্বিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম। এই বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় স্বচ্ছতা এনে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তামাক, চিনিযুক্ত পানীয় বা প্রক্রিয়াজাত ক্ষতিকর খাদ্যের ওপর বিশেষ ‘স্বাস্থ্যকর কর’ আরোপ করে এবং স্বাস্থ্যবিমা প্রিমিয়ামের তহবিল সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।

তবে সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো, এই রূপান্তর বা মহাপরিকল্পনা শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা এককভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, খাদ্যে ভেজাল রোধ, পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরি, পুষ্টিনিরাপত্তা কিংবা স্বাস্থ্যবিমা চালুর মতো বিষয়গুলো খাদ্য, স্থানীয় সরকার, অর্থ, বাণিজ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

তাই এই মিশনকে দেখতে হবে পুরো স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ‘সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভিশন’ হিসেবে। রাষ্ট্রপ্রধানের সরাসরি রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রত্যক্ষ তদারকি ছাড়া এই আমূল সংস্কার অসম্ভব। সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কৌশলগত ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে আগামী ৫ বছরের মধ্যেই এই ভিশনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দৃশ্যমান ভিত্তি তৈরি করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

  • এ কে এম তারিফুল ইসলাম খান হেড অব কমিউনিকেশনস, আইসিডিডিআরবি

*মতামত লেখকের নিজস্ব। এই লেখার সঙ্গে লেখকের কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের কোনো সম্পর্ক নেই।