বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ও অন্যান্য সমস্যায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো বিরূপ প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ও অন্যান্য সমস্যায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো বিরূপ প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে।

মতামত

ঘর বাঁচলে জীবন বাঁচে, দারিদ্র্য কমে, মর্যাদাও বাড়ে

ঘর শুধু চার দেয়াল, আর একটি চাল নয়। ঘর মানে ঠিকানা। ঘর মানে নিরাপত্তা। ঘর মানে মর্যাদা। স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য ঘরই জীবনের প্রথম ভিত্তি। দারিদ্র্য আর অনিরাপদ ঘর একে অপরের সঙ্গে জড়িত। গরিব মানুষ দুর্বল ঘরে থাকে। বন্যা আসে, ঘূর্ণিঝড় আসে। ঘর ভাঙে। সঞ্চয় শেষ হয়। ঋণ বাড়ে। আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। এভাবেই দারিদ্র্যের চক্র চলতে থাকে।

আবাসন ঋণ ও জলবায়ু-সহনশীল বাসস্থানের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। এই চক্র ভাঙতে পিকেএসএফ তাদের সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে চারটি উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশে আবাসন ঋণের চাহিদা অনেক। কিন্তু ছোট অঙ্কের ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাংক দিতে চায় না। কারণ ঝুঁকি বেশি, লাভ কম। ব্যাংক চায় জমির দলিল ও বন্ধক। গরিব মানুষের তা থাকে না। ফলে নিজের সামান্য সঞ্চয়ে অল্প অল্প করে ঘর তোলেন তাঁরা। সেই ঘর হয় দুর্বল। অনেক সময় নির্মাণও অসম্পূর্ণ থাকে। পিকেএসএফ এই গ্যাপটি পূরণ করতে চেয়েছে। তাদের ঋণ সহজ শর্তের। বন্ধক লাগে না। মেয়াদ প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের তুলনামূলক দীর্ঘ, সুদের হার কম।

২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শুরু হয় ‘লো-ইনকাম কমিউনিটি হাউজিং সাপোর্ট প্রজেক্ট’ (এলআইসিএইচএসপি)। সাতটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ১৩টি শহরে আবাসন ঋণ দেওয়া হয়। ২০২১ সালের মে পর্যন্ত ১২ হাজার ২ জন সদস্য ২৫৫ কোটি টাকা ঋণ পান। ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ গেছে স্বল্প আয়ের পরিবারে (যাদের মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকা)। লক্ষ্য ছিল ৪০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মিশন প্রকল্পটিকে ‘অত্যন্ত সন্তোষজনক’ বলেছে। বাংলাদেশে এটি বিশ্বব্যাংকের দেওয়া সর্বোচ্চ রেটিং। মাঠের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। ঋণগ্রহীতাদের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। সন্তানের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ছোট ব্যবসার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এলআইসিএইচএসপির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পিকেএসএফ ২০১৯ সালে নিজস্ব তহবিলে চালু করে ‘আবাসন ঋণ’ কর্মসূচি। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৪২টি জেলার ১৬০টি উপজেলায় ৩২টি সহযোগী সংস্থার ৩৬০টি শাখা কাজ করছে। ৫২ হাজার ১৮৪টি পরিবার ঋণ পেয়েছে। বিতরণ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। এই টাকায় কেউ নতুন ঘর তুলেছেন। কেউ পুরোনো ঘর মেরামত করেছেন। কেউ ঘর বাড়িয়েছেন। ঘর পাকা হয়েছে, আলো-বাতাস ঢুকেছে, স্যানিটেশন ঠিক হয়েছে। রান্নাঘর উন্নত হয়েছে।

জলবায়ু ক্ষতি রক্ষায় আরও নিরাপদ ঘরের প্রয়োজন। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির অন্যতম শীর্ষ দেশ। উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা। উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন। সেখানে সাধারণ ঘর যথেষ্ট নয়। দরকার জলবায়ু-সহনশীল ঘর।

ঘর কী দারিদ্র্য কমায়? এ বিষয়ে পিকেএসএফ ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, ঘর পরিবারকে সমাজে পরিচিতি দেয়। দ্বিতীয়ত, ঘর নারীর ক্ষমতায়ন করে। নারী ঘরে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান। নিরাপদ ও নিরিবিলি ঘর তাঁর মর্যাদা রক্ষা করে। ঘরের মালিকানা বা যৌথ মালিকানা থাকলে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে। তৃতীয়ত, ঘর শিক্ষাকে সহায়তা করে। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকলে শিশুর পড়ার পরিবেশ উন্নত হয়। প্রতি বন্যায় বা সাইক্লোনে ঘর মেরামতে টাকা গেলে স্কুলের খরচে কম পড়ে, অনেক সময় থাকে না। চতুর্থত, ঘর স্বাস্থ্য রক্ষা করে। স্যাঁতসেঁতে ও ঘিঞ্জি ঘরে শ্বাসকষ্ট ও রোগ ছড়ায়। পঞ্চমত, ঘর একটি সম্পদ। গরিবের বড় সম্পদ প্রায়ই ঘর। এই সম্পদ থেকে গড়ে ওঠে আরও সম্পদ। ষষ্ঠত, ঘর কর্মসংস্থান তৈরি করে। রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায়ী আয় করেন। অনেকের ঘরই কর্মস্থল। সেখানে চলে সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন বা ছোট দোকান।

জলবায়ু ক্ষতি রক্ষায় আরও নিরাপদ ঘরের প্রয়োজন। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির অন্যতম শীর্ষ দেশ। উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা। উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন। সেখানে সাধারণ ঘর যথেষ্ট নয়। দরকার জলবায়ু-সহনশীল ঘর।

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) অর্থায়নে চলছে ‘রেজিলিয়েন্ট হোমস্টেড অ্যান্ড লাইভলিহুড সাপোর্ট টু দ্য ভালনারেবল কোস্টাল পিপল অব বাংলাদেশ’ (আরএইচএল) প্রকল্প। কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও কক্সবাজারের ২১টি উপজেলায়। ১৮টি সহযোগী সংস্থা এতে যুক্ত। লক্ষ্য ৩ হাজার বসতভিটা। প্রতিটি ঘরে উঁচু ভিটা, শক্ত কাঠামো, নিরাপদ স্যানিটেশন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ও উন্নত চুলা আছে। চারপাশে লাগানো হচ্ছে ঝড়-প্রতিরোধী গাছ। ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি গাছ এরই মধ্যে লাগানো হয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ৭ জেলায় ৫০ হাজারের বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেই সময় আরএইচএল ঘরে নিরাপদ ছিল ৭০০ পরিবার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ভূমিকম্পে প্রকল্পের ইটের ঘরের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানানো হয়েছে। ঘরের পাশাপাশি আছে আয় কর্মকাণ্ডে সহায়তা। উঁচু মাচায় ছাগল-ভেড়া পালন, লবণসহিষ্ণু সবজি চাষ, বস্তায় আদা চাষ ও কাঁকড়া চাষে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে ৬ হাজার ১৮৮ জন আদা চাষি প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয় করেছেন।

ইসিসিসিপি-ফ্লাড-মূল উদ্দেশ্য বন্যার বিরুদ্ধে উঁচু ভিটা। উত্তরাঞ্চলের বন্যা প্রবণ এলাকায় একই দর্শনে কাজ করেছে ইসিসিসিপি-ফ্লাড। জিসিএফ ও পিকেএসএফের মোট ১৩ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প চলেছে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও জামালপুরে। এখানে মূল কাজ ছিল ভিটা উঁচু করা। এলাকার আগের সর্বোচ্চ বন্যার উচ্চতার ওপরে ভিটা তোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৫৬৩টি ভিটা উঁচু করা হয়েছে। ভিটার ওপর বসেছে নলকূপ ও জলবায়ু-সহনশীল পায়খানা। ফলে সারা বছর নিরাপদ পানি মিলছে। একই সঙ্গে বন্যা-সহনশীল ধানের বীজ দেওয়া হয়েছে। চরে সবজি চাষের প্রশিক্ষণ হয়েছে। প্রায় ২ হাজার মাচা-ঘর তৈরি করে ছাগল-ভেড়া পালনে ঋণ দেওয়া হয়েছে। নারীপ্রধান পরিবার পেয়েছে অগ্রাধিকার। একই ধরনের সিসিসি প্রকল্পে ৫৭৫৯টি ভিটা উঁচু করা হয়েছে।

এখন আসছে নতুন সম্ভাবনা, আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ। এডিবি দিচ্ছে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ। এর মাধ্যমে পিকেএসএফ ও সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার পরিবার আবাসন ঋণ পাবে। তাদের অন্তত ৩২ হাজার নারী। অন্তত ২৪ হাজার ঋণগ্রহীতা থাকবেন দুর্যোগ-প্রবণ এলাকায়। ঋণ হবে বন্ধক ছাড়া ও দীর্ঘমেয়াদি। নারীর আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বামী-স্ত্রী যৌথ উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হবে।

এই চার উদ্যোগ একটি বিষয় প্রমাণ করে। আবাসন শুধু অবকাঠামো নয়। এটি দারিদ্র্য বিমোচনের পথ। একটি ঘর একসঙ্গে নিজস্ব পরিচয়, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্পদ ও কর্মসংস্থান গড়ে তোলে। জলবায়ু-সহনশীল ঘর সেই অর্জনকে দুর্যোগের হাত থেকেও বাঁচায়। আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়নে তারপরও রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। চাহিদার তুলনায় তহবিল কম। নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছে। জলবায়ুর ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই চাই আরও উপযুক্ত বিনিয়োগ। চাই সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও সহযোগী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগ।

নিরাপদ ঘর পেলে একটি পরিবার শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই পায় না, সে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসও পায়।

  • ড. একেএম নুরুজ্জামান সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক, পিকেএসেফ