মতামত

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন: তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা

তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের দুই হাত ওঠা, তারপর এক হাত নেমে যাওয়ার কসরত বানরের জন্য আনন্দের নাকি বিরক্তিকর—সেটা আমরা জানি না, তবে আমাদের অনেকের জন্য শৈশব-কৈশোরে পাটিগণিতের এই ধাঁধা ছিল চরম পীড়াদায়ক। বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হালও যেন ওই বানরের মতোই। গণিতের সমাধানে বানরকে শেষমেশ বাঁশের মাথায় পৌঁছাতে হয়, কিন্তু মানবাধিকার কমিশন বরং নামতে নামতে এখন ‘ভূপাতিত’ হওয়ার দশা।

বর্তমান সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে পাস করা অধ্যাদেশটি বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত আইনে ফিরে গেছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কমিশন সদস্যদের পদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রহিত হয়ে গেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। অন্যদিকে কোনো কোনো আইনজ্ঞ মনে করেন, কমিশনের সদস্যদের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে কমিশন সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে বলা হয়েছে। পদত্যাগ করে তাঁরা সরকারের প্রতি একটি খোলাচিঠিও লিখেছেন। (প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০২৬)

এই চিঠিতে কমিশন সদস্যরা অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করে আনা বিল সংসদে উপস্থাপনের সময় সরকারের পক্ষ থেকে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন, যুক্তি দিয়েছেন যে সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে যে আপত্তিগুলো উত্থাপিত হয়েছে, তার উদ্দেশ্য মানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করা। সবশেষে তাঁরা ২০০৯ সালের আইন পুনর্জীবিত নয়, বরং আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডায় কখনোই ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনের দাবি জানিয়ে আসছিল। সঙ্গে ছিল কিছু উন্নয়ন সহযোগীর সহযোগিতা। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে এবং একটি মানবাধিকার কমিশনও গঠন করে।

এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার আগের অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের অধীনে মানবাধিকার কমিশন গঠন হয় ২০১০ সালে। এতে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান আইনের অধ্যাপক ড . মিজানুর রহমান। তিনি দুই দফায় ছয় বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর তাঁর কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য সাবেক আমলা রিয়াজুল হক চেয়ারম্যান হন।

এরপর থেকে চেয়ারম্যানের পদটি স্থায়ীভাবে আমলাদের দখলে চলে যায়। মানবাধিকার কমিশন হয়ে পড়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের ‘রিটায়ারমেন্ট রিওয়াডর্স’। আওয়ামী সরকারের আমলের সর্বশেষ চেয়ারম্যান মানবাধিকার কমিশনে আসার আগে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব। মানবাধিকার কমিশনের চিঠির জবাব না দেওয়া, তাদের সুপারিশের তোয়াক্কা না করার শীর্ষে ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে যখন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়, তখন সরকার কেমন মানবাধিকার কমিশন দেখতে চায়, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এ কথা অবশ্যই বলা যায়, ২০০৯ সালের আইনে প্রত্যাবর্তনে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক। সরকার অবশ্য বলছে, এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ। তারা আরও ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা করে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করবে। বারবার বিশ্বাসভঙ্গের শিকার মানবাধিকারকর্মীরা স্বাভাবিক কারণেই এ কথায় তেমন আস্থা রাখতে পারছেন না।

২০০৯ সালের আইন বনাম অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ

২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে অনেক মৌলিক এবং গুরুতর সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রথমত বাছাই কমিটির গঠন। স্পিকারের নেতৃত্বে বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছে, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সদস্য। অর্থাৎ সাত সদস্যের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যরাও সরকারের পছন্দের ব্যক্তি।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে বাছাই কমিটিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমিয়ে আনা হয়। আট সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয় প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারকে, সদস্য করা হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি ও বিরোধী দল থেকে একজন করে সংসদ সদস্য, একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি, একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং একজন আদিবাসী (ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী) প্রতিনিধি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই অধ্যাদেশের প্রথম গেজেট প্রকাশের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে আরেকটি সংশোধনী এনে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০০৯ সালের আইনের দ্বিতীয় দুর্বলতা ছিল কমিশনের ক্ষমতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কমিশনের ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এ ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং বলা হয়, অনুসন্ধান বা তদন্ত শেষে কমিশন শাস্তির পরিমাণ, ক্ষতিপূরণ বা প্রশাসনিক আদেশ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারবে।

২০০৯ সালের আইনের তৃতীয় সীমাবদ্ধতা ছিল কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা। কমিশনের বাজেট ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এবং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা স্বাধীন ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

২০০৯ সালের আইনের এমন দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিক ফোরাম গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কখনোই ‘এ’ স্ট্যাটাস দেয়নি। কমিশন প্রথম ২০১১ সালে আবেদন করে ‘বি’ স্ট্যাটাস পায়। পরে ২০২১ সালে ‘এ’ স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য পুনঃ আবেদন করলেও তাদের ‘বি’ স্ট্যাটাসেই রাখা হয়।

২০০৯ সালের আইনের দুর্বলতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি অবশ্যই বেশ ভালো ছিল। কিন্তু একটি স্বাধীন, শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠনের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকারও প্রশ্নাতীত ছিল না। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের ৭ নভেম্বর পূর্ববর্তী কমিশনের সব সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সুযোগ ছিল ব্যাপকভিত্তিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ২০০৯ সালের আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা। কিন্তু সেটা না করে তারা সামান্য একটা সংশোধনী আনে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর মাধ্যমে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বাছাই কমিটির অন্য কোনো সদস্যের সভাপতিত্ব করার সুযোগ রাখা হয়।

হঠাৎ নিয়োগ ও ‘বিদায়’

প্রায় এক বছরের বিরতির পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং এক মাসের কম সময়ের মধ্যে তাতে সংশোধনী এনে বাছাই কমিটিতে আমলাতন্ত্রের অবস্থান জোরদার করা হয় এবং কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতাও সংকুচিত করা হয়। এরপর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে নতুন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় এক বছর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে মানবাধিকার কমিশনে নতুন সদস্যদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি ছিল বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রাজনৈতিক সরকারগুলো তো বটেই, অন্তর্বর্তী সরকারও তাদের সন্দেহাতীত অঙ্গীকার দেখাতে পারেনি। কিন্তু এ কথা অবশ্যই বলা যায়, ২০০৯ সালের আইনে প্রত্যাবর্তনে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক। সরকার অবশ্য বলছে, এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ। তারা আরও ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা করে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করবে। বারবার বিশ্বাসভঙ্গের শিকার মানবাধিকারকর্মীরা স্বাভাবিক কারণেই এ কথায় তেমন আস্থা রাখতে পারছেন না।

  • সাঈদ আহমদ মানবাধিকারকর্মী ও সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের ব্যুরো মেম্বার

*মতামত লেখকের নিজস্ব