কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা বাজারের পাশে গিরাই নদ
কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা বাজারের পাশে গিরাই নদ

মতামত

লুট হওয়া গিরাই নদ বেচাকেনার ধুম

প্রবহমান নদ গিরাই। সিন্দুরমতী, বেড়াকুটি, ধরধরা, ভেরভেরী, সিংগীমারী, ছোট ধনী, বড় ধনী, কোটলডাঙ্গা, হাড়িয়ারডারা, পানাকুড়ি, বাগডাঙ্গা নদীর পানি নিয়ে গিরাই নদ প্রবাহিত হয়। অবিশ্বাস্যভাবে এ নদ নিয়মিত বেচাকেনা হচ্ছে!

আইন অনুযায়ী, নদীর শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ না থাকলেও সরকারিভাবে যাঁদের ওপর নদী রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা নদীর শ্রেণি পরিবর্তন করে দিয়েছেন।

নিয়মিত এই নদ থেকে খাজনাও গ্রহণ করা হয়। যতবার বিক্রি হয়, ততবারই নামজারিও হয়। অথচ সিএস রেকর্ড মূলে নদটি ব্যক্তির নামে লিখিত হওয়াই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ঘটনা কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলায়।

নদটি যাঁরা বেচাকেনা করেন—এমন কয়েকজন অবৈধ দখলদারকে দেখলাম, তাঁরা প্রশাসনের প্রতি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছেন। তাঁদের ভাষ্য, ‘প্রশাসনের লোক তো আমাদের খাজনা নেন, নামজারি করে দেন। বেচাকেনায় তো কোনো অসুবিধা নেই।’ ‘নদীর জমি বিক্রি আইনগতভাবে পারা যায় না’—এমন কথা আমি বললে একজন উল্টো শোনালেন, ‘এসি ল্যান্ডের কথা বিশ্বাস করব, না আপনার কথা বিশ্বাস করব?

সিএস রেকর্ডে গিরাই নদ

ইউএনও, ডিসি—সবাই জানে। আজ কি আমরা নতুন খাচ্ছি! বছরের পর বছর ধরে এই নদ বেচাকেনা হচ্ছে, নামজারি হচ্ছে। সরকার তো কোনো দিন বলেনি খাজনা নেবে না!’ প্রবাদ আছে, ‘বেড়ায় খেত খায়।’ অবস্থা সে রকমই হয়েছে। নদী যাঁদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব, তাঁদের দ্বারাই নদীর ক্ষতি হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার পশ্চিম নাগেশ্বরী মৌজা ম্যাপ দেখলাম। সিএস রেকর্ডে ম্যাপে গিরাই নদ দেখালেও আরএস রেকর্ডে সেখানে নদের কোনো অস্তিত্ব নেই। মানচিত্র দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় নদের দুই পাশের সীমানা। কিন্তু সম্পূর্ণ নদেই অসংখ্য দাগ কাটা। অর্থাৎ এই একেকটি দাগ একেকটি অংশে পরিণত হয়েছে।

গিরাই নদটির উৎস রামখানা ইউনিয়ন। ছোট ধনী, বড় ধনী ও বেড়াকুটি নামের তিনটি নদ–নদী মিলিত হওয়ার পর গিরাই নাম নিয়ে ভাটিতে প্রবাহিত হয়েছে। ছোট ধনী নদী এখানে মিলিত হওয়ার আগে ধরধরা, ভেরভেরী, সিংগীমারী ও সিন্দুরমতী নদীর পানি গ্রহণ করেছে। গিরাই নামে প্রবাহিত হওয়ার পর ফুলবাড়ী–নাগেশ্বরী সড়কে গাগলা বাজারের উত্তরে গিয়ে নদটি দুই ভাগে ভাগ হয়। বাঁ অংশ পূর্ব-দক্ষিণে এবং ডান অংশ পশ্চিম–দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। 

বিএস রেকর্ডে গিরাই নদ

নেওয়াশী ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে গিরাই নদের ডান প্রবাহ হাড়িয়ারডারা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আমি সেই মিলিতস্থানে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকজন অবৈধ দখলদারের সঙ্গে দেখা হয়। মহর আলী তাঁদেরই একজন। তাঁর কয়েক বিঘা জমি আছে নদীতে। তাঁর বাবা কিনেছেন এই জমি।

মহর আলীর পাশেই ছিলেন ওই গ্রামের কবির হোসেন। তিনি বললেন, ‘১৯৯০ সালের দিকে এখানে বড় বড় নৌকা এসেছিল গুদামঘরের গম-চাল নেওয়ার জন্য। আমরা বড় বড় নৌকা আসতে দেখেছি।’ একজন সেখানে মাছ ধরার জন্য জাল নিয়ে বসে ছিলেন। তাঁর কাছে শুনলাম, এখনো ওই নদে প্রচুর দেশি জাতের মাছ আছে। বহুদিন পরে সেখানে খলিশা মাছ দেখলাম। মেনি মাছও আছে সেখানে। বিলুপ্তপ্রায় কিছু মাছ সেখানে এখনো টিকে আছে।

গিরাই নদের উৎসস্থলেও গিয়েছিলাম। সেখানে নদের পাড়ে গাছের ঘন ছায়ায় টঙে বসে বাতাস খাচ্ছিলেন প্রবীণ আকবর আলী। তাঁর সঙ্গে নদী নিয়ে অনেক কথা হলো। তিনি জানালেন, ভাটিতে বড় ধনী নদী দখল হওয়ার কারণে পূর্বের পথে আর নদীটি সচল নেই। এ জন্য গিরাই নদ দিয়েই এর প্রবাহ টিকে আছে। তাঁর কাছে আরও জানলাম, ওই এলাকায় নদের মোট আয়তন ৮০ একর।

ব্যক্তির নামে গিরাই নদ দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করা হোক। দেশে যে নদী উদ্ধারে সরকার তৎপর, তার দৃষ্টান্ত অন্তত হাজির করা জরুরি। যাঁরা এ নদ অন্যের নামে লিখে দিয়েছেন, খাজনা নেন, নামজারি করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যদি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে দেশের কোনো নদী রক্ষা হবে না।

সেই ৮০ একরের মধ্যে যাঁদের জমির সঙ্গে নদী লাগোয়া, তাঁদের নামে নাকি পত্তন হয়েছে। কীভাবে হয়েছে, সেটি তিনি পরিষ্কার বলতে পারলেন না। কেবল বললেন, যাঁর জমির পাশে নদ, তাঁরা অনেকটা অংশ নিজেরা ভোগ করেন। এভাবে প্রায় ৪০ একর জমি চলে গেছে ব্যক্তির নামে। আর চল্লিশ একর সরকার লিজ দেয়। যখন যে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই দলীয় লোকজন লিজ নেন। বড় ধনী নদীতে দেখলাম বড় বড় পুকুরও তৈরি হয়েছে। ব্রিজ–সংলগ্ন পুকুরও আছে একটি।

গিরাই নদের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত পশ্চিম নাগেশ্বরী মৌজায় হবিবর রহমানের ছেলে তরুণ বয়সী ইয়াছিনের সঙ্গে কথা হয়। ইয়াছিনের বাবা ৩০ শতক নদ কিনেছেন। তারপরও ইয়াছিনের ভাষ্য, ‘নদী বেচাকেনা হওয়া ঠিক নয়।’

নদের পাশ ঘেঁষে কয়েকটি বাড়ি চোখে পড়ল। অনেকে জানালেন, সব কটি বাড়ি নদেই গড়ে উঠেছে। এই গিরাইয়ের পাশে কয়েকজন নারী-পুরুষ আমার কাছে বিষয়টি বুঝতে চান। আমি তখন সিএস রেকর্ড আর আরএস রেকর্ডের ম্যাপ তাঁদের দেখালে একজন নারী বলেন, ‘নদীটার তো আর কিছুই বাকি নাই। এলা কী হইবে?’ সেখানেই জানতে পারি, পাশেই যে কোটলডাঙ্গা নদী আছে, সেই নদীও নাকি মানুষের নামে লিখিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নে গিরাই নদ

গাগলা বাজারের কাছে নদী যেখানে দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, সেখানে নাকি একজন ব্যক্তি ২৫ বিঘা জমির মালিক হয়েছেন। অনেকে বললেন, তিনি নিজের অংশে সরকারকে খনন করতে দেননি।

এ নদীর দখলপ্রক্রিয়া দেখে মনে হলো বিশেষ প্রভাবশালী কেউ নদীটি লিখে নেয়নি। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার), এসি ল্যান্ড এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারা এ নদী ব্যক্তির নামে লিখে দিয়েছেন। যেহেতু নদী বিক্রি করার আইনি অধিকার নেই, তাই হয়তো কোনো যোগসাজশে অন্যের নামে লিখিত হয়েছে। তহশিলদার, এসি ল্যান্ড কিংবা তাঁদের নিয়ন্ত্রণকারী কোনো কর্মকর্তা ছাড়া দেশের অন্য কোনো পেশার কেউ এ কাজ করেননি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে অনুরোধ জানাই, ব্যক্তির নামে গিরাই নদ দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করা হোক। দেশে যে নদী উদ্ধারে সরকার তৎপর, তার দৃষ্টান্ত অন্তত হাজির করা জরুরি। যাঁরা এ নদ অন্যের নামে লিখে দিয়েছেন, খাজনা নেন, নামজারি করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যদি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে দেশের কোনো নদী রক্ষা হবে না।

নদীর সর্বনাশের সঙ্গে যাঁরা জড়িত থাকেন, তাঁদের যদি জবাবদিহির আওতায় আনা যেত, তাহলে তাঁরা নদী সুরক্ষায় দায়িত্বশীল হতেন। দেশব্যাপী নদীর সর্বনাশকারীরা নিরাপদে থাকেন বলেই নদীর সর্বনাশ ক্রমাগত বাড়ছেই। নদী সুরক্ষার জন্য সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

*মতামত লেখকের নিজস্ব