বান্দরবানের পাহাড়ি পথে হঠাৎ সামনে পড়লে প্রথম দেখায় অনেকেই প্রাণীটিকে বড়সড় কোনো গরু বলে ভুল করতে পারেন। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই পার্থক্য চোখে পড়ে। শরীর বেশি ভারী ও পেশিবহুল, মাথা চওড়া, শিং মোটা এবং দুই পাশ থেকে বের হয়ে ওপরের দিকে বাঁকানো। অনেক গয়ালের চার পায়ের নিচে আবার সাদা ‘মোজা’র মতো অংশ দেখা যায়। প্রাণীটির নাম গয়াল।
গয়াল সাধারণ গরু নয়
বৈজ্ঞানিক পরিচয়েও গয়ালকে দেশি গরুর একটি জাত বলা ঠিক নয়। আমাদের পরিচিত জেবু বা দেশি গরুর বৈজ্ঞানিক নাম বস ইন্ডিকাস, আর গয়ালের বৈজ্ঞানিক নাম বস ফ্রন্টালিস। দুটিই বস গণের প্রাণী হলেও বৈজ্ঞানিক পরিচয়ে আলাদা। গয়ালের সঙ্গে বন্য গাউরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং এর উৎপত্তি ও শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা দীর্ঘদিনের।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গয়াল ‘মিথুন’ নামে বেশি পরিচিত। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে বান্দরবানের সঙ্গে প্রাণীটির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি বাংলাদেশি গবেষণায় বান্দরবানকে গয়ালের প্রধান আবাস হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং সে সময় সেখানে আনুমানিক ৮০০ থেকে ৯০০ গয়ালের হিসাব পাওয়া গিয়েছিল। সংখ্যাটি এখনকার নয়। তাই প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে বর্তমানে ঠিক কত গয়াল আছে, তার নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ হিসাব কি আমাদের আছে?
পাহাড় ছাড়িয়ে খামারেও গয়াল
গয়ালের গল্প এখন আর শুধু পাহাড়ি বনেই সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও সাতকানিয়ার কিছু এলাকায় খামারভিত্তিক ও আধা-নিবিড় পদ্ধতিতেও গয়াল পালন করা হচ্ছে।
আমাদের বিভাগে গয়াল নিয়ে একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণায় রাঙ্গুনিয়া ও সাতকানিয়ার চারটি খামারের ৭৫টি গয়াল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৭টি ছিল রাঙ্গুনিয়ায় এবং ১৮টি সাতকানিয়ার তিনটি খামারে। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন ও প্রজনন, খাদ্য ও পালনব্যবস্থা, স্বাস্থ্য এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সেখানে গায়ের রঙে যথেষ্ট বৈচিত্র্য দেখা গেছে। কালো, বাদামি, ধূসর, সাদা ও মিশ্র রঙের গয়াল ছিল। পর্যবেক্ষণ করা প্রাণীর ৮১ দশমিক ৩ শতাংশের পায়ের নিচের অংশ ছিল সাদা।
উৎপাদনের তথ্য কী বলছে
আমাদের বিভাগের গবেষণায় নির্বাচিত খামারগুলোতে বাছুরের জন্ম ওজন মোটামুটি ২০ থেকে ৩০ কেজির মধ্যে নথিভুক্ত হয়েছে এবং পুরুষ বাছুর সাধারণত তুলনামূলক ভারী ছিল।
কিন্তু আগের বাংলাদেশি গবেষণায় জন্ম ওজন কিছুটা কমও পাওয়া গেছে। ২০০৩ সালের একটি গবেষণায় প্রথম বিয়ানে পুরুষ ও স্ত্রী বাছুরের জন্ম ওজন যথাক্রমে ১৯.৬৭ ও ১৫.৫৮ কেজি পাওয়া যায়; পরবর্তী বিয়ানে তা বাড়তে দেখা যায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সব গয়ালের ‘স্বাভাবিক জন্ম ওজন’ বলা ঠিক হবে না।
পূর্ণবয়স্ক ওজনেও একই সতর্কতা দরকার। আমাদের বিভাগের গবেষণায় ৩৭ থেকে ৭২ মাস বয়সী পুরুষ গয়ালের হিসাব করা গড় জীবন্ত ওজন প্রায় ৫৯৭ কেজি পাওয়া গেছে। বেশি বয়সী কয়েকটি প্রাণীর ক্ষেত্রে হিসাব করা ওজন ৭০০ কেজির বেশি ছিল।
এখানে ‘হিসাব করা’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ; বুকের বেড় ও দেহের দৈর্ঘ্য থেকে সূত্র ব্যবহার করে ওজন নির্ণয় করা হয়েছিল। অন্যদিকে বান্দরবানে প্রকাশিত আগের গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গয়ালের ওজন ৪৯০ থেকে ৫৭৭ কেজির মধ্যে পাওয়া গেছে।
তাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো—গয়াল বড় দেহের মাংস উৎপাদনকারী প্রাণী; তবে বয়স, খামার, ব্যবস্থাপনা ও পরিমাপপদ্ধতি অনুযায়ী ওজনে পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক।
কোনো স্থানীয় প্রাণিজ সম্পদ হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী হারায় না। তার সঙ্গে হারাতে পারে বহু প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া পরিবেশগত অভিযোজন, খাদ্য ব্যবহারের সক্ষমতা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পালনজ্ঞানও।
প্রজননের তথ্যও আশাব্যঞ্জক
আমাদের বিভাগের মাঠতথ্যে স্ত্রী গয়ালের প্রথম ঋতুচক্র গড়ে প্রায় ১.৫বয়সে এবং প্রথম গর্ভধারণ প্রায় ২ বছর বয়সে নথিভুক্ত হয়েছে। গর্ভকাল ছিল ২৮০ থেকে ২৯০ দিন এবং বাচ্চা দেওয়ার ব্যবধান সাধারণত ৩৬০ থেকে ৪০০ দিন।
তবে ২০০৩ সালের বাংলাদেশি গবেষণায় গড় গর্ভকাল প্রায় ২৯৬ দিন এবং বাচ্চা দেওয়ার ব্যবধান প্রায় ৪৬৫ দিন পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের আরেক গবেষণায় বাচ্চা দেওয়ার ব্যবধান ছিল প্রায় ৪০২ দিন।
অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা ও পালভেদে পার্থক্য থাকে। সহজ ভাষায় বলা যায়, গয়ালের গর্ভকাল প্রায় সাড়ে নয় থেকে দশ মাস এবং একটি বাচ্চা থেকে পরের বাচ্চার ব্যবধান প্রায় এক বছর থেকে ১৫ মাসের মধ্যে হতে পারে। আগের গবেষণায় এর প্রজননক্ষমতাকে দেশি গরুর কাছাকাছিও বলা হয়েছে।
দুধ নয়, সম্ভাবনা মাংসে
বাংলাদেশের গবেষণায় গয়াল থেকে দৈনিক গড়ে এক লিটারেরও অনেক কম—প্রায় ০.৩ লিটার দুধ পাওয়ার তথ্য রয়েছে। তাই দুধ নয়, গয়ালের মূল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মাংসে। আমাদের বিভাগের নির্বাচিত খামারগুলোতে দুধ দোহন করা হতো না; বাছুরকেই মায়ের দুধ খেতে দেওয়া হতো। খামারিদের আগ্রহও ছিল মূলত মাংস উৎপাদন ও প্রজনন ঘিরে।
গয়ালের বড় দেহের পাশাপাশি স্থানীয় খাদ্যসম্পদ ব্যবহারের ক্ষমতাও আগ্রহের। আধা-নিবিড় ব্যবস্থায় গয়ালকে দিনের বড় সময় বাইরে চরতে দেখা গেছে। আবদ্ধ অবস্থায় ঘাস, খড়, নেপিয়ার, কলাপাতা, রাইস পলিশ ও গমের ভুসির মতো স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য খাদ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে শুধু বড় দেহ দেখেই গয়ালকে লাভজনক মাংসের প্রাণী বলা যাবে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর বৃদ্ধির হার, খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা, জবাইয়ের পর মাংসের পরিমাণ, মাংসের গুণমান এবং উৎপাদন খরচ নিয়ে আরও পরিকল্পিত গবেষণা প্রয়োজন।
গরুর তুলনায় গয়ালের বাড়তি সুবিধা কোথায়
এখানেই সাধারণ পাঠকের স্বাভাবিক প্রশ্ন—গরু থাকতেই গয়াল নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
প্রথম সুবিধা পাহাড়ি খাদ্যসম্পদ ব্যবহারে। গয়াল ঘাসের পাশাপাশি গাছের পাতা, ঝোপঝাড় ও অন্যান্য পাহাড়ি উদ্ভিদ খেতে অভ্যস্ত।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একই বয়সের আটটি মিথুন ও আটটি থো-থো জেবু গরুকে একই ব্যবস্থাপনা ও গাছের পাতাভিত্তিক খাদ্যে ১২ মাস পালন করে একটি গবেষণায় দেখা যায়, মিথুনের দৈনিক গড় ওজন বৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫০৮ গ্রাম, যেখানে গরুর ছিল প্রায় ৩৯৩ গ্রাম। মিথুনের খাদ্য রূপান্তর দক্ষতাও ভালো ছিল, যদিও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের হজমক্ষমতায় দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাহাড়ি এলাকায় এমন উদ্ভিদ ও জৈবসম্পদ আছে, যা প্রচলিত গরুর নিবিড় খামারে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে। তবে ওই একটি গবেষণার ফল দিয়ে সব গয়াল সব ধরনের গরুর চেয়ে দ্রুত বাড়ে—এমন দাবি করা যাবে না।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা মাংসের গুণমানে। সাম্প্রতিক একটি চীনা তুলনামূলক গবেষণায় একই বয়সের গয়াল ও স্থানীয় ইয়েলো ক্যাটলের মাংস বিশ্লেষণ করে গয়ালের মাংসে বেশি প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ও মোট অ্যামিনো অ্যাসিড এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, পাশাপাশি কম অন্তঃপেশি চর্বি পাওয়া গেছে।
এ ফল আকর্ষণীয়, কিন্তু চীনের নির্দিষ্ট পরিবেশ ও নির্দিষ্ট গরুর সঙ্গে তুলনার ফল। বাংলাদেশের গয়ালের মাংসেও একই ফল হবে—তা ধরে নেওয়া যাবে না। বরং বাংলাদেশে গয়ালের মাংসের পুষ্টিমান, স্বাদ, কোমলতা ও ভোক্তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গবেষণার জন্য এটিই শক্ত যুক্তি।
রোগসহনশীল—কিন্তু রোগমুক্ত নয়
গয়াল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরেকটি জায়গায় সতর্ক থাকা দরকার। কিছু বাংলাদেশি গবেষণায় গয়ালের রোগসহনশীলতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে গয়ালের রোগ হয় না।
খুরারোগ, ডায়রিয়া, চোখ ও ত্বকের রোগ, পরজীবী সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগের তথ্য বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। তাই স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজনের কিছু সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু নিয়মিত পশুচিকিৎসা, টিকা ও রোগ নজরদারি প্রয়োজন।
রক্ষা জরুরি, কারণ এটি জিনগত সম্পদ
গয়ালের গুরুত্ব শুধু মাংসে নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র প্রাণিজ জিনগত সম্পদ। ছোট ও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে নিকটাত্মীয় প্রজননের ঝুঁকি বাড়ে। আবার স্থানীয় গরুর সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত সংকরায়ণ হলে গয়ালের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও ধীরে ধীরে হারাতে পারে। আমাদের বিভাগের গবেষণায় নির্বাচিত খামারগুলোতে গয়াল ও রেড চিটাগাং গরুর সংকর প্রাণীর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
কোনো স্থানীয় প্রাণিজ সম্পদ হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী হারায় না। তার সঙ্গে হারাতে পারে বহু প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া পরিবেশগত অভিযোজন, খাদ্য ব্যবহারের সক্ষমতা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পালনজ্ঞানও।
খামারির লাভ না হলে সংরক্ষণও টিকবে না
‘গয়াল বাঁচাতে হবে’ বলা সহজ। কিন্তু যে মানুষটি প্রাণীটি পালন করছেন, তিনি যদি লাভ না পান, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম কেন গয়াল পালন করবে?
তাই সংরক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে খামারিকে। প্রশিক্ষণ, সহজ পশুচিকিৎসা, পরিকল্পিত প্রজনন, পুষ্টিব্যবস্থা ও ন্যায্য বাজার দরকার। একই সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের স্থানীয় জ্ঞানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
গয়াল রাতারাতি বাংলাদেশের মাংসের বাজার বদলে দেবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক নয়। কিন্তু বড় দেহ, পাহাড়ি খাদ্যসম্পদ ব্যবহারের ক্ষমতা, নির্দিষ্ট তুলনামূলক গবেষণায় জেবু গরুর চেয়ে ভালো বৃদ্ধির হার এবং মাংসের সম্ভাব্য পুষ্টিগুণ—সব মিলিয়ে গয়ালকে অবহেলা করারও কারণ নেই।
এখন প্রশ্ন—শুরুটা হবে কোথা থেকে?
দেশে কত গয়াল আছে, কোথায় আছে, কীভাবে স্বতন্ত্র জিনগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা যাবে, পরিকল্পিত প্রজনন কীভাবে হবে, কোথায় মডেল খামার তৈরি করা যায় এবং কীভাবে খামারির জন্য লাভজনক বাজার গড়ে তোলা সম্ভব—এসবকে একটি সময়বদ্ধ পরিকল্পনায় আনতে হবে। পরবর্তী লেখায় সেই বিষয়েই আলোচনা করব—‘পাহাড়ের গয়াল বাঁচবে কীভাবে: বাংলাদেশের সামনে পাঁচ বছরের সুযোগ’।
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd