ঢাকার সরকারি সাতটি বড় কলেজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অবস্থিত এসব কলেজ কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পেতে পারে, সেটি একটি কৌতূহলের ব্যাপার ছিল। অধ্যাদেশের প্রথম খসড়ায় তার একটি রূপরেখাও দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এসব কলেজ চারটি স্কুলের অন্তর্গত থাকবে। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা কলেজ নিয়ে হবে বিজ্ঞান স্কুল, বাঙলা কলেজে হবে কলা ও মানবিক স্কুল, তিতুমীর কলেজে ব্যবসায় স্কুল ও কবি নজরুল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ নিয়ে হবে আইন স্কুল।
আরও বলা হয়েছিল, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চলবে ‘হাইব্রিড’ মডেলে, যেখানে ৩৫-৪০ শতাংশ ক্লাস হবে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে আর বাকি ক্লাস ও পরীক্ষা হবে সশরীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সাতটি কলেজ নিয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণাকে কলেজগুলোর সাধারণ শিক্ষার্থীরা সাধুবাদ জানিয়েছিলেন; কিন্তু কিছুদিন পর এসব কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রস্তাবিত কাঠামোর ব্যাপারে আপত্তি জানান। কলেজগুলোর মধ্যে পাঁচটিতে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করেন। তাঁরা আলাদাভাবে রাস্তায় নেমে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন।
কলেজগুলোর শিক্ষকেরা প্রশ্ন তোলেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নামে যে বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে, সেখানে বাংলা, ইংরেজি, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, রসায়নের মতো মৌলিক বিষয় নেই কেন। শিক্ষকেরা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, এসব কলেজে শিক্ষা ক্যাডারের পদ আছে ১ হাজার ২০০–এর বেশি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে শিক্ষা ক্যাডারের এতগুলো পদ বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, এর আগে জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার সময়ে প্রায় ৫০০ পদ বিলুপ্ত করা হয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগপদ্ধতি কেমন হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। আবার সেখানে স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, ট্রেজারার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রক্টর, হিসাব পরিচালকসহ প্রশাসনিক প্রায় সব পদই আছে।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সব পক্ষকে নিয়ে বসা দরকার ছিল। সেটি শুরুতেই করা সম্ভব হলে বহু পক্ষ তৈরি হয়ে বিষয়টিকে জটিল করে তুলত না। তা ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ শুরু হওয়ার আগে কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাখা দরকার ছিল; তাতে শিক্ষাঘাটতি তৈরি হতো না।
বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন, এমন শিক্ষার্থীরা বেশ ঝামেলাতেই পড়ে যান। কারণ, তাঁদের মূল সমস্যা ছিল পরীক্ষা গ্রহণ আর ফলাফল প্রকাশের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত থাকতেও এই সমস্যা ছিল। ২০১৭ সালে এই সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর তাঁদের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এ জন্য তাঁরা বেশ কয়েকবার আন্দোলনেও নেমেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুরুর দিকে হিমশিম খেলেও পরে বাড়তি লোকবল নিযুক্ত করে সামাল দিয়ে যাচ্ছিল। পরীক্ষা নেওয়া আর ফলাফল প্রকাশের ব্যাপার প্রায় নিয়মিত হয়ে আসে।
অধিভুক্ত হওয়ার পর এসব কলেজের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ নতুন করে সিলেবাসও তৈরি করে দেয়। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাওয়া শুরু করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নতুন কিছু বিষয় নিয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের দাবিগুলো খুব অযৌক্তিক ছিল না। আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে ছিল ভর্তি পরীক্ষায় কোটা বাতিল করা, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি না করা, ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বিবেচনা করা, ভর্তি পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্ক যুক্ত করা এবং সাত কলেজের ভর্তি ফির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। সেই আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করলে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অধিভুক্তি থেকে আলাদা করে দেয়। কলেজগুলো অধিভুক্ত হওয়ার সময়ে যেমন কোনো সুবিবেচনা ও প্রস্তুতি ছিল না, তেমনি কলেজগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে চিন্তা করা হয়নি।
সাত কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এসব কলেজের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও গৌরব আছে, এটি নষ্ট করা হলে সামগ্রিক শিক্ষার ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৪১ সালে; উচ্চমাধ্যমিকের ফলে এই কলেজের ছাত্রদের ঈর্ষণীয় কৃতিত্ব আছে। আবার ইডেন কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা কলেজ নারীদের জন্য বিশেষায়িত; সমাজে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও চাহিদা আছে। তাঁরা আরও বলছেন, কলেজগুলোকে একত্র করে বিশ্ববিদ্যালয় নাম দিলেই যে শিক্ষার মান বাড়বে, তারই–বা নিশ্চয়তা কী; বরং কলেজগুলোকে বর্তমান অবস্থায় রেখেই যা কিছু করার, করতে হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। নতুন খসড়ায় বলা হয়, সাতটি কলেজ বিদ্যমান কাঠামোতেই থাকবে; তবে কলেজগুলো সংযুক্ত থাকবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে—অনেকটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকা অবস্থায় যেমন ছিল। আমরা বরাবরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার মানের কথা বলে থাকি। বর্তমানে সাত কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রায় ক্ষেত্রেই ঠিকমতো ক্লাস পান না, তাঁরাও ঠিকমতো ক্লাসে আসেন না।
প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে ক্লাস নিলে লেখাপড়ার মানের আরও অবনতির আশঙ্কা আছে। তা ছাড়া অধ্যাদেশের সংশোধিত খসড়াতেও সব প্রশ্নের মীমাংসা পাওয়া যায় না। যেমন কলেজগুলো প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হবে কি না, সেটি পরিষ্কার নয়। তা ছাড়া ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্গত হয়ে সাত কলেজ কীভাবে অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেটি কলেজগুলোর শিক্ষক ও কর্মচারীরাও বুঝতে পারছেন না।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সব পক্ষকে নিয়ে বসা দরকার ছিল। সেটি শুরুতেই করা সম্ভব হলে বহু পক্ষ তৈরি হয়ে বিষয়টিকে জটিল করে তুলত না। তা ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ শুরু হওয়ার আগে কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাখা দরকার ছিল; তাতে শিক্ষাঘাটতি তৈরি হতো না। ঢাকার সাতটি কলেজ যদি গুচ্ছাকারে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে সফল হয়, তবে দেশের অপরাপর সরকারি কলেজকেও এভাবে একত্র করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব