
কিছুদিন আগে গুরগাঁওয়ের এক তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ধরা যাক, নাম তার রাকেশ। যে গ্রাম থেকে সে উঠে এসেছে, তা এখন আর নিছক গ্রাম নয়—জেলার দ্রুত শহুরে বিস্তারের অংশ।
গত ২০ বছরে রাকেশের অল্প জমির প্রান্তিক চাষি পরিবার পৈতৃক ভিটেমাটির বড় অংশই বিক্রি করেছে বহুজাতিক রিয়েল এস্টেট সংস্থার কাছে। সেই বিক্রির টাকায় উঠেছে দোতলা বাড়ি, উঠোনে গাড়ি, ঘরে পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা। আর সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ, যা তাদের সম্প্রদায়ের অনেকের কাছেই দীর্ঘদিন অধরা ছিল।
আধুনিক শিক্ষার সেই দরজা খুলতেই রাকেশ পেয়েছে এমন একটি চাকরি, যা তাকে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেয়। কথার ফাঁকে উঠে এল আরেক প্রসঙ্গ—তার খাদ্যাভ্যাসের বদল। যে সম্প্রদায়ে রাকেশের জন্ম, সেখানে নিরামিষ খাওয়াই ছিল রীতি। এখন সে অনায়াসে অমলেট, ভাজা মাছ খেতে পারে। ডাল-সবজি থেকে ডিম-ভাজা—এই যাত্রাপথ তার কাছে কেবল রসনার রূপান্তর নয়, এক বিশ্বনাগরিক পরিচয়ে উত্তরণের গল্প।
খাদ্য ও পরিচয়ের সম্পর্ক নতুন নয়। জাতপাত, আত্মপরিচয়—সবকিছুর সঙ্গেই খাবারের যোগ বহু পুরোনো। তবে আধুনিক ইতিহাসে এই সম্পর্কের আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আছে। একদিকে আছে আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস—রাকেশের মতো তরুণদের রন্ধন-ভ্রমণ যার অংশ। অন্যদিকে আছে জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান।
জাতীয়তাবাদী নেতা বিপিন চন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২) তাঁর আত্মজীবনীতে কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা বিশেষভাবে স্মরণীয়। উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে এসে তিনি দেখেছিলেন, খাদ্যই যেন শহুরে জীবনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।
এই দুই উদাহরণেই স্পষ্ট—খাবার আমাদের পরিচয়ের ভাষা। মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে খাদ্য নির্বাচন করে। কিন্তু বিহার সরকার সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দিরের আশপাশে মাংস বিক্রিতে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা মানুষ ও খাদ্যের সম্পর্কটিকেই উল্টে দিয়েছে। যেন প্রাণহীন মাংসই এখন জীবিত মানুষের আচরণ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।
এই নতুন বিধিনিষেধকে তার প্রকৃত পটভূমি দেখা দরকার। জীবিত মানুষের ওপর মৃত বস্তুর ভূত চাপিয়ে দিয়ে জনকল্যাণে ব্যর্থতার দায় এড়ানো—এই রাজনীতির মধ্যেই যেন তার আসল অর্থ লুকিয়ে আছে।
বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহা বলেছেন, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে মাংস বিক্রি করলে সামাজিক অশান্তি তৈরি হতে পারে, শিশুদের মধ্যে বাড়তে পারে আগ্রাসন। প্রশ্ন জাগে—মৃত মাংসের এমন ক্ষমতা কি সত্যিই আছে, যা সামাজিক সম্পর্ক ও আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে? আর নিরামিষভোজীরা কি স্বভাবতই শান্তিপ্রিয়?
শিশুদের সহিংসপ্রবণতা তাদের বেড়ে ওঠার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের ফল। ছেলেশিশুদের অনেক সময় এমনভাবে বড় করা হয়, যাতে প্রচলিত পুরুষত্বের ধারণা মেনে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। আবার এমন পরিবেশেও তারা মানুষ হতে পারে, যেখানে ভিন্নধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা হিংসাকে স্বাভাবিক বলে শেখানো হয়। এই সামাজিক গঠনে সবজি বা মাংস—কোনোটিরই ভূমিকা নেই। সমাজ গড়ে মানুষই, খাদ্য নয়।
বৌদ্ধধর্মকে প্রায়ই শান্তির ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়, অথচ বহু বৌদ্ধ সমাজেই মাংস খাওয়া স্বাভাবিক অভ্যাস। আর যদিও এ কথা বলা বাড়তি বলেই মনে হতে পারে, তথাপি অ্যাডলফ হিটলার নিরামিষ ভোজনের প্রবল সমর্থক ছিলেন।
বিজয় কুমার সিনহা জানিয়েছেন, জনসংযোগ কর্মসূচিতে ‘বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা’র পরেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সম্ভবত যিনি এখন মন্দির ও স্কুলের আশপাশে মাংস বিক্রির কুফল নিয়ে তাঁকে পরামর্শ দিচ্ছেন, তিনি সাম্প্রতিক ইতিহাসে খাদ্যাভ্যাসের নানা ব্যাখ্যার সঙ্গে খুব পরিচিত নন। স্বামী বিবেকানন্দ একসময় বলেছিলেন, মানুষই ঠিক করে সে নিরামিষভোজী হবে না আমিষভোজী—খাদ্য নিজে মানুষকে প্রভাবিত করে না। কথাটি আজও অমলিন।
তবে আরও বড় কথা, এই নতুন বিধিনিষেধকে তার প্রকৃত পটভূমি দেখা দরকার। জীবিত মানুষের ওপর মৃত বস্তুর ভূত চাপিয়ে দিয়ে জনকল্যাণে ব্যর্থতার দায় এড়ানো—এই রাজনীতির মধ্যেই যেন তার আসল অর্থ লুকিয়ে আছে।
সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে এবং শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আগ্রাসন কমাতে প্রয়োজন জনমুখী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও আমাদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ধরন নিয়ে পুনর্বিবেচনা। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার নীতি, উন্মুক্ত গণউদ্যান—এসবই সামাজিক সম্প্রীতির বাস্তব ভিত্তি। মৃত মাংসের ‘ভূত’ ডেকে এনে তার ওপর দায় চাপানো নিছক ভাঁওতা।
দশকের পার্থক্য আর আলাদা সামাজিক পরিবেশ সত্ত্বেও রাকেশ ও বিপিন চন্দ্র পাল—দুজনেই দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের সিদ্ধান্তেই নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করে। খাবার বা অন্য কোনো জড়বস্তু মানুষকে বেছে নেয় না, তার পরিচয়ও ঠিক করে না।
কিন্তু মাংস নিয়ে সাম্প্রতিক এই বিতর্কে যেন উল্টো কথাই বলা হচ্ছে—যেন খাবারই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আসলে এভাবে কথা বলে সমাজের আসল সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখা হচ্ছে, আর জনজীবনকে ভাবনাহীন, নিষ্প্রাণ করে তোলার চেষ্টা চলছে।
সঞ্জয় শ্রীবাস্তব লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা অধ্যাপক।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত