প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মতামত

১০০ দিন পর বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ পরীক্ষা

একটি সরকারের ১০০ দিন নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস যেমন ঠিক নয়, তেমনি পুরোপুরি অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ১০০ দিন ইতিহাসের রায় নয়, কিন্তু এটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার একটি প্রাথমিক চিত্র। এই সময়ে সরকার কোন কাজকে জরুরি মনে করছে, রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা নড়ছে, জন–আস্থাকে প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপ দিতে পারছে কি না, এসবের কিছু সংকেত পাওয়া যায়।

বিএনপি সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বাংলাদেশের সমাজে একধরনের ক্লান্তি জমে ছিল। মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি, তারা স্বাভাবিকতা চেয়েছিল। রাস্তায় নিরাপত্তা, প্রশাসনে সিদ্ধান্ত, বাজারে স্থিরতা, আদালতে আস্থা, হাসপাতালে সেবা এবং রাজনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা।

অন্তর্বর্তী শাসনের অনিশ্চয়তার পর একটি নির্বাচিত সরকারের আগমন তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে। এই স্বস্তি সরকারের প্রথম রাজনৈতিক পুঁজি। কিন্তু রাজনৈতিক পুঁজি জমা রাখার জিনিস নয়। ব্যবহার না করলে তা দ্রুত ক্ষয় হয়।

এই ১০০ দিনে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত কোনো একক প্রকল্প নয়, বরং নির্বাচিত কর্তৃত্বের একটি ন্যূনতম পুনঃপ্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র আবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, মন্ত্রণালয়গুলো নড়ছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্তত দৃশ্যমান। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন। রাষ্ট্র দৃশ্যমান হলেই কি রাষ্ট্র কার্যকর হয়? ক্ষমতার কেন্দ্রে নেতৃত্ব থাকলেই কি মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা ফিরে আসে? বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, আসে না; বরং নির্বাচিত সরকারগুলোর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো তারা অনেক সময় রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশাসনিক সক্ষমতার বিকল্প মনে করে। বিএনপি সরকারেরও এই ভুল করার সুযোগ নেই।

সরকার শুরুতে যে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো নিয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্কুল ফিডিং, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি—এগুলো আলাদা আলাদা প্রকল্প হলেও এগুলোর ভেতরে একটি সাধারণ রাজনৈতিক বার্তা আছে। সরকার বলতে চাইছে, তারা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রবেশ করতে চায়। দরিদ্র পরিবার, কৃষক, স্কুলপড়ুয়া শিশু, জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশ—এই অগ্রাধিকারগুলো কাগজে অন্তত ভুল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অভিজাতকেন্দ্রিক উন্নয়ন রাজনীতির বিপরীতে এগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের ভাষা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ অনেকবার সরকার পরিবর্তন দেখেছে। তারা এখন রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তন দেখতে চায়। এই ১০০ দিনের আসল শিক্ষা এখানেই। আস্থা ফিরেছে, কিন্তু আস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে। আর রাষ্ট্র বদলানো শুরু হয় ক্ষমতা ব্যবহার দিয়ে নয়, ক্ষমতার ওপর সীমা টেনে।

কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা কখনোই শুধু ভালো প্রকল্পের অভাব ছিল না। সমস্যা ছিল প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতে। ফ্যামিলি কার্ড যদি সত্যিই দরিদ্র মানুষের হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিতে পারে, তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া তালিকা, দলীয় আনুগত্য, মধ্যস্বত্বভোগী এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা যদি ঢুকে পড়ে, তবে এই প্রকল্পও পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির আরেক নাম হয়ে যাবে।

কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা। কৃষক যদি সরাসরি ভর্তুকি, ঋণ, বীজ, সার, বাজারতথ্য ও বিমার সুবিধা পান, তাহলে কৃষি অর্থনীতিতে তা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু কৃষক কার্ড যদি কৃষকের চেয়ে স্থানীয় ক্ষমতাবানদের হাতে বেশি কার্যকর হয়, তাহলে এর রাজনৈতিক প্রচার থাকবে, ফল কম থাকবে।

মিড-ডে মিল কর্মসূচি সরকারের সদিচ্ছার ভালো উদাহরণ, আবার প্রশাসনিক দুর্বলতারও সতর্কসংকেত। শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষায় মনোযোগ বাড়াতে এ ধরনের কর্মসূচি দরকার। কিন্তু যখন খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠে—পচা ডিম বা নিম্নমানের রুটি—তখন বিষয়টি শুধু সরবরাহব্যবস্থার ভুল থাকে না। এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতায় পরিণত হয়। কারণ, শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাবারে দুর্নীতি বা অবহেলা সবচেয়ে নীচু ধরনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি নির্দেশ করে। সরকার যদি এই কর্মসূচিকে ভবিষ্যতের মানবসম্পদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, তাহলে খাদ্যের মান, স্থানীয় নজরদারি, অভিভাবক কমিটি, নিয়মিত প্রকাশ্য রিপোর্টিং এবং সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

জ্বালানিসংকট সরকারের জন্য প্রথম বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা ছিল। বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে, এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে সরকার কীভাবে বাজার, জনমনস্তত্ত্ব এবং সরবরাহব্যবস্থা পরিচালনা করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে দাম না বাড়িয়ে সরকার জনচাপ সামলাতে চেয়েছে। এটি রাজনৈতিকভাবে বোঝা যায়। এর ফলে যদি মজুতের প্রবণতা বাড়ে, বাজারে আতঙ্ক ছড়ায় এবং পরে বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়, তাহলে বোঝা যায়, সরকার সংকটের যোগাযোগে দুর্বল ছিল। মানুষকে সত্য বলা সব সময় জনপ্রিয় নয়, কিন্তু অস্পষ্টতা অনেক সময় আরও ব্যয়বহুল হয়। ভবিষ্যতে জ্বালানিনীতিতে সরকারের দরকার স্বচ্ছ মূল্যনির্ধারণ, কৌশলগত মজুত, আমদানির বৈচিত্র্য এবং সবচেয়ে জরুরি সংকটকালে স্পষ্ট জনযোগাযোগ।

তবে ১০০ দিনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় নিঃসন্দেহে হামের প্রাদুর্ভাব। এর দায় পুরোপুরি বর্তমান সরকারের ওপর চাপানো ন্যায্য হবে না। টিকার ঘাটতি, আগের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রুটিন ইমিউনাইজেশনের ফাঁক এবং অন্তর্বর্তী সময়ের অদূরদর্শিতা এই সংকটের পটভূমি তৈরি করেছে।

কিন্তু সরকার সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পেলেই দায় শেষ হয়ে যায় না; বরং তখনই রাষ্ট্রের সক্ষমতা পরীক্ষা হয়। একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি পরিবার, একটি ব্যর্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের ভাঙা সম্পর্কের গল্প। হামের ক্ষেত্রে সরকারের আরও দ্রুত হাসপাতাল প্রস্তুতি, জেলা পর্যায়ের টাস্কফোর্স, টিকা ক্যাম্পেইন, ভিটামিন এ সরবরাহ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং আক্রান্ত পরিবারের সঙ্গে দৃশ্যমান যোগাযোগ দরকার ছিল। জনস্বাস্থ্য সংকটে নীরব প্রশাসন মানুষকে আরও একা করে দেয়।

আইনশৃঙ্খলা সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ। মানুষ নির্বাচিত সরকারকে ভোট দিয়ে শুধু সংসদ পূর্ণ করে না, তারা রাস্তায় নিরাপত্তা চায়। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মব সহিংসতা, অপহরণ, কিশোর গ্যাং—এসব যদি চলতেই থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নৈতিক শক্তি দ্রুত কমে যায়।

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান ছিল প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র দেখিয়েছে যে কিছু দখলকৃত বা অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে সে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা এক দিনের অভিযানে নয়, ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত হয়। কোনো এলাকা দখলমুক্ত করা এক জিনিস, অপরাধ-অর্থনীতি ভাঙা আরেক জিনিস। স্থানীয় রাজনীতি, পুলিশ, ভূমিদস্যুতা, মাদক, চাঁদাবাজি এবং দলীয় সুরক্ষার নেটওয়ার্ক না ভাঙলে অভিযান ছবি হয়ে থাকবে, নীতি হবে না।

এই সরকারের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ পরীক্ষা হবে সংস্কার। কারণ, কল্যাণমূলক কর্মসূচি মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রকে বদলায় প্রতিষ্ঠান। মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন—এসব জায়গায় যদি পুরোনো কাঠামোই ফিরে আসে, তাহলে সরকারের পরিবর্তন হবে, রাষ্ট্রের পরিবর্তন হবে না। বিএনপি দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থেকে রাষ্ট্রীয় দমন, প্রশাসনিক পক্ষপাত, বিচারহীনতা এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তাই তাদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। তারা যদি ক্ষমতায় এসে একই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরেকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটি শুধু প্রতিশ্রুতিভঙ্গ নয়, ঐতিহাসিক সুযোগের অপচয় হবে।

আগামী এক বছরে সরকারের সামনে তিনটি কাজ জরুরি। প্রথমত, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে এনে স্বচ্ছ ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিচালনা করা। কারা সুবিধা পাচ্ছে, কোন মানদণ্ডে পাচ্ছে, কোথায় ব্যর্থতা হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে প্রতীকী অভিযান থেকে বের হয়ে গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয় অপরাধ অর্থনীতি, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে ধরে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, সংস্কারকে নিয়ন্ত্রণের ভাষা থেকে বের করে প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতার ভাষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ—এগুলো সরকারের শাখা নয়, এগুলো রাষ্ট্রের ভারসাম্যের জায়গা।

বিএনপি সরকারের ১০০ দিন তাই সাদা-কালো গল্প নয়। এখানে আস্থা আছে, আবার আশঙ্কাও আছে। উদ্যোগ আছে, আবার বাস্তবায়নের দুর্বলতাও আছে। রাজনৈতিক বৈধতা আছে, কিন্তু প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, সরকার এখনো সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে কি কেবল প্রকল্পনির্ভর জনপ্রিয় সরকার হবে, নাকি প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রগঠনের পথে হাঁটবে।

বাংলাদেশের মানুষ অনেকবার সরকার পরিবর্তন দেখেছে। তারা এখন রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তন দেখতে চায়। এই ১০০ দিনের আসল শিক্ষা এখানেই। আস্থা ফিরেছে, কিন্তু আস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে। আর রাষ্ট্র বদলানো শুরু হয় ক্ষমতা ব্যবহার দিয়ে নয়, ক্ষমতার ওপর সীমা টেনে।

সরকার কিছু ভালো সূচনা করেছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সে কত দ্রুত নীতি, দক্ষতা ও জবাবদিহিকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর।

  • আসিফ বিন আলী গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ই–মেইল: abinali2@gsu.edu

    মতামত লেখকের নিজস্ব