কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনেও যদি লেখা থাকে—‘পাবলিক টয়লেট, ১০ টাকা’, তাহলে এর থেকে বড় ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা আর কী হতে পারে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনেও যদি লেখা থাকে—‘পাবলিক টয়লেট, ১০ টাকা’, তাহলে এর থেকে বড় ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা আর কী হতে পারে।

মতামত

রেলসেবা ও ১০ টাকার পাবলিক টয়লেট–নির্ভর পর্যটন

সম্প্রতি কক্সবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম সাফারি পার্ক ডুলাহাজারায় গিয়েছিলাম। ছোট একটি বাচ্চা হাতে রুটির প্যাকেট নিয়ে মায়ের সঙ্গে পার্কে প্রবেশ করেছে। মুহূর্তে ৩০ থেকে ৪০টি বানর এসে বলতে গেলে ‘মব’ করে ছিনিয়ে নিয়ে গেল সেই রুটির প্যাকেট। কর্তৃপক্ষ অবশ্য নোটিশ লাগিয়ে রেখেছে, পার্কের প্রাণীদের খাবার দেওয়া নিষেধ। সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়েছে নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ।

ওদিকে বাঘ–সিংহ সামলানো এত বড় পার্ক কর্তৃপক্ষ সামান্য দুটো টয়লেট সামলাতে পারে না। দর্শনার্থীরা টিকিট কেটে পার্কে প্রবেশ করেন। গাড়ি ভাড়া করে ভেতরে ঘোরেন। খরচ তো আসতে পারত টিকিটের টাকা থেকেই। দেখা গেল, পার্কের প্রবেশপথে চারকোনা টেবিল নিয়ে বসে আছেন একজন। ওনাকে ১০ টাকা দেওয়ার বিনিময়ে যাওয়া যাবে টয়লেটে।

এ মহান পাবলিক টয়লেট উদ্যোগটি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি পর্যটন এলাকায়। সিলেটের সীমান্তবর্তী সাদাপাথরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। চারপাশে পাথর আর পাথর। সেই পাথরের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে একটি স্থাপনা—‘পাবলিক টয়লেট, ১০ টাকা’। পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য শুধু সুন্দর সুন্দর স্পট থাকলেই হয় না। সেখানে যাওয়ার, থাকা–খাওয়ার সুব্যবস্থাও থাকতে হয়?

পর্যটনসেবার সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত আরেক সেবা হলো রেল যোগাযোগ। পর্যটনের স্থানগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনেও যদি লেখা থাকে—‘পাবলিক টয়লেট, ১০ টাকা’, তাহলে এর থেকে বড় ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা আর কী হতে পারে। মানুষ কয়েক শ টাকা দিয়ে টিকিট কাটে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন এক স্টেশনে সামান্য টয়লেট ব্যবস্থাপনা করতে পারে না কর্তৃপক্ষ? এই ন্যূনতম সেবাটুকু প্রদান করতে টাকার অঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠান তার গ্রাহক অর্থাৎ যাত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য আন্তরিক কি না সেটি।

সব যোগাযোগব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা থাকলেও একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে যে সেবাটা দেওয়ার চেষ্টা করা যেত, সেটি ছিল রেলসেবা। এত যাত্রী থাকার পরও রেলসেবার মান যে এ পর্যায়ে পড়ে আছে, সেটি গোটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা

কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে রাত ১১টার ট্রেনে উঠেছি। সেই ট্রেন ছাড়ল রাতের ১টায়। কিন্তু একটা ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের সেটি জানানো হয় না। এসি চেয়ারের বগিতে মাঝখানের সিটগুলোর ওপর লাগেজ ক্যারিয়ারের ব্যবস্থা থাকলেও বগির সামনের এবং পেছনের সিটগুলোর ক্ষেত্রে মাথার ওপর লাগেজ রাখার ব্যবস্থা নেই। অনেক দেশের ট্রেনগুলোতে প্রতিটি বগিতে সিট কমিয়ে আলাদা করে যাত্রীদের লাগেজ রাখার জন্য জায়গা রাখা হয়।

মাঝের সিটের যাত্রী এসে চিৎকার শুরু করলেন, ‘এই লাগেজ কার? আমার সিটের ওপর লাগেজ রাখলে আমি কোথায় লাগেজ রাখব?’ পেছনের সিটের যাত্রীরা জবাব দিলেন, ‘সাইডে কোথাও রাখেন, লাগেজ যে কেউ যে কোথাও রাখতে পারে।’ মাঝের সিটের যাত্রী মেজাজ খারাপ করে বললেন, ‘আমি সাইডে লাগেজ রাখলে সাইডের যাত্রী কোথায় রাখবে?’ ইতিমধ্যে একজন আবার ফিসফিস করে সতর্ক করে দিলেন, ‘বেশি কিছু বলার দরকার নাই, ওনারা বড় গ্রুপ, দলে ভারী।’

এ পর্যায়ে বড় গ্রুপ থেকে একজন বলে ফেললেন, ‘এটা একটা কমন সেন্সের ব্যাপার।’ কমন সেন্স ব্যাপারটা আসার পর বগিতে উত্তেজনা বিরাজ করতে শুরু করল। পেছন থেকে একজন আপা ইংরেজিতে কিছু একটা বলে ফেললেন। মাঝ থেকে উত্তর এল, ‘ইংরেজিতে বললেই তো সঠিক হয়ে গেল না।’ পাশ থেকে একজন আবার বললেন, ‘ইংরেজিতে যেহেতু বলেছেন, নিশ্চয় ঠিকই বলেছেন।’

এই ঠিক-বেঠিকের মধ্যে ভেসে এল নারীকণ্ঠের চিৎকার। ট্রেনের টয়লেটে ছিটিকিনি কাজ না করায়, ভেতরে একজন থাকা অবস্থায় অন্যজন যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেই এই চিৎকারের অবতারণা। সম্ভবত এ সমস্যারও সমাধান হলো, টয়লেটের সামনে ১০ টাকা লিখে একজনকে বসিয়ে দেওয়া।

ঢাকা–সিলেট রুটের ট্রেনে উঠেও দেখেছি একই অনিশ্চয়তা। যাওয়ার সময় ১০টার ট্রেন ছাড়ল রাত ১১টার পর। ফেরার সময় সিট পড়ল কেবিনে। পুলিশের পোশাক পরা দুজন কেবিনে প্রবেশ করলেন। জানালার পাশে থাকা যাত্রীকে নির্দেশ দিলেন, আপনি জানালার পাশ থেকে সরে এসে এদিকে বসেন।

বেচারা যাত্রী কিছুই বুঝে ওঠার আগে পুলিশ ভাইটি ‘স্যার স্যার, আপনি জানালার পাশে বসেন’ বলে ওনার স্যারকে কেবিনে ঢুকিয়ে দিলেন। স্যারও নিজের ইচ্ছেমতো সিটে বসাকে অধিকার মনে করে, আইফোনটা টেবিলে রেখে, জানালার পাশে গিয়ে বসে পড়লেন।

এ পর্যায়ে উল্টো দিকের জানালার যাত্রী ফোনে কাউকে বললেন, “স্যার মনে হয় ভুল করেছেন। বগি নম্বর ‘টিএ’। এটা টাকার ‘টিএ’ না, তালার ‘টিএ’। আপনার বগি ‘ট’ না, ‘ত’। আমি জেনে কনফার্ম করছি।” কিছুক্ষণ পর স্যারকে ফোন করে কনফার্ম করলেন, “স্যার, আপনার ওটা আসলে তরমুজের ‘টিএ’, আপনার বগি ‘ত’।” এ রকম বহু নাটক দেখতে দেখতে বিকেল চারটায় ছেড়ে আসা সিলেটের ট্রেন ঢাকা এসে পৌঁছাল রাত ১২টারও পর।

এ দেশে পর্যটনশিল্প বিকাশের বিশাল সুযোগ আছে। কিন্তু স্পটগুলো এতটাই অযত্নে, অবহেলায় থাকে, সাধারণ সেবাগুলোও সেখানে এতটাই সাদামাটা বা অনুপস্থিত যে অনেকেই একটু বেশি খরচ করে দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। অন্য সব যোগাযোগব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা থাকলেও একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে যে সেবাটা দেওয়ার চেষ্টা করা যেত, সেটি ছিল রেলসেবা। এত যাত্রী থাকার পরও রেলসেবার মান যে এ পর্যায়ে পড়ে আছে, সেটি গোটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। যাত্রীদেরও যে দায় নেই, সেটি বলা যাবে না। তবে কার্যকর উদ্যোগ এবং সেবার মান গ্রহণযোগ্য করার প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।

  • ড. বি এম মইনুল হোসেন অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • bmmainul@du.ac.bd