কোলাজ: প্রথম আলো
কোলাজ: প্রথম আলো

মতামত

আমেরিকান ড্রিম এবং অভিবাসন প্রতারণার গোলকধাঁধায় বাংলাদেশিরা

সম্প্রতি নিউইয়র্কে এক বাংলাদেশি অভিবাসন আইনজীবীর প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশ্বের প্রভাবশালী টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবিসির চ্যানেল ৭ একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছে। এবিসির মতো বিশ্বের প্রভাবশালী অন্যান্য গণমাধ্যমে, যেমন এমএসএন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাংলা চ্যানেলগুলো অভিবাসন প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার প্রচার করে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছে।

এসব মাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে অভিবাসন আইনজীবী না হয়েও আইনজীবীর মিথ্যা পরিচয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি এবং অন্যান্য দেশের বৈধ ও অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ওই ব্যক্তি ও তাঁর প্রতিষ্ঠান মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।

প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায় যে এক ব্যক্তির কাছ থেকেই ৬০ হাজার ডলার নেওয়া হয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, চক্রটি বাংলাদেশের ঢাকা শহরে অভিজাত এলাকাগুলোতে সুসজ্জিত অফিস সাজিয়ে এবং চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর নামে হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাদের নিঃস্ব করেছে।

আমাদের জানামতে, কোনো বাংলাদেশি ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নির মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা নিয়ে এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কোনো গণমাধ্যম সংবাদ প্রচার করেছে। কিন্তু এটি সত্যি যে যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের প্রায় দুই দশকের প্রবাসজীবনে বাংলাদেশি ইমিগ্রেশন আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার অনেক ঘটনা শুনেছি। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, অনেক উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিও প্রতারিত হওয়ার এই দলে রয়েছেন।

আমরা মনে করি যে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যুগপৎ কাজ করে অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষদের প্রতারক ও ভুয়া ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নিদের প্রতারণা থেকে অনেকটাই রক্ষা করতে পারে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ইমিগ্রেশন প্রতারকেরা বিভিন্ন কারণে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছে। জাতি-ধর্ম, বর্ণ-গোত্র, ধনী-গরিবনির্বিশেষে সারা বিশ্বের অনেক মানুষই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চায়। যেমনটি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও, ‘সুযোগ পেলে স্বাচ্ছন্দ্যে পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করত।’ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করার হাজারটি কারণ থাকলেও আমি এখানে কয়েকটি উল্লেখ করতে চাই।

প্রতারকদের বিজ্ঞাপনের ভাষা দেখলেই তা বোঝা যায়: ‘আপনি কি আমেরিকায় স্থায়ী হতে চান?’ ‘মাত্র ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আমেরিকায় গ্রিন কার্ড লাভ করুন।’ প্রতারকেরা জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কিংবা উত্তর সীমান্ত দিয়ে একজনকে নিয়ে আসার জন্য। এসে কী করল, ধরা পড়ল কি না, সে ব্যাপারে দালাল ও মানব পাচারকারীদের মাথাব্যথা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই যুগ বসবাস করার অভিজ্ঞতা এবং একজন বাংলাদেশি আমেরিকান নাগরিক হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি যে নানা সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সফল গণতান্ত্রিক দেশ।

এই দেশে নির্ভয়ে মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে নির্মিত সিনেমা অস্কারের মতো পুরস্কার জিততে পারে। এই দেশে মানুষ তাঁর মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী ক্যারিয়ারের চূড়ায় উঠে যায় এবং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা চাচা, মামা, খালার খুঁটির জোর লাগে না। অনেকের কাছেই মনে হতে পারে, এগুলো তো মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেই অনেক সময় অনেক মানুষের এসব মৌলিক অধিকার ভোগ করার ‘বিলাসিতা’ থাকে না।

অনেক উন্নয়নশীল ও সুশাসনবিহীন দেশের তুলনায় উন্নত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা অথবা বৈজ্ঞানিক উন্নতির কথা না হয় বাদই দিলাম, শুধু ওপরে বর্ণিত মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা আছে বলে তাবৎ দুনিয়ার বিলিয়ন মানুষ চোখের পলকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করতে এক পায়ে খাড়া।

আর সে কারণেই প্রতারক, মানব পাচারকারী ও ভুয়া ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নির মতো লোকজন সারা পৃথিবীর মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ট্রিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। এটি শুধু বাংলাদেশে কিংবা বাংলাদেশি ভুয়া অ্যাটর্নিদের মাধ্যমেই যে হচ্ছে, তা নয় বরং সারা দুনিয়ার প্রতারকদের কাছে এটি একটি লোভনীয় ইন্ডাস্ট্রি ও শিল্প।

এখানে অবাক হওয়ার কোনো বিষয় নেই, বিশ্বের অনুন্নত দেশের কোনো গরিব মানুষের পক্ষেই ৫০ থেকে ৭০ হাজার ডলার মাফিয়া, কার্টেল, মানব পাচারকারী অথবা ভুয়া ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নিদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা সম্ভব নয়। তাই শুধু অনেক ধনী ও দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের পক্ষেই মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করা সম্ভব। আর এটি অধিকাংশ বাংলাদেশি অভিবাসীর বেলায় প্রযোজ্য। অন্তত যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছ থেকে শোনা গল্প তাই বলে।

আমি ও আমার সহধর্মিণী যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারপ্রতি গড় বার্ষিক আয়ের হিসাব অনুযায়ী আমাদের পরিবারের আয় ওপরের দিকের ২০ ভাগের মধ্যে পড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি আয়ের দিক থেকে নিম্ন আয় কিংবা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করলেও বাংলাদেশে তাঁরা কিন্তু কোটিপতি। এ রকম অনেক কোটিপতি হয়তো দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা উপার্জন করেছেন বা করছেন। তাই তাঁদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে আসার জন্য ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ করা কোনো ব্যাপারই নয়।

এই গোষ্ঠীর লোকজনই ইমিগ্রেশন প্রতারণার অন্যতম টার্গেট। তাই প্রতারকেরা মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করে। প্রতারকদের বিজ্ঞাপনের ভাষা দেখলেই তা বোঝা যায়: ‘আপনি কি আমেরিকায় স্থায়ী হতে চান?’ ‘মাত্র ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আমেরিকায় গ্রিন কার্ড লাভ করুন।’ প্রতারকেরা জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কিংবা উত্তর সীমান্ত দিয়ে একজনকে নিয়ে আসার জন্য। এসে কী করল, ধরা পড়ল কি না, সে ব্যাপারে দালাল ও মানব পাচারকারীদের মাথাব্যথা নেই।

সাধারণত অনুন্নত দেশগুলোকে, যারা অত্যধিক জনসংখ্যা ও চরম দারিদ্র্য নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, এ ব্যাপারে প্রতিরোধ করার জন্য তেমন জোরালো ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখি না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মতো দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। এটি হবে অনেকটা রোগ হওয়ার পর ওষুধ দেওয়ার চেয়ে রোগ হওয়ার আগে রোগের প্রতিরোধ করা।

অবৈধ অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করা এবং অবৈধ অভিবাসনের দুঃখজনক পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতামূলক প্রচার ও প্রচারণা চালাতে হবে। মার্কিন দূতাবাস সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একযোগে কাজ করে অভিবাসন প্রতারকদের বিচারের আওতায় আনতে পারে।

  • ড. দিলওয়ার আরিফ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কেনিসাস ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজমের সহযোগী অধ্যাপক delawarearif@gmail.com
    মতামত লেখকের নিজস্ব