গত ১০ বছরে হজের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ এই সময়ে দেশের মানুষের গড় আয় কি দ্বিগুণ হয়েছে?
গত ১০ বছরে হজের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ এই সময়ে দেশের মানুষের গড় আয় কি দ্বিগুণ হয়েছে?

মতামত

তিন প্রজন্ম ও একটি স্যুটকেস: হজ কি মধ্যবিত্তের নাগালে আর ফিরবে না

তিন দশক আগের কথা। একদিন খুব সকালে মসজিদের মক্তব থেকে ফেরার পথে শোরগোল শুনি, মহাজন ফিরে এসেছেন। ভিড়ের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখি, তিনি বড় একটি স্যুটকেসের সামনে বসে কাউকে সাবান, কাউকে জায়নামাজ, কাউকে তসবিহ আবার কারও হাতে একটা খেজুর তুলে দিচ্ছেন। মুখে তাঁর অর্গল-খোলা মক্কা-মদিনার কাহিনি। শ্রোতারা গ্রামের নারী-পুরুষ। হাজি হওয়ার গৌরব মহাজনের যতখানি, তার চেয়ে গ্রামবাসীর গৌরব কোনো অংশে কম নয়—আজ থেকে আমাদের গ্রামেও একজন হাজি আছেন।

তারও দেড় দশক পরে বাবা হজে যান। ঢাকার উদ্দেশে রওনা করার সময় তাঁকে বিদায় জানাতে লঞ্চঘাটে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ঢল নেমেছিল। বাবা সেখানে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। হাত তুলে বলেন, ‘আল্লাহ, এই গরিবকে আপনি হজে যাওয়ার তৌফিক দিয়েছেন, আমি শুধু হজই করব।’

সেই প্রার্থনার অর্থ সেদিন না বুঝলেও ফিরে আসার পরে বুঝলাম। বাবার হাতে কোনো স্যুটকেস ছিল না, ছেলের জন্য একটা টুপিও আনেননি তিনি। শুধু হজটাই করেছিলেন। সত্যি বলতে, বাবার স্যুটকেস ভরার সামর্থ্যও ছিল না।

হজ তো শুধু একটা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বাংলার মুসলিম সমাজে এই এমন আরাধ্য স্বপ্নই। এক জীবনের সঞ্চয় আর শেষ বয়সের পরম প্রাপ্তি। গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহরের নাগরিক জীবনেও আমরা দেখে অভ্যস্ত—একজন মানুষ তার সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো অর্থ দিয়ে আল্লাহর ঘর জিয়ারতের নিয়ত করেন।

হজের সঙ্গে অর্থের সংযোগ প্রাচীনকাল থেকেই ছিল, যেহেতু দূরদেশে যাত্রা। গরিব যাত্রীরা সেসময় মুসাফির বেশে যাত্রা করতেন। চলতি পথের পাশে বাড়িঘর যাঁদের, তাঁরা আল্লাহর ঘরের মেহমানকে সাদরে কবুল করে বরকত নিতেন। ধনাঢ্যরাও পুণ্যের আশায় ধর্মভীরু মুসল্লিদের নিজেদের কাফেলায় শামিল করতেন। শুধু বিত্তবান ছাড়া অন্যরা কাবার স্বপ্ন দেখতে পারবে না, এমন কখনো হয়নি।

দাদা হজ করেছেন আবার স্যুটকেস ভরা উপহারও এনেছেন, বাবা শুধু হজ করতে পেরেছেন, শূন্য স্যুটকেস। আর ছেলে হজই করতে পারছে না। তিন দশকের ব্যবধানে দেশের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সামর্থ্য কীভাবে কমে এসেছে, এটি তারও একটি বাস্তব চিত্র।

আমাদের মহাজন আর্থিক বিবেচনায় ধনী ছিলেন না। হ্যাঁ, সচ্ছল কৃষক ছিলেন বটে। কয়েক মৌসুমের উদ্বৃত্ত ধান এবং সঙ্গে একখণ্ড চাষের জমি বিক্রি করলে সেসময় হজের খরচ জোগানো যেত। পুণ্যভূমিতে পৌঁছার পর প্রবাসীরাও সহযোগিতা করতেন। আমার বাবা ছোট সরকারি চাকরি করেছেন, কিছুটা সঞ্চয় আর কিছুটা ঋণ করে তিনিও হজ পালন করতে পেরেছেন। এখানে বলতেই হয় যে হজ শুধু সামর্থ্যবানদের জন্য ফরজ হলেও, আল্লাহর পবিত্র ঘর ও নবীজীর (সা.) পূণ্যভূমি জেয়ারতে ধর্মপ্রাণ অনেক মানুষ ঋণ করে হলেও ছুটে যান হজ বা ওমরাহ করতে।

কিন্তু গত এক দশকে হজের খরচ যেভাবে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, তাতে সেই পবিত্র স্বপ্ন এখন মধ্যবিত্তের জন্য এক দীর্ঘশ্বাস। বলতে দ্বিধা নেই, তিন দশক আগে মহাজনের যে বার্ষিক আয় ছিল এবং তার দেড় দশক পরে বাবার যে মাইনে ছিল, তারও দেড় দশক পরে এসে হিসাব করলে ছেলের বেতন সংখ্যায় তার কয়েক গুণ। তবু হজ এখন ছেলের চোখের অলীক স্বপ্ন।

‘আমরাও কাবার গিলাফ ধরে কাঁদার সুযোগ চাই।’

দাদা হজ করেছেন আবার স্যুটকেস ভরা উপহারও এনেছেন, বাবা শুধু হজ করতে পেরেছেন, শূন্য স্যুটকেস। আর ছেলে হজই করতে পারছে না। তিন দশকের ব্যবধানে দেশের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সামর্থ্য কীভাবে কমে এসেছে, এটি তারও একটি বাস্তব চিত্র। এখনো মধ্যবিত্তদের বড় অংশ হজে যায়। তবে তাদের পেনশন বা সারাজীবন জমা করা টাকায়। এ ছাড়া হজে যাওয়ায় তারা সামর্থ্যহীন। ট্রাভেল এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হলে অনেকের আর হজও করা হয় না, পেনশনের টাকাটাও খোয়াতে হয়।

প্রশ্ন ওঠে, হজ কি এখন তাহলে শুধু বিত্তশালীদের সংরক্ষিত সুবিধা?
২০১৫ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ ছিল তিন লাখ টাকার নিচে। এক দশকের ব্যবধানে ২০২৬ সালে এসে একই মানের খরচ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ টাকার কাছাকাছি। গত ১০ বছরে হজের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ এই সময়ে দেশের মানুষের গড় আয় কি দ্বিগুণ হয়েছে?

কয়েক বছর আগেও হজের নিবন্ধন শুরু হলে দেখতে দেখতে কোটা পূরণ হয়ে যেত। এমনকি তিন-চার বছর আগে থেকে গমনেচ্ছুকরা বুকিং দিয়ে চাতকের ন্যায় অপেক্ষায় থাকতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের চিত্র পুরোই বিপরীত।

এ বছর বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮টি কোটার মধ্যে মাত্র ৭৬ হাজার ৫৮০ জন নিবন্ধন করেছেন। অর্থাৎ কোটার ৪৪ শতাংশ খালি পড়ে আছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, মানুষের ভক্তিও কমেনি, কমেছে কেবল হজে যাওয়ার ‘সামর্থ্য’।

একসময় হজযাত্রীরা মক্কা-মদিনায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাড়িতে উঠতে পারতেন। অনেকে কাবা চত্বরে ঘুমিয়ে রাত পার করে দিতেন। এখন সৌদি আরবের কড়া নিয়ম, আবাসনের বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় বাড়ি ভাড়া করা বাধ্যতামূলক। তার ওপর কাবা শরিফের আশপাশের পুরোনো ও সাশ্রয়ী হোটেলগুলো ভেঙে সুউচ্চ সব অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়েছে, যার ভাড়া সাধারণ হাজিদের নাগালের বাইরে। কয়েক কিলোমিটার দূরের আজিজিয়া বা মিসফালাহতেও মধ্যবিত্তের জায়গা হয় না। ধীরে ধীরে ধনীদের বেষ্টনীতে আটকা পড়ে যাচ্ছে কাবা। সাদা ইহরাম যেন এখন আর সাম্যের প্রতীক নয়; বিত্তের পতাকা—ধনী-নির্ধন বৈষম্যের উজ্জ্বল বিভাজিকা।

হজ খরচের একটি বিশাল অংশ গ্রাস করে বিমানভাড়া। ঢাকা-জেদ্দা রুটে সাধারণ সময়ে যে ভাড়া লাগে, হজের মৌসুমে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়। বর্তমান সরকার বিমানভাড়া কিছুটা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে লাগাম পরাবে কে? বিমান প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে বিমানভাড়া আরও ২০ হাজার টাকা কমানোর চেষ্টা চলছে। যদিও মোট খরচের হিসাবে তা ৩ শতাংশের কম, কিন্তু তা-ও কি আদৌ সম্ভব হবে?

বছর বছর মুদ্রাস্ফীতির যোগ তো আছেই। তার ওপর ইরান যুদ্ধে বিশ্বে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া তাদের হজের খরচ ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো নির্দেশ দিয়েছেন যে বাড়তি খরচের বোঝা হাজিদের ওপর চাপানো যাবে না। আমাদের সরকার কি তেমন কোনো সাহসী ভর্তুকির কথা ভাবতে পারবে?

হজ কোনো পর্যটন নয় যে চাহিদা ও জোগানের ফর্মুলায় এর বিচার হবে। এটি একটি ধর্মীয় আবেগ ও অধিকার। সরকার যদি দ্রুত বিমানভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে না নামায় এবং মুয়াল্লিম ফি কমানোর জন্য সৌদি সরকারের সঙ্গে শক্তিশালী কূটনৈতিক আলোচনায় উদ্যোগী না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোটা আরও শূন্য হবে।

আমরা চাই না আল্লাহর ঘর জিয়ারত কেবল অভিজাতদের বিলাসিতা হয়ে উঠুক। মধ্যবিত্তের কপালে যেন হজের স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস না জোটে। আমরাও কাবার গিলাফ ধরে কাঁদার সুযোগ চাই।

  • মনযূরুল হক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

    মতামত লেখকের নিজস্ব