উজানে কী পরিমাণ পানি ভারত সরিয়ে নিচ্ছে, তা জানার অধিকার এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে একটি ন্যূনতম পরিমাণের পানির নিশ্চয়তা বাংলাদেশকে দিতে হবে।
উজানে কী পরিমাণ পানি ভারত সরিয়ে নিচ্ছে, তা জানার অধিকার এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে একটি ন্যূনতম পরিমাণের পানির নিশ্চয়তা বাংলাদেশকে দিতে হবে।

আসিফ নজরুলের কলাম

ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কেন নতুন করে ভাবতে হবে

১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ১২ ডিসেম্বরে। এর মধ্যে চুক্তিটি নবায়ন না হলে বা নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে এই তারিখের পর থেকে ভারত কর্তৃক ইচ্ছেমতো গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে কোনো বাধা থাকবে না। অতীতের নিরিখে বলা যায়, এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। 

গঙ্গার পানিবণ্টনের এর আগের সর্বশেষ চুক্তিটি (সমঝোতা স্মারক) সমাপ্ত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। এর পর থেকে ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করছিল। ফলে চুক্তিকালের তুলনায় এ সময় বাংলাদেশে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি হ্রাস পায়। ১৯৯৩ সালের ৩১ মার্চের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ অভিযোগ করে, ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ ৩০ মার্চ স্মরণকালের সর্বনিম্ন ৯ হাজার ২১৮ কিউসেকে পৌঁছায় এবং এতে বাংলাদেশে গঙ্গার ওপর নির্ভরশীল প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে গুরুতর অসুবিধার সৃষ্টি হয়। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভারতকে একতরফা গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, সব যৌথ নদীর ওপর বাংলাদেশের ‘সহজাত ও আইনি অধিকার’-এর কথা উল্লেখ করেন এবং ‘অবশ্যই একটি স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে অবিলম্বে গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে’ বলে অভিমত প্রকাশ করেন। অবশেষে কয়েক দফা আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে একটি দীর্ঘমেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। 

 ১৯৯৬ সালের এই চুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশের অভিযোগও আছে। তারপরও গত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আদৌ কোনো চুক্তি না থাকলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আরও অসহায় অবস্থায় পড়ে। বাংলাদেশকে তাই ১২ ডিসেম্বরের আগে চুক্তি সম্পাদনের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য আলোচনা শুরু করতে হবে অনতিবিলম্বে। 

গঙ্গার পাশাপাশি বাংলাদেশকে অবিলম্বে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের দাবি তুলতে হবে। এই চুক্তি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে আটকে আছে—এমন বক্তব্য বিজেপি নেতারা বিভিন্ন সময় দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তাই এ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার দাবি বাংলাদেশ করতে পারে। তা ছাড়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি অনুসারেও তিস্তা ও অন্যান্য যৌথ নদী নিয়ে চুক্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

 ২. 

গঙ্গা চুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনায় অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে চুক্তি বাস্তবায়নকালে সময়ের অভিজ্ঞতার ওপর। এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিল ফারাক্কা পয়েন্টে বাংলাদেশ ও ভারতের (পশ্চিমবঙ্গের) জন্য গঙ্গার পানি ভাগাভাগি। এ ছাড়া এই চুক্তিতে ন্যায়পরায়ণতা, ন্যায্যতা ও কোনো ক্ষতি নয়—এসব নীতিমালার ভিত্তিতে অন্যান্য যৌথ নদীর পানি ভাগাভাগি এবং গঙ্গার পানির স্বল্পতার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সমঝোতামূলক প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল। এসব লক্ষ্যের কোনোটিই ঠিকমতো অর্জিত হয়নি। 

গঙ্গার পানি ভাগাভাগির ব্যবস্থাটি ১৯৭৭ সালের প্রথম চুক্তি থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কারণ, এতে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের পর ফারাক্কায় আসা অবশিষ্ট পানি ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে এতে কোনো সংকটকালে গ্যারান্টি ক্লজের মাধ্যমে (বাংলাদেশের জন্য পানিপ্রবাহ কোনো অবস্থাতেই চুক্তি করা অংশের ৮০ শতাংশের নিচে নামতে পারবে না) ন্যূনতম পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। 

১৯৯৬ সালের চুক্তিতে এই গ্যারান্টি ক্লজ বাদ দেওয়ার কারণে উজানে (উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ) ভারত অবারিত পানি প্রত্যাহারের সুযোগ পেয়ে যায়। উজানে কী পরিমাণ পানি ভারত বিভিন্ন সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে সরিয়ে নিচ্ছে, সেটি জানার কোনো অধিকারও সেখানে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়নি। আবার ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ফারাক্কায় ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত পানির ৭৫ শতাংশ প্রাপ্যতার ভিত্তিতে পানি ভাগাভাগির বন্দোবস্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের ফারাক্কায় গড় প্রবাহের ভিত্তিতে আন্দাজকৃত পরিমাণ পানি ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা হয়। অথচ ১৯৬০-এর দশক থেকে উজানে অব্যাহতভাবে সেচ প্রকল্পগুলো বিস্তৃতির পর সেখানে গড় প্রবাহ থাকার কোনো কারণই ছিল না।

 চুক্তি বাস্তবায়নের সময় তাই প্রায়ই বাংলাদেশ চুক্তিতে ধারণাকৃত বা উল্লেখিত পানির চেয়ে কম পরিমাণ পানি পায়। বর্তমান স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ পানিসম্পদমন্ত্রী থাকাকালে ২০০৩ ও ২০০৫ সালের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে এ নিয়ে জোরালো অভিযোগ করেছেন এবং এ জন্য উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারকে দায়ী করেছেন। 

তারপরও এ সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি।

২০১৭ সালে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ কিম্বার্লি থমাস পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমের ২৭টি সংকটকালীন সময়ে ১৫ বার বাংলাদেশ ন্যূনতম পরিমাণ পানিপ্রবাহ যেতে ব্যর্থ হয়েছে। 

৩. 

পানি কম পাওয়ার অভিযোগের কারণ হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ যা বলেছিলেন, তার প্রমাণ নিরপেক্ষ গবেষণাতেও পাওয়া যায়। ২০১২ সালের ‘রিচিং অ্যাক্রোস দ্য ওয়াটার্স: ফেসিং দ্য রিস্কস অব কো-অপারেশন ইন ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার্স’ শিরোনামের বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বাংলাদেশে পানির কম প্রাপ্যতার তিনটি কারণ চিহ্নিত হয়। একটি আবহাওয়াজনিত। কিন্তু অন্য দুটি হচ্ছে গঙ্গার সমস্ত প্রবাহপথের পানি ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে চুক্তিটির ব্যর্থতা এবং চুক্তি প্রণয়নে পুরোনো তথ্যর ব্যবহার। 

গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশকে জোরালোভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে উজানে কী পরিমাণ পানি ভারত সরিয়ে নিচ্ছে, তা জানার অধিকার এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে একটি ন্যূনতম পরিমাণের পানির নিশ্চয়তা বাংলাদেশকে দিতে হবে। এই নিশ্চয়তা না পেলে বহুল আলোচিত গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করেও আমরা প্রত্যাশিত সুফল পাব না। 

গঙ্গা চুক্তিতে পরিবেশ রক্ষার বা প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান নেই। অথচ এগুলো আন্তর্জাতিক নদী আইনের কোডিফিকেশনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, প্রথাগত বিধান হিসেবেও স্বীকৃত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন একটি উঁচু মানের কোডিফিকেশনের (১৯৯২ ইউএনইসিই ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটারকোর্স কনভেনশন) পক্ষরাষ্ট্র হয়েছে বাংলাদেশ। উপরিউক্ত দাবিগুলো উত্থাপনের বাংলাদেশের অবস্থান এতে আরও জোরালো হয়েছে। 

৪. 

গঙ্গা চুক্তির উল্লেখিত সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনায় সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান চুক্তিটি বছরখানেকের জন্য নবায়নের প্রস্তাব আসতে পারে। কিন্তু তাই বলে নবায়নের অজুহাতে গঙ্গা চুক্তির মৌলিক ত্রুটিগুলো নিয়ে আলোচনা যেন থেমে না থাকে। এ লক্ষ্যে যৌথ নদী কমিশনে উপযুক্ত ব্যক্তিদের পদায়ন এবং একে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ সরকার নিতে পারে।

গঙ্গার পাশাপাশি বাংলাদেশকে অবিলম্বে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের দাবি তুলতে হবে। এই চুক্তি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে আটকে আছে—এমন বক্তব্য বিজেপি নেতারা বিভিন্ন সময় দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তাই এ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার দাবি বাংলাদেশ করতে পারে। তা ছাড়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি অনুসারেও তিস্তা ও অন্যান্য যৌথ নদী নিয়ে চুক্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

শুধু দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বদলে যৌথ নদীগুলোর অববাহিকাভিত্তিক উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও চিন্তা করা যেতে পারে। ২০১১ সালের বাংলাদেশ ও ভারতের ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট এমন উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বর্তমানে আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপেও বিভিন্ন নদীর অববাহিকাভিত্তিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমাদের নিকটেই রয়েছে মেকং নদীর অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সুন্দর নজির। 

আমরা আর কতকাল পিছিয়ে থাকব? 

আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। আন্তর্জাতিক নদী আইনে পিএইচডি করেছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

* মতামত লেখকের নিজস্ব