
বিপ্লবপূর্ব চীনের চিং রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন আইসিন-গিয়োরো পু ঈ, যিনি মাত্র তিন বছর বয়সে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। মাওলানা ভাসানীর ষাটের দশকে চীন ভ্রমণের সময় পু ঈ-এর সঙ্গে তাঁর চার ঘণ্টার দীর্ঘ আলাপের কথা তাঁর ভ্রমণ কাহিনি ‘মাও সে তুং এর দেশে’ উল্লেখ করেন। পু ঈ তাঁর যৌবনে চীনের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে গিয়ে জাপানিদের সাহায্য করতে থাকেন এবং এর ফলে ১৯৩৪ সালে জাপান তাঁকে মাঞ্চুকুয়ো নামক একটি রাষ্ট্র গঠন করে তাঁকে সম্রাট ঘোষণা করে।
১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লবের পরে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ১০ বছর কারাভোগের পর যখন তাঁর সামগ্রিক ও আদর্শিক আত্ম-সংস্কার দৃশ্যমান হয়, তখন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ কারাভোগ মূলত ছিল তাঁর ভুল শোধরানো ও অনুশোচনা তৈরির একটি প্রক্রিয়া, যার ফলে তিনি তাঁর বাকি জীবনকে সমাজতান্ত্রিক চীনের উন্নয়নের জন্য উৎসর্গ করেন। এমনকি তিনি তাঁর একসময়ের বাসস্থান ‘ফরবিডেন সিটিতে’ টিকিট কেটে ঘুরতে যান। পু ঈ-এর জীবনের শেষভাগটিকে আমরা দেখতে পারি রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশনের একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে।
আমরা যখন জুলাই-পরবর্তী সময়ের দুই বছর পার করছি, ঠিক তখনই নানা পরিসরে রিকনসিলিয়েশনের আলোচনা দেখছি ও শুনছি। আমরা দেখতে পাই যে এক পক্ষ যেমন রিকনসিলিয়েশনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, আবার অন্য একটি পক্ষ এর তীব্র বিরোধিতা করছে।
তবে যে আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে রিকনসিলিয়েশনের আলাপ চলমান, সেই তারাই আবার জুলাইয়ে তাদের ভূমিকা নিয়ে যখন একধরনের ডিনায়াল বা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রিকনসিলিয়েশনের আলাপ কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্নও আমাদের সামনে আসছে।
আবার জুলাইয়ের উদ্যম ধারণকারী অনেকেই মনে করছে এত শিক্ষার্থী জনতার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কী করে তারা রিকনসিলিয়েশনের কথা ভাববে। ফলে রিকনসিলিয়েশনের আলাপ চলমান থাকলেও এটা যে বেশ কঠিন এক বিষয়, তা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না।
আবার বৈশ্বিক উদাহরণগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বদলের ধরনও আলাদা। ফলে বৈশ্বিক রিকনসিলিয়েশনের উদাহরণ নিয়ে যুক্তি দিলেও সেই উদাহরণ যে আমাদের দেশে কাজ করবে, সেটাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। আমরা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারে রিকনসিলিয়েশনের কিছু প্রতিশ্রুতি দেখতে পেলেও, তারা কী করে এর বাস্তবায়ন করতে চায় সে বিষয়ে কোনো পরিষ্কার দিকনির্দেশনা নেই।
আমাদের এ-ও মনে রাখতে হবে যে একটি বিভক্ত সময়ে যখন জাতীয় ঐক্যের একটি স্পষ্ট অভাব, ঠিক সেই সময়ে বিএনপি সরকারের পক্ষেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট একটি অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন একটি কাজ। আবার এ-ও সত্য যে আমরা কখনোই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের সবকিছু বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে দেখতে পাইনি।
আওয়ামী লীগের ডিনায়ালের রাজনীতি ও অবস্থান আবারও জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় গত ৫ আগস্ট ভারতের দিল্লিতে তাদের একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। যেখানে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে আওয়ামী লীগ মনেই করে যে ২০২৪ সালের এর জুলাই-আগস্টে তারা অনুশোচনা করার মতো কোনো কিছু করেনি।
আওয়ামী লীগের ডিনায়েলমূলক অবস্থান পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল সজীব ওয়াজেদ জয় ও শেখ হাসিনার বক্তব্যে। আবার যখন প্রশ্ন করা হয়, তাঁরা কি আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতার জন্য দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা করবেন? এর উত্তর থেকে এটাও পরিষ্কার হয় যে ক্ষমা চাওয়ার কোনো ধরনের তাগিদ তাঁদের মধ্যে নেই।
জুলাইকে আওয়ামী লীগ যেভাবে উপস্থাপন করে তেমন অবস্থান থেকে ফিরে না এলে এ দেশের একটা প্রজন্মের কাছে তাদের অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১-এর ভূমিকার কালিমা বয়ে বেড়ানোর মতোই হবে। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন ধরনের অবস্থানে যাবে?
অপর দিকে শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যের একপর্যায়ে বললেন যে তিনিও রিকনসিলিয়েশন চান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ মনে করে তাদের অনুশোচনার কোনো প্রয়োজন নেই এবং সে কারণে ক্ষমা চাওয়ারও কোনো প্রয়োজন তাঁরা দেখেন না, তেমন বাস্তবতায় রিকনসিলিয়েশন কীভাবে সম্ভব, সে এক বড় প্রশ্ন।
অথচ রিকনসিলিয়েশনের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো দোষীপক্ষের মধ্যে অনুশোচনা এবং তার ভুলকে অনুধাবন করার একটি তাড়না তৈরি করা। এটি অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত এবং ভবিষ্যতেও হবে কি না বলা মুশকিল। যদিও আমরা জানি যে এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তাদেরও সেই পরিবেশ তৈরি এবং দোষী দলের ভুল শোধরানোর সুযোগ ও ভরসা তৈরি করতে হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এসবই অনেকটা অনিশ্চিত।
এমন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ তাদের অনমনীয় অবস্থান নিয়ে কী করে এই বিভাজিত রাজনীতি থেকে ঐক্যের রাজনীতিতে ফিরে আসবে, তা এক প্রশ্ন তৈরি করছে। ক্ষমা চাওয়া কিংবা অনুশোচনার অভাব কেবল দলের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যেই দৃশ্যমান নয় বরং জনপরিসরে তাঁদের অধিকাংশ সমর্থক ও কর্মীর মধ্যেও সেটি দৃশ্যমান। আবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে তাঁদের সেই রিকনসিলিয়েশন চাওয়াকেও যে এ দেশের অধিকাংশ মানুষ মেনে নেবে না, সেটাও বেশ পরিষ্কার।
জুলাইকে আওয়ামী লীগ যেভাবে উপস্থাপন করে তেমন অবস্থান থেকে ফিরে না এলে এ দেশের একটা প্রজন্মের কাছে তাদের অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১-এর ভূমিকার কালিমা বয়ে বেড়ানোর মতোই হবে।
এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন ধরনের অবস্থানে যাবে, কেননা আওয়ামী লীগের এমন অনমনীয় অবস্থান মূলত রিকনসিলিয়েশনের যে ক্ষীণ সম্ভাবনা আমরা দেখছিলাম সেটিরও অবসান ঘটাতে পারে বলে মনে হয়। তাদের অবস্থান থেকে রিকনসিলিয়েশনের ইতিবাচক সাড়া না এলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই রিকনসিলিয়েশনের দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করাও আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক ইগো ও প্রতিহিংসাপরায়ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রিকনসিলিয়েশন যে সম্ভব না সেটা ইতিমধ্যে পরিষ্কার। এটা দোষী দলের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ঠিক তেমনি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের জন্যও প্রযোজ্য। এমন একটি অবস্থায় বিগত সময়ের এরশাদের স্বৈরশাসনের পরে তাঁর বিচারপ্রক্রিয়ার উদাহরণও আমরা এখানে টানতে পারি। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি একসময় এরশাদের নেতৃত্বেই আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসে।
যদিও আমরা এই দৃষ্টান্তকে রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশনের উদাহরণ হিসেবে খুব একটা মানতে চাই না। ফলে এটা উদাহরণ হিসেবে আমাদের আলোচনায় আসে না। কিন্তু এটিও একটি হোম গ্রোওন বা দেশীয়, স্বতন্ত্র ও বাস্তববাদী রিকনসিলিয়েশনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও এখানে ঠিক রিকনসিলিয়েশনের সব পূর্বশর্ত যেমন জবাবদিহি, সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের দুর্দশাকে স্বীকার করে নেওয়া, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং অতীতে সংঘটিত নিপীড়ন ও অধিকার লঙ্ঘনের সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়গুলো ছিল না।
তবে এসব না থাকলেও, এই ঘটনা বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক উদাহরণ। কেননা এটি এমন একটি মডেলের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সত্য উদ্ঘাটন ও অপরাপর হিসাব-নিকাশের তুলনায় দোষী ও সাবেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাই আমাদের রিকনসিলিয়েশনের জনপরিসরের পশ্চিমা মডেলের আলাপের বাইরে গিয়ে দেশীয় বা স্বতন্ত্র ও বাস্তববাদী মডেল নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আবার ডিনায়ালের রাজনৈতিক পরিসর থেকে বের না হতে পারলেও রিকনসিলিয়েশন কেবলমাত্রই কাগুজে আলাপই রয়ে যাবে।
বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব