প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

মতামত

প্রবাসী কার্ড কি অভিবাসন ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি দেশের প্রবাসীরা। অথচ কাজ খোঁজা থেকে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ছাড়পত্র, বিদেশে সুরক্ষা, দেশে পরিবারের সহায়তা এবং ফিরে এসে নতুন জীবন শুরু—এই পুরো অভিবাসনযাত্রায় একজন প্রবাসীকে এখনো বিচ্ছিন্ন ও জটিল সেবাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান যতটা দৃশ্যমান, রাষ্ট্রীয় সেবার কাঠামো এখনো ততটা সমন্বিত নয়।

এই বাস্তবতায় সরকারের প্রবাসী কার্ড উদ্যোগটি শুধু আরেকটি কার্ড হিসেবে নয়; বরং এটি পুরো প্রবাসী সেবাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ। সরকার আগামী মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী কার্ডের পাইলট কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এই কার্যক্রমের লক্ষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে ২ লাখ কার্ড বিতরণ করা। পরিকল্পনায় সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করার কথা রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই পাঠান না; দেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রা, ভোগ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও সচল রাখছেন। তাই প্রবাসী কার্ডের সাফল্যের মাপকাঠি কতটি কার্ড বিতরণ হলো, তার ওপরে নয়। এটি কি বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে হুন্ডির চেয়ে সহজ ও আকর্ষণীয় করবে, বিদেশে বিপদে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করবে, দেশে পরিবারের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করবে, আর ফিরে আসা কর্মীদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয়কে কি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারবে?

কার্ড নয়, দরকার জীবনচক্রভিত্তিক সেবা

প্রবাসী কার্ডকে শুধু একটি ডেবিট কার্ড হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। এটিকে একজন অভিবাসীকর্মীর পুরো জীবনচক্রের ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

প্রথম ধাপ হতে পারে একটি যাচাই করা বিদেশি চাকরির তথ্যভান্ডার। কোন দেশে কোন পেশায় কী ধরনের কর্মীর চাহিদা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, বেতন, নিয়োগকর্তা, নিয়োগ ব্যয় ও চুক্তির মেয়াদ—এসব তথ্য আগেই কর্মীদের জানানো উচিত। বাংলাদেশ মিশন বা অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া কোনো চাকরির তথ্য প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা উচিত নয়। এতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে, একই সঙ্গে সরকারও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার বাস্তব চিত্র পাবে।

বাংলাদেশ এখনো বিপুলসংখ্যক অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠায়, অথচ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই শুধু কতজন বিদেশে গেলেন, সেটি নয়; তাঁরা কী দক্ষতা নিয়ে যাচ্ছেন এবং কত আয় করছেন, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত সূচক।

এই প্ল্যাটফর্মে একজন কর্মী দেখতে পারবেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন্য কী প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রয়োজন এবং কোথায় তা পাওয়া যাবে। প্রশিক্ষণ শেষে সনদ ডিজিটাল প্রোফাইলে যুক্ত হলে অনুমোদিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও সহজে যাচাই করা দক্ষ কর্মী খুঁজে নিতে পারবে।

পরবর্তী ধাপে বিএমইটি নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সনদ, মেডিক্যাল রিপোর্ট, বিমা, চাকরির চুক্তি, বেতন, অভিবাসন ব্যয়, ছাড়পত্রসহ সব তথ্য কর্মীর নিজস্ব ডিজিটাল প্রোফাইলে সংরক্ষিত থাকবে। বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই নিশ্চিত হতে পারবেন সরকারি নথিতে চাকরির শর্ত বাস্তব চুক্তির সঙ্গে মিলছে কি না।

বিদেশে অবস্থানকালে অভিযোগ, বিমা দাবি বা জরুরি সহায়তার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের অগ্রগতি অনুসরণ করা যাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ মিশন, বিএমইটি, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠানো যাবে।

প্রবাসী শ্রমিক

সবশেষে দেশে ফেরা কর্মীদের অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ দেশ ছাড়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন থেকে শুরু করে দেশে ফিরে সেই দক্ষতার পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো অভিবাসন-জীবনচক্রকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবাব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

বৈধ পথকে সুবিধাজনক করতে হবে

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪০-৪৫ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে হুন্ডির মাধ্যমে। এই বিপুল অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ দেখায়, শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বৈধ পথে টাকা পাঠানোকে আরও সহজ, দ্রুত ও লাভজনক করতে হবে।

প্রবাসী কার্ড এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার এর আওতায় রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ক্রেডিট স্কোরিং চালুর কথা জানিয়েছে। এসব সুবিধা এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের সুফল পান।

প্রবাসীদের অনেকেই দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও তথ্যের অভাব, জটিলতা, অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটে পিছিয়ে যান। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র, অবসর ভাতা স্কিম, সরকারি বন্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, আবাসন, শিল্পাঞ্চল এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ যুক্ত করা গেলে প্রবাসী আয় ভোগের পাশাপাশি দেশের উৎপাদনশীল খাতেও আরও বেশি প্রবাহিত হতে পারে।

বৈধ চ্যানেলে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ও নিয়মিততার ভিত্তিতে প্রবাসীর অ্যাকাউন্টে রিওয়ার্ড পয়েন্ট জমা হতে পারে। তবে তা প্রতীকী পুরস্কারে সীমিত রাখলে হবে না। এসব পয়েন্ট রেমিট্যান্স বা ব্যাংকিং ফি, বিমার প্রিমিয়াম, বিমানবন্দর ও প্রবাসী সেবা কিংবা নির্দিষ্ট সরকারি সেবার ফি পরিশোধে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিয়মিত প্রেরকদের জন্য উচ্চতর রিওয়ার্ড স্তরও চালু করা সম্ভব।

ক্রেডিট স্কোরিংয়েরও বাস্তব আর্থিক মূল্য থাকতে হবে। অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর দেশে অর্থ পাঠালেও প্রচলিত বেতন হিসাব বা ঋণের ইতিহাস না থাকায় ব্যাংক তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। রেমিট্যান্সের পরিমাণ ও ধারাবাহিকতাকে আর্থিক প্রোফাইলের অংশ করা গেলে ব্যাংকগুলো ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে এই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে।

তবে রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ক্রেডিট স্কোরিংয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো টাকা পাঠানোর অভিজ্ঞতা। একজন প্রবাসী যেন বাসা থেকেই মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কয়েকটি সহজ ধাপে অর্থ পাঠাতে পারেন এবং তাঁর পরিবার তা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক হিসাব, মোবাইলে আর্থিক সেবা বা কার্ডে পায়। জটিল প্রক্রিয়া, বাড়তি যাতায়াত ও দীর্ঘ অপেক্ষা বৈধ চ্যানেলকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়।

হুন্ডির বড় শক্তি এর গতি ও সুবিধা। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বৈধ ব্যবস্থাকে সেবার মানেও এগিয়ে নিতে হবে। সহজ ডিজিটাল রেমিট্যান্স তাৎক্ষণিক সুবিধা দেবে, রিওয়ার্ড পয়েন্ট আর্থিক প্রণোদনা তৈরি করবে এবং ক্রেডিট স্কোরিং নিয়মিত লেনদেনকে দীর্ঘমেয়াদি সুযোগে রূপ দেবে। এই তিনটি ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর হলে বৈধ চ্যানেলই প্রবাসীর কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও লাভজনক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

পরিবার ও বিনিয়োগের সঙ্গে সংযোগ

একজন প্রবাসী একই সঙ্গে পরিবারের অভিভাবক, দক্ষ কর্মী, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা এবং একসময় দেশে ফেরা নাগরিক। প্রবাসী কার্ডের বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হলো তাঁদের দেশের অর্থনীতির সঙ্গে বহুমাত্রিকভাবে যুক্ত করা। ঘোষিত সুবিধার মধ্যে জমি নিবন্ধন ও নামজারি, ইউটিলিটি সংযোগ, লাইসেন্স, বিনিয়োগ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, কনস্যুলার ও ব্যাংকিং সেবায় অগ্রাধিকারের কথা রয়েছে। এগুলো কার্যকর হলে প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা শুরু ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে কম ভোগান্তির মুখোমুখি হবেন।

প্রবাসীদের অনেকেই দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও তথ্যের অভাব, জটিলতা, অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটে পিছিয়ে যান। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র, অবসর ভাতা স্কিম, সরকারি বন্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, আবাসন, শিল্পাঞ্চল এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ যুক্ত করা গেলে প্রবাসী আয় ভোগের পাশাপাশি দেশের উৎপাদনশীল খাতেও আরও বেশি প্রবাহিত হতে পারে।

মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা

সরকার প্রবাসী কার্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলেছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে রয়েছে গুরুতর সুরক্ষা ঝুঁকি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক ও গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। তাই প্রবাসীকল্যাণ শুধু সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়; সংকটে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ, বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথ, মিট অ্যান্ড গ্রিট, হাসপাতাল সেবা, মরদেহ পরিবহন, বিমা ও অগ্রাধিকার সেবার ঘোষণা ইতিবাচক। তবে মর্যাদার প্রকৃত পরীক্ষা হবে সেবার মানে। বিশেষ বুথে সত্যিই দ্রুত সেবা মিলছে কি না, হাসপাতালের সুবিধা কোথায় পাওয়া যাবে এবং বিমা দাবি কত দ্রুত নিষ্পত্তি হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি প্রয়োজন।

একটি জাতীয় প্রবাসফেরত দক্ষতা তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে কর্মীর পেশা, কোন দেশে ও কোন খাতে কাজ করেছেন, কাজের অভিজ্ঞতার মেয়াদ, প্রশিক্ষণ এবং অর্জিত দক্ষতার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন হলে ‘পূর্ব অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি’র মাধ্যমে এসব দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দেওয়া যেতে পারে।

সত্যিকার অর্থে প্রবাসী কার্ডের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত সুবিধাগুলো কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও নিরাপদ সেবায় রূপ নেয় তার ওপর।

  • ফুয়াদ এম খালিদ হোসেন বাণিজ্য সহজীকরণ ও অর্থনৈতিক নীতি সংস্কার বিশেষজ্ঞ এবং প্রধান নির্বাহী, ট্রেস কনসাল্টিং

*মতামত লেখকের নিজস্ব