
সম্প্রতি (১৫-২০ মে) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালিতে কূটনৈতিক সফর করেছেন। এক সফর ক্রমবর্ধমান খণ্ডবিখণ্ড বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় ভারতকে একটি প্রভাবশালী ক্রীড়নকে পরিণত করার একটি প্রচেষ্টা। তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পুনর্গঠিত সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি এমন সম্পর্ক তৈরি করতে চাচ্ছে, যেখানে তাদের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে টিকিয়ে রাখা যাবে।
ভারত মূলত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিবেচনা থেকে ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা, উন্নত উৎপাদন শিল্প এবং বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি এখন ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
‘ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ এবং ‘ভারত-ইএফটিএ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ দেখে বোঝা যায়, বিবর্তিত বৈশ্বিক উৎপাদন ও প্রযুক্তির পরিসরে দিল্লি নিজেদের আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে ইচ্ছুক।
পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতেও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে কেবল আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বা রাজনৈতিক জোট গঠনের ওপর জোর দেওয়া হতো, এখন সেখান থেকে সরে এসে শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থার মতো বাস্তবমুখী ও কার্যকর বিষয়ের ওপর বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে আরব আমিরাত
মোদির এই সফরে আরব আমিরাত কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠকটি গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর ভূরাজনৈতিক সম্পর্কেরই একটি ধারাবাহিকতা। বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, ফিনটেক সহযোগিতা, লজিস্টিকস ও যোগাযোগব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতের সমন্বয় ভারতের সঙ্গে আরব আমিরাতের জোরদার সম্পর্ক তৈরি করেছে।
তবে ভারত এখন আরব আমিরাতকে কেবল জ্বালানি সরবরাহকারী বা বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে দেখছে না। বরং বিবেচনা করছে পশ্চিম এশিয়ায় প্রবেশদ্বার হিসেবে। এই পথ দিয়েই ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে নিজের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে এবং নিজের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে চায়।
এই কৌশল ভারতের সামগ্রিক ‘বহুমুখী জোট’-এর নীতিকে সামনে নিয়ে আসে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্কে না গিয়ে পরস্পরবিরোধী পক্ষ বা জোটের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক বজায় রাখা হয়। তবে ইউরোপের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ যতটা স্থিতিশীল, উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি মোটেও তেমন নয়। এখানে চলছে ছায়া যুদ্ধ, উপদলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতা ভারসাম্যের ক্রমাগত পরিবর্তন। এমন পরিস্থিতিতে বহিরাগত যেকোনো দেশই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও জটিলতার মুখে পড়তে বাধ্য।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভক্তি এবং কৌশলগত সংবেদনশীলতা
আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান এই সম্পর্ক দেশটির সামগ্রিক উপসাগরীয় কৌশলের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইদানীং ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
আব্রাহাম চুক্তি–পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে ভারত যখন আরব আমিরাত ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, তখন এই ধারণাটি আরও পোক্ত হয়। মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশে ভারতের এই সম্পর্কগুলোকে আঞ্চলিক আনুগত্যের পরিবর্তন এবং ইসলামিক বিশ্বের ভেতরের রাজনৈতিক ভারসাম্যের বদল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলকে কেবল বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে বিচার করা যাবে না। কারণ, যেখানে পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক বৈধতাই পুরো অঞ্চলের শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি, সেখানে কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করার ভাবনাটাই ভুল।
আরব আমিরাতকেন্দ্রিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা
আরব আমিরাত এই অঞ্চলের অন্যতম গতিশীল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, এর প্রভাব আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যেই সীমিত। সৌদি আরবের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং জ্বালানি খাতের গুরুত্ব এখনো সবার ওপরে। ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ার মতো যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে আবুধাবির ক্রমবর্ধমান সক্রিয় ভূমিকা এবং ওপেক প্লাস জোটের উৎপাদন নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তৈরি হওয়া মতবিরোধ ইতিমধ্যেই জিসিসির ভেতরে আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তার অগ্রাধিকার নিয়ে বাড়তে থাকা দূরত্বকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ভারতের সঙ্গে আরব আমিরাতের এই সম্পর্ক সৌদি আরবের ওপর আমিরাতের নির্ভরশীলতাকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না। জিসিসির ভেতরের ফাটলগুলো বারবার প্রমাণ করছে যে আবুধাবি কখনোই স্বাধীনভাবে উপসাগরীয় বিশ্বব্যবস্থায় রিয়াদের কেন্দ্রীয় অবস্থানের বিকল্প হতে পারবে না।
এই পরিস্থিতিতে ভারত এমন সব আঞ্চলিক কোন্দলের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ বা নিজের মতো করে পরিচালনা করার ক্ষমতা নয়াদিল্লির নেই।
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক নিরাপত্তা সংযোগ
ভারতের উপসাগরীয় কৌশল যে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তা কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের জোর দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিশেষত সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্ত নিরাপত্তাকাঠামো ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। গত কয়েক দশকের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ভৌগোলিক ঘনিষ্ঠতা, শ্রমিক সমন্বয় এবং ধর্মীয় মিলের কারণে পাকিস্তান উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক কৌশলগত পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
এর বিপরীতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখনো মূলত অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি খাতের নির্ভরশীলতা এবং প্রবাসীদের ওপর ভিত্তি করেই টিকে আছে। যদিও ভারত ও আরব আমিরাতের মধ্যে ব্যবসা এবং বিনিয়োগের সম্পর্ক খুব দ্রুত বাড়ছে, তবু এই অঞ্চলে দিল্লির উপস্থিতি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক রয়ে গেছে।
চীন এবং উদীয়মান উপসাগরীয় বিশ্বব্যবস্থা
ভারতের এই কূটনৈতিক যোগাযোগ পশ্চিম এশিয়াজুড়ে চীনের সঙ্গে তাদের কৌশলগত প্রতিযোগিতাকেও সামনে নিয়ে আসে। জ্বালানি খাতের অংশীদারত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর ও পরিবহন করিডর তৈরি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে বেইজিং উপসাগরীয় অঞ্চলকে এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে।
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এবং এই অঞ্চলের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানিনির্ভরতা বেইজিংয়ের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমেরিকার কৌশলগত উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের অংশীদারত্বের পরিধি বাড়াচ্ছে।
এই পরিবর্তনশীল পরিবেশ ভারতের মতো ‘মধ্যম শক্তি’র জন্য পশ্চিম এশিয়াজুড়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই দিল্লির জন্য আরব আমিরাত এবং সামগ্রিকভাবে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অর্থ কেবল নিজেদের ব্যবসার পরিধি বাড়ানোই নয়; বরং ইউরেশীয় যোগাযোগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে চলে আসা এই অঞ্চলে যেন ভারতকে কৌশলগতভাবে পিছিয়ে না পড়তে হয়, তা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইরান, মেরুকরণ এবং কৌশলগত ঝুঁকি
উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের সক্রিয়তা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন পুরো অঞ্চলটি চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেন ও সুদানের ক্রমাগত অস্থিতিশীলতা, ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে অমীমাংসিত উত্তেজনা, ওপেক প্লাস জোটের ওঠানামা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও বেশি অনিশ্চিত করে তুলছে।
ভারতের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা। এই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়তো স্বল্প মেয়াদে ভারতকে কিছুটা কূটনৈতিক সুবিধা দেবে; কিন্তু এই অঞ্চলের ভেতরের মেরুকরণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভারসাম্য ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির বাইরে
উপসাগরীয় অঞ্চলে মোদির এই কূটনীতি ভারতের উদীয়মান ভূরাজনৈতিক কৌশলের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি দুটোই ফুটিয়ে তোলে। নয়াদিল্লি এখন আর কেবল মুখে মুখে জোটনিরপেক্ষ থাকা বা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। তারা এখন জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য করিডর, লজিস্টিকস যোগাযোগ, প্রযুক্তির পরিবেশ এবং আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থার মতো জায়গাগুলোতে সরাসরি ও বাস্তবসম্মত প্রভাব বিস্তার করতে চায়।
তবু উপসাগরীয় অঞ্চল এমন এক সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে শুধু বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব দিয়েই দীর্ঘদিনের পুরোনো আঞ্চলিক শত্রুতা এবং সামরিক প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা যাবে না।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ভেতরের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত গভীর হবে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক যত দ্রুত বদলাবে, ভারত হয়তো আবিষ্কার করবে যে পশ্চিম এশিয়ায় নিজের কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখা সেখানে নিজের প্রভাব বিস্তার করার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
সায়মা আফজাল জার্মানির উইসটুস লিবিক ইউনিভার্সিটিতে গবেষক হিসেবে কর্মরত।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত