সমাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলছে স্বৈরশাসনের রাজনীতি ও লুণ্ঠনের অর্থনীতি। এটার ধরন এমন যে এ ব্যবস্থার কারণে নানা বিকৃতি তৈরি হয়। এ ব্যবস্থার ভেতরে জন্ম নিয়েছে সাংঘাতিক রকমের অসহিষ্ণুতা। ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন পরিচয়, ভিন্ন লিঙ্গ, ভিন্ন মত—যা কিছু নিজের থেকে আলাদা তার প্রতি বিদ্বেষ ও আক্রমণ। নিজেরা যা বলবে, যেভাবে পোশাক পরবে, যেভাবে জীবন যাপন করবে, যেভাবে ধর্ম মেনে চলবে— অন্যরা সেভাবে মেনে না চললে আক্রমণ করতে হবে। এ ধরনের ফ্যাসিবাদী চিন্তা সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার করেছে। তারই একটি প্রকাশ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখা গেছে।
ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফ্যাসিবাদী চিন্তা ডালপালা ছড়ায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখা গেছে, অনেক ঘটনায় তারা নিষ্ক্রিয় ছিল, নমনীয় ছিল, অনেক ঘটনায় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। কোনো কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা ছিল। ফলে মব সহিংসতা আরও ডালপালা ছড়িয়েছে। বিএনপি সরকারের বয়স বেশি নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মব সন্ত্রাস আর হবে না বলেছিলেন। এখন পর্যন্ত আশা করা যেতে পারে, এ সরকার মবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে। ভিন্ন জাতি, ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের ওপর আক্রমণের ব্যাপারে সজাগ থাকবে।
মব সহিংসতার ঘটনায় দেখা গেছে, ধর্মীয় নেতাদের কারও কারও ব্যাখ্যা হামলাকারীদের শক্তি জোগায়। হামলা ও হত্যার পক্ষে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে যুক্তি দাঁড় করানো হয়। নিজ ধর্মের মানুষের ওপর হামলাকেও জায়েজ করা হয়। এ ধরনের ঘটনার পেছনে ক্ষমতাবান বা ধর্মীয় নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে তা ভয়ংকর আকার ধারণ করে। সেটা এখন আমরা দেখছি। আক্রমণ হচ্ছে। এতে কিছু ধর্মীয় নেতাদের উসকানি, ক্ষমতাবান কিছু গোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা আছে।
শাহবাগ ও কুষ্টিয়ায় হামলা পরিকল্পিত। এ সরকার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় হামলা হয়েছে। তাই এ সরকারের দায় আছে। এ ধরনের মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুলিশসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সরকারের স্পষ্ট বার্তা থাকা উচিত ছিল। শাহবাগে হামলার সময় পুলিশ বসে ছিল, ব্যবস্থা নেয়নি। তার মানে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোর বার্তা পুলিশের কাছে নেই। কুষ্টিয়ায় পুলিশের কোনো শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি। হামলা হুট করে হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় থাকলে পরিকল্পনাগুলো জানা যায়। এ ধরনের মব সন্ত্রাস কারা ঘটায়, তা চিহ্নিত। এসব গোষ্ঠীই আগে হামলা করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাজার ভাঙা হয়েছে, বাউলদের অনুষ্ঠানে হামলা করা হয়েছে। ফলে এই গোষ্ঠী নিয়ে পুলিশের সতর্ক থাকা উচিত ছিল। আগে যেসব হামলা হয়েছে, সেসব নিয়ে সরকারের উচিত তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়া। আগে বিচার হয়নি বলে আবার একই ঘটনা ঘটেছে। বিচার না করলে বুঝতে হবে সরকারের সমর্থন রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আইন-আদালতের মাধ্যমে সরকারকে এখন মব সহিংসতা পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। যেসব গোষ্ঠী হামলা করছে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য উসকানি দিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে চাইছে। এই ফ্যাসিবাদী চিন্তার কাঠামোর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে শক্তিশালী আন্দোলন ছাড়া এ থেকে বের হওয়া যাবে না।
সরকারকে রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারাভিযান চালাতে হবে। সরকারকে বলতে হবে, জাতি, লিঙ্গ যা-ই হোক, সব মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। বৈচিত্র্যের পক্ষে ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে প্রত্যেককে। এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে সবাইকে শক্ত কণ্ঠে সোচ্চার হতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য।