
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার উছমানপুর গ্রাম। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি জুতার কারখানা। চারদিকে রেক্সিন, কাপড়, দুই রকমের রাবার, আঠা, স্টিকার, সুতা টিস্যুর আস্তর, সোল, ফাইবার, কেমিক্যাল, পেস্টিং, পলি ফোমের ছড়াছড়ি। প্রতি কারখানায় গড়ে ১৫ জন শ্রমিক মাথা গুঁজে কাজ করছেন।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যায় এখানে উৎপাদিত জুতা। হকাররাই মূলত পাইকারি কেনেন। ৭০০ টাকা ডজন। এক ইঞ্চি পুরু সোলের লেডিস স্যান্ডেল ৮০০ টাকা। পাশের ভৈরবের স্যান্ডেল নাকি দুই মাসের মধ্যে আঠা ছেড়ে দেয়। কিন্তু বাজিতপুরের মাল টেকসই।—এমনটা জানালেন কয়েকজন মালিক।
একটি কারখানার মালিক জুয়েল ভূইয়া (৪৫)। তাঁর বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫–১৬ লাখ টাকা, কাজ করে ২২ জন। ডজনপ্রতি শ্রমিকেরা পান ২০০ টাকা। জনপ্রতি উৎপাদন করতে পারেন ৫–৬ ডজন, মানে শ্রমিকদের গড় মজুরি হাজার টাকা। তিনি জানান, পুঁজির ঘাটতি ও মেশিনের অভাবে চাহিদামতো অনেক কিছু বানাতে পারা যায় না। রাবারের ফ্যাক্টরি, সোলের-কেমিক্যালের ফ্যাক্টরি দরকার। তখন তাঁরা আরও কম খরচে জুতা উৎপাদন করতে পারবেন।
শিল্পের এক নম্বর ও দুই নম্বর জুতার দক্ষ কারিগর আছে। জিল্লু মিয়া (৫৫) হলেন এক নম্বর কারিগর। তিনি বলেন, ব্যাংক তাঁদের সাপোর্ট দেয় না। এনজিওগুলো রক্ত চুষে নেয়। মাঝে মাঝে বিআরডিপি ২০ হাজার থেকে তিন লাখ লোন দিচ্ছে, সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা। চামড়ার কারখানা থাকলে সারা বছর কাজ থাকত। তখন তাঁরা সস্তায় চামড়ার জুতা উৎপাদন করতে পারতেন।
ঘোড়াউত্রা বাংলা নদী। আগে মূল নদীতে জেলেরা মাছ ধরতে পারতেন। ১৯৯০ সালে নতুন ইজারাদার মূল নদীতে মানে ভাসান পানিতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করল। হাসনাত কাইয়ূম ও হরিপদ নান্টুরা নেমে পড়লেন আন্দোলনে। তা ছড়িয়ে পড়ল কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ পুরো হাওর অঞ্চলে। তাই আন্দোলনটির নাম ছিল ভাসান পানির আন্দোলন।
১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রায় ৩৫ বছর আগে ইজারাদারের গুলিতে শহীদ হন সঞ্জীব দাসসহ কয়েকজন। হাসনাত কাইয়ূম, হরিপদ নান্টুদের ১৯৯৩ সালের ৩১ জানুয়ারি জেলে ঢোকানো হলো। দাবি গিয়ে ঠেকল ‘জাল যার জলা তার’, মানে জলাশয় থেকে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদে। পরে জেলেরা লিজ নেয়। আন্দোলনটি ছড়িয়ে পড়ে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামেও।—কথাগুলো কামের বালি জেলেপাড়ার অশ্বিনী দাসের (৬৭)। তিনি ছিলেন ওই আন্দোলনের গ্রামের সদস্যসচিব।
এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পাঁচ বছর না যেতেই নদী–বিল–জলাশয় আবার ইজারাদারদের দখলে চলে যায়। সেই সময় থেকেই প্রকৃত জেলেরা একে একে নিজেদের অধিকার হারাতে শুরু করেন। কাগজে–কলমে যেখানে ইজারা দেওয়া হয় মাত্র ৫০০ একর জলভূমি, বাস্তবে সেখানে ইজারাদাররা কয়েক হাজার একর এলাকায় কর্তৃত্ব ফলান। এমনকি কোলা বা ভাসান পানির মতো জেলেদের ন্যূনতম জীবিকাভিত্তিক মাছ ধরার সুযোগটুকুও তারা পান না; সেগুলোও ইজারাদার নিজের দখলে রেখে দেন।
বর্তমানে এই এলাকার ইজারাদার আওয়ামী লীগের মঞ্জু এমপির ছেলে মামুন। সরকার পরিবর্তন হলেও ইজারার নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই রয়ে গেছে। জেলেরা আজও তার নাম প্রকাশ্যে নিতে ভয় পান। বিদ্যুৎ দাস (৪০) জানান, ২০০২–০৩ সালে পত্রিকায় নাম ছাপা হওয়ার পর পুরো জেলেপাড়ার মানুষকে নদীতে স্নান করতেও নিষেধ করা হয়েছিল।
কামের বাউলি জেলেপাড়ার নেপাল দাস (৬২) ও সুদাম দাস (৩৭) জানান, ফেরিঘাট থেকে আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইজারাদারদের প্রভাব এতটাই শক্ত যে জেলেদের কাছ থেকে নিয়মিত খাজনা আদায় করা হয়। শুধু জেলেদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কেচকি বেড় জালুয়াদের দিতে হয় আরও দেড় লাখ টাকা। মোট মাছ ধরার এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ সরাসরি ইজারাদার নিজে ভোগ করেন, আর বাকি ২০ শতাংশ নামমাত্রভাবে জেলেদের ‘সাব–ইজারা’ হিসেবে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম জানান, এই ভাসান পানির আন্দোলনই তাঁকে শিখিয়েছে, লাঠির জোরে কিছুদিন অধিকার আদায় করা গেলেও স্থায়ী করতে গেলে আইন বদলাতে হয়।
গবাদিপশু হচ্ছে কৃষকের সঞ্চয়। যিনি গরু-ছাগল কিনতে পারেন না, তিনিও এসব পশু আধি করেন। শহরের লোকেরা হাওরবাসীর কাছে গবাদিপশু আধি দিতেন। বাছুরকে বড় করে বিক্রি করে সমান ভাগ কিংবা গাই বাছুর হলে তাকে বড় করে গাভি করে বাছুর ভাগ করে নিতেন। হাওরে গবাদিপশুর খাবার কিনতে হতো না। যার জমি নেই এভাবে তারও দুটি গরু, কয়েকটি ছাগল-ভেড়া থাকত।
এই গবাদিপশুগুলো এজমালি জমিতে ঘুরে ঘুরে পেট ভরায়। এখন গোখাদ্যের বাজারের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়ায় ‘বাথান’ হারিয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে চর-নদীর বাস্তুসংস্থান। প্রধান কারণ হচ্ছে নিরাপত্তা। নিরাপত্তার অভাবে বিস্তীর্ণ হাওরে আর গরুগুলো চরে বেড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকে শক্তিশালী কৃষক সংগঠনগুলো হাওরে কৃষকদের নিরাপত্তা দিত। ডাকাতদের উৎপাত বেড়ে গেলে কৃষকেরা তাদের প্রতিহত করত।
হাওরে বছরে একবার যে ধান উৎপাদিত হয়, তা দিয়েই সারা বছর চলে। কিন্তু মেঘালয় ও আসাম থেকে আসা হঠাৎ পানিতে ফসল ডুবে গেলে কৃষকদের পথে বসতে হয়। দুই দেশের মধ্যে আবহাওয়া বিষয়ে আগাম তথ্য বিনিময় জরুরি। দরকার নদ–নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অথচ হাওরকে বলা হয় বাংলাদেশের দেশি মাছের ভান্ডার। চলছে ভোটের মৌসুম। অভাগিনী হাওরবাসীর মনের শত দুঃখ লাঘব করতে পারে কে?
আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে/ পুবালী বাতাসে-/বাদাম দেইখ্যা, চাইয়া থাকি/আমার নি কেউ আসে রে।।/যেদিন হতে নতুন পানি/আসল বাড়ির ঘাটে/অভাগিনীর মনে কত শত কথা উঠে রে।।
নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক। ই–মেইল: nahidknowledge1@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব