সেলিম রায়হানের কলাম

নতুন পে স্কেলে স্বস্তির আড়ালে আর্থিক ঝুঁকি

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রকৃত আয়ের ক্ষয় বিবেচনায় বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। এ নিয়ে বেশি দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিক থেকে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।

বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় বহনের সক্ষমতা কি সরকারের আছে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করবে কারা? 

এই ব্যয় একবারের নয়। নতুন বেতন ও পেনশন কার্যকর হলে তা প্রতিবছরই বাজেটে বহন করতে হবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে প্রথম ধাক্কা কিছুটা কমবে, কিন্তু দায় কমবে না। বেতন ও পেনশন এমন ব্যয়, যা একবার বাড়লে সহজে কমানো যায় না। রাজস্ব কমলে উন্নয়ন প্রকল্প পিছিয়ে দেওয়া যায়, কিছু কেনাকাটা স্থগিত করা যায়, কিন্তু বেতন কমানো প্রায় অসম্ভব।

ফলে আগামী দিনের বাজেট আরও অনমনীয় হবে। জ্বালানিসংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা বা নতুন অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকারের হাতে স্বাধীনভাবে ব্যয় করার জায়গা কমে যাবে। 

এ কারণেই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত অর্থায়ন নিয়ে। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো রাজস্ব বাড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা বহুদিনের। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বছর শেষে বড় ঘাটতি থেকে যায়। এই বাস্তবতায় বড় একটি স্থায়ী ব্যয় যোগ করলে চাপ আরও বাড়বে। পে স্কেল কার্যকর করার আগে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, অযৌক্তিক কর-ছাড় কমানো, উচ্চ আয় ও সম্পদের ওপর কার্যকর কর নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা দরকার। রাজস্ব সংস্কার ছাড়া বেতন বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ঋণ, অন্য খাতের ব্যয় সংকোচন অথবা বড় বাজেট ঘাটতিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। 

এখানে আরেকটি ঝুঁকি আছে। সরকারের আয় যতটা বাড়ছে, তার তুলনায় বাধ্যতামূলক ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের নীতিগত স্বাধীনতা কমে যাবে। তখন নতুন কোনো সংকটে দ্রুত অর্থ বরাদ্দ করা কঠিন হবে। বাজেট ক্রমেই বেতন, পেনশন, সুদ ও ভর্তুকির মতো স্থায়ী ব্যয়ের চাপে আটকে পড়বে। এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করতে পারে। 

সরকারি কর্মচারীরা সংগঠিত, দৃশ্যমান এবং নীতিনির্ধারণে তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী। অধিকাংশ বেসরকারি কর্মী সেই অবস্থানে নেই। তাঁদের মজুরি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের আয়, উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজার পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার ওপর। ছোট ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান বড় সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়াতে পারবে না।

অন্য খাতের ব্যয় কেটে বেতন দেওয়া আরও খারাপ সমাধান হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা কিংবা উৎপাদনশীল অবকাঠামোর বরাদ্দ কমিয়ে সরকারি বেতন বাড়ানো হলে এক সংকট সামলাতে গিয়ে আরেক সংকট তৈরি হবে। বাংলাদেশ এসব খাতেই প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যয় করে। এমন একটি রাষ্ট্র, যে নিজের কর্মচারীদের বেশি বেতন দেয় কিন্তু স্কুল, হাসপাতাল, দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবহন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় কম খরচ করে, সে হয়তো একটি গোষ্ঠীর কল্যাণ বাড়াবে, কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা দুর্বল করবে। 

ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরতা সমানভাবে উদ্বেগজনক। সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ধার করে, ব্যাংকের জন্য রাষ্ট্রকে ঋণ দেওয়া অনেক সময় বেসরকারি খাতের তুলনায় নিরাপদ হয়ে ওঠে। এতে উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে, সুদের হার উঁচু থাকতে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আরও দুর্বল হতে পারে। এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। রাষ্ট্র নিজের কর্মচারীদের আয় বাড়ায়, কিন্তু সেই ব্যয় মেটাতে গিয়ে যদি ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়ে, তবে আজকের স্বস্তির বিনিময়ে আগামী দিনের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও উপেক্ষা করার মতো নয়। বেতন বাড়লে ভোগব্যয় বাড়বে, যা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে কিছু গতি আনতে পারে। এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু পণ্য ও সেবার সরবরাহ যদি একই গতিতে না বাড়ে, অতিরিক্ত চাহিদা আবারও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তখন সরকারি কর্মচারীদের নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার লাভের একটি অংশ মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলবে।

আরও বড় সমস্যা হলো, সরকারি চাকরির বাইরে থাকা লাখো পরিবার একই আয় বৃদ্ধি পাবে না, অথচ তারাও উচ্চতর দামের মুখোমুখি হবে। ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের পথ নেওয়া হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নটি বেসরকারি খাতকে ঘিরে। সরকারি কর্মচারীরা সংগঠিত, দৃশ্যমান এবং নীতিনির্ধারণে তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী। অধিকাংশ বেসরকারি কর্মী সেই অবস্থানে নেই। তাঁদের মজুরি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের আয়, উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজার পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার ওপর। ছোট ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান বড় সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়াতে পারবে না।

সরকারি চাকরিতে সর্বশেষ পে কমিশন হয়েছিল ২০১৫ সালে।

ফলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মসংস্থানের মধ্যে আয় ব্যবধান বাড়তে পারে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা কঠিন হবে এবং শ্রমবাজারে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে। 

এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট, কারণ বাংলাদেশের বড় অংশের শ্রমিক এখনো আনুষ্ঠানিক মজুরি সুরক্ষার বাইরে। বহু খাতে কার্যকর ন্যূনতম বেতন নেই। অনানুষ্ঠানিক খাতে নিরাপত্তা আরও দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারীর মোট আয় অনেক তরুণ স্নাতক, জুনিয়র পেশাজীবী কিংবা দক্ষ বেসরকারি কর্মীর চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে।

সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন প্রশাসনিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে না, আর সেটি কাম্যও নয়। কিন্তু বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারি বেতন নীতি দিয়ে শ্রমবাজারের সামগ্রিক বৈষম্য সমাধান করা যাবে না। 

নতুন পে স্কেলকে তাই শুধু বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় রক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি করদাতা, বেসরকারি কর্মী, উদ্যোক্তা, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কিংবা জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তবে সমস্যার সমাধান হবে না; বোঝা কেবল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে। 

আরেকটি বহুল ব্যবহৃত যুক্তি হলো, বেশি বেতন দিলে দুর্নীতি কমবে এবং সরকারি সেবার মান বাড়বে। এই যুক্তি নতুন নয়। আগের বেতনকাঠামোর সময়ও একই কথা বলা হয়েছিল। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ভালো বেতন কিছু আর্থিক চাপ কমাতে পারে, কিন্তু দুর্নীতি শুধু কম বেতনের ফল নয়। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল নজরদারি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, শাস্তির অনিশ্চয়তা এবং কম জবাবদিহিও বড় কারণ। তাই বেতন বাড়িয়ে যদি কাজের মূল্যায়ন, অডিট, ডিজিটাল সেবা, সেবার মানদণ্ড এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার না করা হয়, তবে নাগরিকেরা শুধু আরও ব্যয়বহুল আমলাতন্ত্রই পেতে পারেন। 

এখানে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন। মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পে কমিশন বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর কথা বলেছিল। সেই ধারণাটি নতুন করে বিবেচনা করা উচিত।

প্রতি দশ বা এগারো বছর অপেক্ষা করে বড় লাফে বেতন বাড়ানোর বদলে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত একটি স্বচ্ছ ও পূর্বনির্ধারিত সমন্বয় ব্যবস্থা অনেক বেশি যুক্তিসংগত। এতে রাজনৈতিক দর-কষাকষি কমবে, আকস্মিক বাজেটীয় ধাক্কা এড়ানো যাবে এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। 

নতুন পে স্কেলকে তাই শুধু বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় রক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি করদাতা, বেসরকারি কর্মী, উদ্যোক্তা, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কিংবা জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তবে সমস্যার সমাধান হবে না; বোঝা কেবল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে। 

এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজস্ব সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঋণের ওপর নির্ভরতা সীমিত করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি শক্তিশালী করা। এগুলো ছাড়া নতুন পে স্কেল কিছু মানুষের জন্য স্বস্তি আনলেও অর্থনীতির জন্য নতুন ঋণ, মূল্যস্ফীতি, সংকুচিত আর্থিক সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শেষ বিচারে প্রশ্নটি বেতন বাড়ানো ঠিক কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সেটি টেকসইভাবে অর্থায়ন করতে পারবে কি না। 

সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম

* মতামত লেখকের নিজস্ব