বিদেশে বহু বছর পার করার পরও শুক্রবারের ‘বাঙালি’ মেজাজটা আমার যায় না। শুক্রবারে দিনটিতে কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না। একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, তারপর মাথায় টুপি দিয়ে জুমার নামাজের শেষ কাতারে দাঁড়ানো। নামাজ শেষে বাসায় ফিরে বিকেলে একটা মুভি বা সিনেমা দেখতে পারলে নিজেকে অনেকটা ‘বাঙালি জমিদার’ মনে হয়। যদিও প্রবাসজীবনের বাস্তবতায় অধিকাংশ সময় সেই বিলাসিতা হয়ে ওঠে না।
আজ অবশ্য কাজের চাপ কিছুটা কম ছিল। ভাবলাম, ছেলেদের আজ স্কুল ফাঁকি দেওয়াই। বললাম, “বাবা, আজ আর স্কুলে গিয়ে কাজ নেই। চলো দুপুরে লাঞ্চের পর আমরা মুভি দেখতে যাই।” ছোট ছেলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল, “না বাবা! আজ আমার ‘ম্যাথ চ্যালেঞ্জ’, আমাকে যেতেই হবে।” বড়জনও রাজি নয়। তার যুক্তি, আজ স্কুলে ‘অ্যাক্টিভ ফ্রাইডে নাইট’, মিস করা অসম্ভব।
ওদের স্কুল পালানোর অনীহা দেখে অবাক হই। ‘ম্যাথ চ্যালেঞ্জ’-এ বাচ্চারা একে অপরের সঙ্গে গণিতের দক্ষতা যাচাই করে। আর ‘অ্যাক্টিভ ফ্রাইডে নাইট’ হলো আরও মজার। বিকেল সাড়ে ৩টায় ক্লাস শেষের পর শুরু হয় খেলাধুলা। শিক্ষক বনাম ছাত্র—বাস্কেটবল বা ফুটবল ম্যাচ। কে জিতল সেটা বড় কথা নয়, মূল মজাটা হলো শিক্ষকদের সঙ্গে খেলার সুযোগ।
মাঝে মাঝে স্কুলের প্রিন্সিপাল বা অভিভাবকরাও যোগ দেন। সন্ধেবেলা শিক্ষকরাই বাচ্চাদের পড়ালেখা দেখিয়ে দেন, অনেকটা প্রাইভেট টিউটরের মতো। এরপর রাতে সবাই মিলে ডিনার, মুভি দেখা—সব মিলিয়ে রাত ১০টা বা ১২টা বেজে যায়। এত রাত জাগার পরও শিক্ষকরা মুসলিম ছাত্রদের ফজরের সময় ডেকে দেন নামাজ পড়ার জন্য, সকালে নাশতাও করান।
স্কুল নিয়ে ওদের এই আগ্রহ দেখে মাঝেমধ্যে চমকে যাই। নানা ধরনের অ্যাক্টিভিটি বা কার্যক্রমে ওরা এতটাই মজে থাকে যে স্কুলটা ওদের কাছে আনন্দের জায়গা। অথচ আমাদের সময় স্কুল পালানোর মধ্যেই ছিল আসল রোমাঞ্চ!
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রবাসে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি মনে করি, বাংলাদেশের আগামীর শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি মূল দর্শনের ওপর দাঁড় করানো উচিত: ১. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, ২. সর্বজনীন পুষ্টি কর্মসূচি এবং ৩. অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা শাসন।
আসলে, বাচ্চারা যেমন এনগেজিং বা অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ পছন্দ করে, আমরা বড়রাও তাই। আমরাও রাজনীতিবিদদের গৎবাঁধা বক্তৃতা বা লম্বা প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না, কারণ আমরা জানি এর অধিকাংশই মিথ্যা। সামনে নির্বাচন, চারদিকে সাজ সাজ রব। কৌতূহলবশত বড় রাজনৈতিক দলগুলোর (যেমন বিএনপি বা জামায়াত) ইশতেহার বা ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখলাম শিক্ষা নিয়ে তাদের কী পরিকল্পনা। হতাশাজনকভাবে, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সুনির্দিষ্ট বা যুগোপযোগী কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ল না।
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রবাসে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি মনে করি, বাংলাদেশের আগামীর শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি মূল দর্শনের ওপর দাঁড় করানো উচিত: ১. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, ২. সর্বজনীন পুষ্টি কর্মসূচি এবং ৩. অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা শাসন।
১. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা রূপান্তর (স্কিল অরিয়েন্টেড এডুকেশন) বাংলাদেশে বেকারত্বের অন্যতম কারণ হলো ডিগ্রির সঙ্গে পেশার অমিল। জিওলজি (ভূতত্ত্ব) থেকে পাস করে কেউ সরকারি আমলা হচ্ছেন, আবার সমাজবিজ্ঞান পড়ে কেউ ব্যাংকে চাকরি করছেন। এই ‘মিসম্যাচ’ বা অসামঞ্জস্যতা জাতীয় অপচয়।
সম্প্রতি কেপিএমজি (বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পেশাদার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান)-এর একদল নির্বাহী আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। তারা অ্যাকাউন্টিং বিভাগ থেকে দক্ষ ছাত্র খুঁজছিলেন। আমরা তাদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাকরির জন্য ঠিক কী কী দক্ষতা দরকার?’ তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা আমাদের কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম নতুন করে সাজালাম। বাংলাদেশেও নবম শ্রেণি থেকেই বাধ্যতামূলক কারিগরি, ডিজিটাল বা গ্রিন স্কিল শিক্ষা চালু করা দরকার। মাদ্রাসাশিক্ষায় স্টেম (এসটিইএম), আইসিটি এবং ইংরেজি যুক্ত করে তাদেরও মূলধারার কর্মসংস্থানের উপযোগী করতে হবে।
২. সর্বজনীন পুষ্টি কর্মসূচি (ইউনিভার্সাল নিউট্রিশন প্রোগ্রাম) ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মৃত্যুহার কমলেও, সাম্প্রতিক তথ্য বলছে হৃদরোগের মতো সমস্যায় মৃত্যুহার বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টির অভাব প্রকট। গত কয়েক দশক ধরে জাপানে (আয়ুষ্কাল) সাধারণত বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মূল কারণ পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসের উন্নতি।
থাইল্যান্ডের স্কুলগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি নির্বিশেষে সব শিশুকে দুধ খাওয়ানো হয়। প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম নিশ্চিত করার ফলে তাদের শারীরিক গঠন উন্নত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কি এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারে? সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার (মিড-ডে মিল) চালু করা, যা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে—এতে কৃষকরাও লাভবান হবেন, শিশুদের স্বাস্থ্যও নিশ্চিত হবে।
৩. অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা শাসন (পার্টিসিপ্যাটোরি গভর্নেন্স) বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার বা ইউজিসি। বিএনপি-জামায়াত আমল (২০০১-২০০৫) থেকে শুরু করে বিগত স্বৈরাচারী শাসনকাল পর্যন্ত—সব সময়ই এই নিয়োগে দলীয়করণ ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। ঘুষ দিয়ে বা লবিং করে যিনি নিয়োগ পান, তিনি নিজেও পরে শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োগে একই অনিয়ম করেন।
গত দেড় বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে উপাচার্য বা শিক্ষক নিয়োগে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। এর সমাধান হতে পারে ‘অংশগ্রহণমূলক শাসন’। আমার বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি বা ডিন নিয়োগের জন্য তিনটি পক্ষ ভোট দেয়: একাডেমিক স্টাফ (শিক্ষক), অ্যাডমিন স্টাফ (কর্মকর্তা-কর্মচারী) এবং ছাত্রছাত্রীরা। ফলে, যিনি নির্বাচিত হতে চান, তাকে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সৎ ও সেবামূলক হতে হয়। বাংলাদেশেও নির্বাচিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক কাউন্সিল এবং নিয়মিত নীতি-সংলাপ চালু করা জরুরি।
লেখার ইতি টানছি সিনেমার প্রসঙ্গ দিয়ে। বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে মুভি থিয়েটারে যাওয়া আমার ভীষণ পছন্দের। ‘গ্রান টুরিসমো’ কিংবা ‘স্মারফস’এর মতো সিনেমাগুলো যেমন উপভোগ্য, তেমনি শিক্ষণীয়। তবে আজ আর সিনেমা হলে যাওয়া হলো না, শিক্ষা নিয়ে নানা ভাবনাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
আমি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে স্কুলগুলো এতটাই আনন্দদায়ক হবে যে, বাচ্চারা আর আমার মতো স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখার কথা চিন্তাও করবে না। সত্যি বলতে, ছোটবেলায় স্কুল আমার একদমই ভালো লাগত না, তাই বেশ কয়েকবার স্কুল পালিয়েছিলাম। মনে পড়ে, একবার সালমান শাহ-মৌসুমীর ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দেখতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছিলাম। তারপরের ঘটনা আর না-ই বললাম...
তারেক হোসাইন শিক্ষাবিদ ও গবেষক, থাম্মাসাত বিশ্ববিদ্যালয়, থাইল্যান্ড