নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান
নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান

মতামত

বিএনপির বড় বিজয় ও গণতান্ত্রিক পথচলার পরীক্ষা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্পষ্ট ও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) আন্তরিক অভিনন্দন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বৈধতা নিয়ে বিতর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপের পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল আস্থা পুনর্গঠনের এক সুযোগ। ভোটাররা জানিয়েছেন যে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং শাসনের বৈধতা আসে সম্মতি থেকে।

তবে একটি বড় ম্যান্ডেট নিজে থেকেই গভীর কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না; বরং এটি দায়িত্ব বাড়ায়। সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, মন্ত্রিসভাও গঠিত হয়েছে। বিএনপি সরকারের সামনে প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার।

প্রবৃদ্ধি মন্থর, মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক নয় এবং সরকারি অর্থভান্ডার সংকুচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে, অথচ কর-জিডিপি অনুপাত ঐতিহাসিকভাবে নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাত কাঠামোগত দুর্বলতায় ভুগছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

এ প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় অপরিহার্য। মুদ্রানীতি যেন রাজনৈতিক চাপমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনপ্রিয়তার চাপে ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিতে হবে।

ইতিহাস শুধু বিজয়ের ব্যবধান নয়, বরং সেই বিজয়ের পর শাসনের মান দিয়েও বিচার করবে। ভোটাররা তাঁদের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এখন দায়িত্ব নেতৃত্বের—ম্যান্ডেটকে শক্তিতে নয়, দায়িত্বে রূপান্তর করার।

কর সংস্কারে আর বিলম্ব করা যাবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন ও কর-পরিপালন বৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠী ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনা জরুরি। ধীরে ধীরে ভ্যাট ও আমদানি শুল্কের মতো পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রগতিশীল প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। এতে রাজস্ব বাড়বে, একই সঙ্গে ন্যায্যতাও নিশ্চিত হবে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াবে না। ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান অপরিহার্য। রপ্তানি বহুমুখীকরণও জরুরি—তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে সংযুক্তি গভীর করতে হবে।

প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা, উন্নত অবকাঠামো ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অবশ্যই বাস্তবায়ন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশও চ্যালেঞ্জিং। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস জনমনে প্রভাব ফেলেছে। সমর্থকদের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ থাকবে, কিন্তু সুশাসনের জন্য সংযম অপরিহার্য। প্রতিশোধমূলক রাজনীতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং চক্রকে দীর্ঘায়িত করে। একটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো কখনো আত্মতুষ্টি বা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মতবিনিময়ের সুযোগ রাখা জরুরি।

এই নির্বাচনের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে; নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকরভাবে কাজ করবে—এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর সংসদে সুরক্ষিত থাকতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে বিজয়ীসর্বস্ব মানসিকতায় পরিচালিত হয়েছে। নির্বাচনী বিজয় প্রায়ই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে গেছে, ফলে ভারসাম্য ও জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে। বিএনপি যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক নবায়ন চায়, তবে তাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। বড় অর্থনৈতিক বা সাংবিধানিক সংস্কারে আন্তদলীয় পরামর্শ জরুরি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে স্বচ্ছ ও পরামর্শভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। সংসদীয় বিতর্ক যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জন–আকাঙ্ক্ষা পরিচালনা। মানুষ অর্থনৈতিক স্বস্তি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও উন্নত সেবা চায়। কিন্তু সব সংস্কার তাৎক্ষণিক ফল দেয় না; কিছু ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি কষ্টও থাকতে পারে। তাই সময়সীমা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত সমঝোতা সম্পর্কে সরকারকে স্বচ্ছভাবে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, সেবা ডিজিটালাইজেশন এবং তদারকি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্থানীয় সরকার সেবায় দৃশ্যমান উন্নতি আনতে হবে। কারণ, গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায় নির্ভর করে।

বিএনপির বিজয় একদিকে সাহসী সংস্কারের সুযোগ এনে দিয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ক্ষমতার ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ইতিহাস শুধু বিজয়ের ব্যবধান নয়, বরং সেই বিজয়ের পর শাসনের মান দিয়েও বিচার করবে। ভোটাররা তাঁদের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এখন দায়িত্ব নেতৃত্বের—ম্যান্ডেটকে শক্তিতে নয়, দায়িত্বে রূপান্তর করার।

  • ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ

    *মতামত লেখকের নিজস্ব