বাংলাদেশে একেকজন মানুষের মাথাপিছু শত্রুসংখ্যা দিনে একজন করে ধরা হলে মাসের হিসাবে ৩০ জন। আবার হুটহাট করে শত্রুর সংখ্যা বাড়েও। ছোট–বড় বিবিধ কারণে তৈরি হওয়া প্রতিদিনের শত্রুদের সংখ্যা যদি যোগ করা হয়, গড় হিসাবে সে সংখ্যা অর্ধশতকে (কমপক্ষে) গিয়েও ঠেকতে পারে।
কী ভয়ানক! দেশে, সমাজে একজন মানুষকে ৩০ দিনের মাসে কমপক্ষে ৫০ জন শত্রুর ভার বহন করে জীবনযাপন করতে হয়। তাহলে এই মানুষগুলোর ১২ মাসের বছর কেমন কাটে?
কারও কারও মনে হতে পারে, দেশে এখন যার যা খুশি করার, বলার ও ভাবার স্বাধীনতা আছে, তাই ইচ্ছেমতো অযথা একটি বিষয়ের অবতারণা করা হলো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষার হার, গড় উচ্চতা, আয়ু ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা হয়; অতএব এসব বৃদ্ধি পেয়েছে, নাকি কমেছে; তা নিয়ে কথা বলাবলি হলে কারও গায়ে লাগে না; শুনতে হয় শোনেন, অথবা শুনেও শোনেন না। আচমকা এ দেশের মানুষের মাথাপিছু শত্রুসংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামানো হচ্ছে দেখলে অনেকেরই বিরক্ত হওয়ার কথা। এ কথা শোনার পর হয়তো বহু মানুষ কাঁধে ওজন আছে কি নেই, তা বুঝতে চেষ্টা করবেন।
কয়েকটা প্রমাণ দিলে মনে হবে, দুই পয়সার কথা নয়, কথা মূল্যবান। মানুষ এখন কতটা অসহায়—নিজের খরচে খেয়ে–পরে, নিজের বাড়িঘরে থেকে, নিজের দেশে নিজের পথে নিজের মতে চলতে বলতে পারেন না। কোনো কথা বলার আগে ভেবে নিতে হয়, কে কী মনে করতে পারেন!
কার চলা–বলার ধরন ভালো, কারটা মন্দ, সে বিচার করার জন্য বিচারক মানুষ চারপাশে মুখিয়ে আছেন। এই মুখিয়ে থাকা মানুষেরা কোন ক্ষমতা বা যোগ্যতায় অন্যের বিচারক? পরের মন্দ দেখার দায়িত্ব কোন মহাজন থেকে প্রাপ্ত—এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না কাউকে। এ গোষ্ঠীর জীবনের মহান ব্রত ও বিশেষ কর্মই হচ্ছে সকাল–সন্ধ্যা ওর বা তার ভুল ধরা, কার কী দোষ আছে, তা টেনেটুনে বের করা।
‘বোবার শত্রু নেই’—এ কথা বিশ্বাস করে, বুঝে কেউ যদি মনে করেন কথা বন্ধ রাখি, তাতেও রেহাই মিলবে না। অনেকেই বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করে বসতে পারেন, এই লোক কথা বলেন না কেন, কী আছে তাঁর মনে? অতিবুদ্ধির ঠ্যালায় কেউ কেউ আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, এমন লোক আসলে দেশের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ভিনদেশের চর।
কথা বললেও বিপদ। কেউ যখন কথা বলেন, নিজের ভাবনামতো প্রকাশ করেন নিজের ভাব, বলেন নিজেরই কথা। এ স্বাভাবিকতা বরদাশত করতে পারেন না অনেক মানুষ। মানুষগুলো অযথা তেতে যান নিজের মতো করে কথা বলা মানুষের ওপর। অতি অদ্ভুত মনমানসিকতা, কথা বলতে হবে, নিজের মুখে পরের কথা; না বললে ধরে নেওয়া হবে প্রতিপক্ষ, বনে যেতে হবে মন্দ, বিপজ্জনক মানুষ।
কারও শত্রু হওয়ার মতো নয়, এমন সাদামাটা মানুষও হুট করে যে কারও শত্রু হয়ে যেতে পারেন। যে কথা নিজের কাছে যুক্তিসংগত, যা উচিত, ভালো কথা; তা–ও বলা নিরাপদ ভাবা যাবে না। অযথা অর্থহীন কথা যখন–তখন, যেখানে–সেখানে বলা চলবে; কিন্তু নিজের মতপ্রকাশ পরের গায়ে ফোসকা তৈরি করে দেয়। উচিত কথা উচিত বলেই শোনা, ভাবা ও হজম করার সাধ্য এখন অনেক মানুষের নেই।
দেশে অনেক মানুষ নিজের মতে অধিক মাত্রায় দেশপ্রেমিী বলে ভাবেন, বিশ্বাস করেন এবং প্রায়ই নানা উপায়ে তা জানান দিতে চান। তা জানান দিতে প্রায়ই তাঁরা এ–সে অজুহাতে কাদের দেশপ্রেমের অভাব জানান দেন। নিজেকে আলাদা করে দেখানোর বহু তরিকা জগতে রয়েছে, কিন্তু ‘অপরকে ছোট করে নিজে বড় হও’—সবচেয়ে সহজ এ উপায়টা বেছে নেন অনেক মানুষ। নিজের জ্ঞানে, বিচারে বলাবলি হয়—অমুক পাকিস্তানের দালাল, কাউকে বানানো হয় ভারতের দালাল। ভালো সাজার ও মন্দ বানানোর, ভেদ বাড়ানোর এ খেলা অনেক প্রাচীন। ৭০–৮০ বছর বয়সী মানুষেরা বলবেন, সেই ছোটবেলা থেকে পছন্দমতো পদের পরিচয়দানের প্রথা চালু রয়েছে দেখে আসছি।
দেশে ধাইয়ের হাতে জন্ম নেওয়া, হারিকেন–জ্বলা গ্রামে বড় হওয়া মানুষকে একসময় চীন, রাশিয়া, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল বানানো হয়েছে। বয়স বেড়েছে আর ক্রমে বোঝা গেছে, বিশেষ একটা তকমা লাগিয়ে দিয়ে দড়ি টানাটানির খেলা আসলে স্বার্থবাদ, মানুষকে ভাগ করে নিজ নিজ লাভ কামানোর বুদ্ধি; যে বুদ্ধিতে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ বেড়েছে, বেড়েছে ঘৃণাও। এমন গোষ্ঠীস্বার্থকেন্দ্রিক মানসিকতায় মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বেড়েছে, মানুষের হতাশা বেড়েছে, মানুষ হারিয়েছে সংবেদনশীলতা।
একটা জাতি বহুকাল ধরে বহু পরিচয়ে বিভক্ত হতেই থেকেছে। প্রেম, আবেগ, মায়া, সহনশীলতা ইত্যাদি আস্ত থাকতে পারেনি। টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। তাতে লাভ কতটুকু হয়েছে বা লোকসান কী কী হয়েছে, কখনোই ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখা দরকার মনে করেনি কেউ। ভাবা হয়েছে, ভাগ করো, ঘৃণা বাড়াও—তাতেই মজবুত হবে আত্মতুষ্টি, দইয়ের মতো জমবে দেশপ্রেম।
এখনো নতুন নতুন নামের শত্রু পরিচয় বানানো সগৌরবে চলছে। বহুকালের অভিজ্ঞতায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শত্রু শত্রু খেলাটা আমাদের বিশেষ পছন্দের। এ উটকো স্বভাব আমাদের বেশ সংকীর্ণ বানিয়েছে। অসংখ্য অযৌক্তিক কারণ, অযথা অসন্তুষ্টিতে তাই মানুষের মন নিয়তই বিষিয়ে থাকে, অস্থির থাকে; থাকে বলেই হাল্কা পাতলা সুযোগ পাওয়া মাত্রই ‘উদোর পিন্ডি বুধোর কাঁধে’ চাপানোর প্রবণতা হালুম করে বেরিয়ে পড়ে মানুষের মনের বাগান থেকে। মন্দে যেন মধু রয়েছে! মন্দের টান এড়াতে পারেন না মানুষ। নিত্যই শহরের এখানে–ওখানে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা মানুষের ওপর হঠাৎ রিকশা বা মোটরসাইকেল চড়াও হয়ে যায়। রাস্তা ছেড়ে যে মহাশয়দের ফুটপাতে উঠে চালানোর আহ্লাদ জাগে, তাঁরা এ কাজকে মোটেও দোষের বলে ভাবেন না।
হঠাৎ যাঁরা এমন পরিস্থিতির শিকার হন, এভাবে আক্রান্ত হন, তাঁরাই কেবল চমকে যান, অসভ্যতার জন্য বিরক্তি প্রকাশ করেন। বিরক্তি প্রকাশ করে লাভ হয় না কোনো। এমন ন্যায়–অন্যায় না বোঝা মানুষের দোষ ধরলে নির্দোষ পথচারীকে নিমেষেই শত্রু বনে যেতে হয়। অনেক স্থানে ফুটপাতে দোকানপাট বসানোর ঠ্যালায় হাঁটার পথ মেলে মাত্র হাতখানেক। নিরুপায় নাগরিকদের এমন অসহায় বানানোর পদ্ধতি কোনকালে চালু হয়েছিল, কেউ বলতে পারবে না। চোখ–কান বুঁজে অনেকে সহ্য করেন, করতে হয়। রাগ বা বিরক্ত হলে প্রকাশ না করে চুপ থাকাই শ্রেয়তর। কিছু বলা মানে শত্রু হয়ে যাওয়া। বেহুঁশ অন্যায়কারীদের গায়ে কোনোকালে টোকাও লাগেনি। অন্যায়, উপদ্রব সর্বত্র টিকে থেকেছে বুক চিতিয়ে। শাসনক্ষমতা বদলে গেছে বহুবার, অদৃশ্য, অন্ধকার থেকে এই ফুটপাত শাসন বা শহরের খোলা স্থান ভাড়া দেওয়া অসাধু ক্ষমতার বদল কখনো হয়নি।
অসংখ্য শত্রু বানানোর ফাঁদ দেশ ও সমাজজুড়ে পেতে রাখা। সাবধানে চলার অভ্যাস আয়ত্ত করেও নিস্তার মেলে না। কখনোই ভাবা যাবে না বা দাবি করতে পারবেন না কেউ—আমার চলা–বলা নিরীহ ও নরম, আক্রমণাত্মক নয়, কারও শত্রু হওয়ার আশঙ্কা নেই। দেশের বহু মানুষ শিল্পচর্চা করে জীবনকে উপভোগ করেন। একই দেশের অনেক মানুষের আবার শিল্পচর্চা, সংস্কৃতিভাবনা একেবারেই পছন্দ নয়।
জগতের যা যা তাঁদের অপছন্দের, পছন্দ করা মানুষদের সেই সেই পছন্দ বাদ দিতে হুকুম জারি করে থাকেন তাঁরা। হুকুম কে কার ওপর জারি করছেন, কোন অধিকারে, তা ভেবে দেখার মানুষ তাঁরা নন। তাঁরা ভাবেন, দেশ ও পৃথিবীর সবকিছুর ওপর যেন তাঁদেরই একচ্ছত্র অধিকার। এমন বেয়াড়া রকম অধিকার ফলানোর চেষ্টায় অধিকার ক্ষুণ্ন হয় মানুষের। যাঁরা জোর খাটাতে চান, নিশ্চয়ই তাঁরা তোয়াক্কাহীন। অন্যের অস্তিত্ব ও অধিকার বিষয় নিয়ে তাঁরা একচুলও ভাবতে রাজি নন।
জোড়া চোখ থাকলেও সব মানুষের দেখার শক্তি একরকম নয়। মানুষপ্রতি একটি করে মন, তারও অনুভব করার শক্তি জনে জনে আলাদা। সব মনের দেখা ও বোঝার শক্তি সমান নয় বলেও মানুষ নিত্যই মানুষকে শত্রু বানিয়ে চলেছে। শত্রুতা যেন পোষা বিড়ালের মতো পায়ে পায়ে ঘোরে। মানুষ দোষ করবেন, অশান্তি উদ্বেগের কারণ ঘটাবেন—দেখেও না দেখার, শুনেও না শোনার ভান করে থাকা কঠিন কাজ। খবরের কাগজে কত কত কষ্টকল্পিত খবর ছাপা হয়, টেলিভিশন চ্যানেলে ধোঁকা দেওয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহরহ মানুষের মানহানি করে একদল মানুষ জনপ্রিয়তা কামাচ্ছেন। সব দেখেশুনে মনে হবে, স্বেচ্ছাচারিতার স্বর্গরাজ্য। মনে হবে, ক্ষতি হওয়া মানুষেরা সর্বদাই দুই ধারি তলোয়ারের নিচে গর্দান দিয়ে আছেন।
মানসম্মানের ওপর কোপ পড়ছে, তা থামাতে গেলে কোপের ওজন দ্বিগুণ বেড়ে গিয়ে ধড় থেকে মাথা আলাদা হয়ে যেতে পারে। দুই ধারের শত্রুতা থেকে বাঁচতে মুখ বন্ধ রেখে মনের কষ্ট মনেই পুষে অস্বস্তিতে জীবন কাটান অনেক সাধারণ মানুষ। দেশের মানুষ সবাই রাজনীতি না করুক, সবারই রাজনীতি নিয়ে আলাপসালাপ করতে ভালো লাগে। অফিসে, বাসায়, রেস্তোরাঁয় বা কোনো দাওয়াতে দুই থেকে তিনজন একসঙ্গে হলেই পছন্দের বিষয়টা নিয়ে আলাপজুড়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছটফট করতে থাকে।
দেশপ্রেমীতে দেশভর্তি! কী হবে এই দেশের—এমন ভাবনা নিয়ে আলাপ–আলোচনা শুরু করতে না পারলে মন থেকে ছটফটে ভাব সরে না। অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়েবাড়ি বা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশ নিয়ে, দেশের বর্তমান–ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপসালাপের সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। সুযোগ আলাপে ভরে ওঠে। আলাপ একসময় রং বদলায়। প্রবাহিত হয় ঠিক–বেঠিকের পথে। সে পথ বদলে দেয় স্বভাব। একসময় দেখা যায়, কেউ কারও মতামত শুনতে চাচ্ছেন না। শোনার বদলে প্রত্যেকেই নিজের মত শোনাতে চান।
সবাই দেশের ভালো চান; কিন্তু সে ভালোর মানে, ভালোর ধরন নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী হওয়া চাই। দেশবাসীর অধিকাংশ যদি ‘তালগাছটা আমার’ রোগে ভোগেন, দেশটার দশা করুণ হওয়ারই কথা। এ রোগ সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ভয়ের কথা হচ্ছে, রোগটার কোনো চিকিৎসা নেই। তার মানে ভবিষ্যৎ কেমন মানুষের, এই দেশটার? মানুষ অনেক বেশি ব্যস্ত বর্তমান নিয়ে, আগামীতে কী হতে চলেছে, অত দূরের চিন্তা মাথায় থাকে না। সর্বদা সবাই নিজের জগৎশ্রেষ্ঠ মতামত নিয়ে সন্তুষ্ট, সুখী—যা আর এক বিচারে অতি ঘোরাচ্ছন্নও। যে ঘোর ভয়ানক, যাতে মুক্তির আলো বা তার সম্ভাবনা নেই, থাকে না।
দীর্ঘদিন ধরে অযৌক্তিকতার অনুশীলন ও স্বার্থপরতার চর্চায় মেতে থেকে থেকে ভোঁতা হয়ে গেছে মানুষের বোধ। এখন উপদ্রব, অশান্তি ও অস্বস্তিকর ঘটনায় অনেক মানুষের মন উজ্জীবিত হয়। এখন কোনো মানুষ সুনির্দিষ্ট কারণে শক্র বনে যান না। শুধু চোখ বড় করে গলা ও আঙুল তুলে দেখালেই হয়, ওই যে ওই মানুষটা শত্রু। কার শত্রু, কেন শত্রু, কীভাবে শত্রু—কোনো প্রশ্নই জাগে না মনে। কেউ একজন শত্রু শনাক্ত করে দিয়েছেন, অসন্তুষ্ট মানুষের দল হইহই–রইরই করে হামলে পড়ে শত্রুর ওপর। একজন মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে জীবন সার্থক করে! যে মানুষটা মরলেন, তিনি জানতেই পারেন না কেন তাঁকে মরতে হলো। দেশ শত্রু নির্মাণের কারখানা নয়, মানুষেরা শত্রু শত্রু খেলায় মেতে থেকে হারিয়ে ফেলবেন নিজেদের ভাষা।
আফজাল হোসেন অভিনেতা, লেখক, নির্দেশক ও চিত্রশিল্পী
*মতামত লেখকের নিজস্ব