চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

মতামত

চট্টগ্রামে নির্বাচন: উৎসব, উৎকণ্ঠার সহাবস্থান

মধ্য মাঘের শীতলতাকে ছাড়িয়ে এখন উষ্ণতা ছড়াচ্ছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শুরু থেকেই কী এক অজ্ঞাত কারণে এই নির্বাচন আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি ছিল জনমনে। কিন্তু দ্বিধা আর বিভ্রান্তির ভেতর সারা দেশে নির্বাচনী উৎসব শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামেও একই রকম আমেজ।

নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, চট্টগ্রাম ততই বদলে যাচ্ছে। এই বদল কেবল পোস্টার, মাইক কিংবা গণসংযোগের ভিড়ে নয়—এই বদল মানুষের কথাবার্তায়, আড্ডায়, এমনকি কারও কারও নীরবতার ভেতরেও। বাজারে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, চায়ের দোকানে বসে কিংবা গ্রামের উঠানে, সবখানেই এখন একটাই আলোচনা—ভোট।

চট্টগ্রামের রাজনীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে নির্বাচন মানেই শুধু দল আর প্রার্থীর লড়াই নয়; এটা মানুষের সামাজিক মিলনমেলা, স্মৃতিচারণা, প্রত্যাশা আর ক্ষোভ প্রকাশেরও উপলক্ষ। বহুদিন পরপর এমন একটি সময় আসে, যখন রাজনীতি সাধারণ মানুষের দরজায় এসে কড়া নাড়ে। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

সব হিসাব-নিকাশ শেষে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মোট প্রার্থী দাঁড়াল ১১৫ জনে। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী হলেন চট্টগ্রাম-১ মিরসরাইয়ে নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়িতে সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপে মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ডে (নগর আংশিক) মো. আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারীতে (নগর আংশিক) মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৬ রাউজানে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়ায় হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ বোয়ালখালী-চান্দগাঁওয়ে এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ বাকলিয়া-কোতোয়ালিতে মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ ডবলমুরিং-খুলশী-হালিশহরে সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-১১ বন্দর-পতেঙ্গায় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১২ পটিয়ায় মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে সরওয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশে আলহাজ্ব জসীম উদ্দীন আহমদ, চট্টগ্রাম-১৫ লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় নাজমুল মোস্তফা আমীন, চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালীতে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোট ১৪ জন। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম-১ মিরসরাইয়ে মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান, চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়িতে মোহাম্মদ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপে মুহাম্মদ আলা উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ডে (নগর আংশিক) মো. আনোয়ার ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম-৬ রাউজানে মো. শাহজাহান মঞ্জু, চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়ায় এ টি এম রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম-৮ বোয়ালখালী-চান্দগাঁওয়ে মো. আবু নাছের, চট্টগ্রাম-৯ বাকলিয়া-কোতোয়ালিতে ডা. এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-১০ ডবলমুরিং-খুলশী-হালিশহরে মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ বন্দর-পতেঙ্গায় মোহাম্মদ শফিউল আলম, চট্টগ্রাম-১২ পটিয়ায় মোহাম্মদ ফরিদুল আলম, চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে মাহমুদুল হাসান, চট্টগ্রাম-১৫ লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালীতে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।

এসব আসনে চট্টগ্রামের গ্রাম থেকে শহর, সবখানেই এখন নির্বাচনী আমেজ। কোথাও গণসংযোগ ঘিরে উৎসব, কোথাও আবার দ্বিধা ও প্রশ্ন। মানুষের মধ্যে আগ্রহ আছে, আবার সংশয়ও আছে। কেউ বলছেন, ‘ভোট দিলি কি আর ভাইগ্য পাল্টাইবু না।’ আবার কেউ বলছেন, ‘যে লাউ আর সেই হদু।’ আবার কারও কারও মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ আর কৌতূহল। ৩০ জানুয়ারি কচুয়ায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জনসংযোগ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে থাকা একজন বলেন, জনসংযোগে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী এনামুল হকের জনসংযোগে যোগদানকারী একজন কর্মী বলছেন, ‘এক আশ্চর্য জোয়ার এসেছে মানুষের মনে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ এগিয়ে আসছে।’

এই দ্বৈত মনোভাবই আসলে চট্টগ্রামের বর্তমান নির্বাচনী বাস্তবতা। মাঠে দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীরা ব্যস্ত। কেউ গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরছেন, কেউ শহরে সভা করছেন। দলীয় নেতা–কর্মীরা সক্রিয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চলছে। তবে সেই সঙ্গে চলছে নানা গুঞ্জন, হিসাব-নিকাশ, জোটের অঙ্ক, সরে দাঁড়ানো আর ফিরে আসার খবর। সাধারণ ভোটার এসব খবর ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

বিশেষ করে কিছু আসনে প্রার্থিতা নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা ভোটারদের মনে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। কে শেষ পর্যন্ত মাঠে আছেন, কার প্রতীক কী—এসব প্রশ্ন এখনো অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। অথচ ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসে, ভোটারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন তত বাড়ে।

তবু এর মধ্যেই উৎসব আছে। গণসংযোগ মানেই এখন গ্রামে ভিড়, পরিচিত-অপরিচিত মানুষের দেখা, দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক আলোচনা মুখোমুখি বসে করার সুযোগ। কেউ আসছেন দলীয় আনুগত্য থেকে, কেউ আবার নিছক কৌতূহল নিয়ে। নির্বাচন যেন গ্রামবাংলার একধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনী প্রশাসন বলছে, প্রস্তুতি আছে। কেন্দ্র, কক্ষ, ভোটার—সব হিসাবই ঠিকঠাক। কিন্তু নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক আয়োজন নয়; এটা মানুষের বিশ্বাসের প্রশ্ন। সেই বিশ্বাস কতটা ফিরছে, সেটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

চট্টগ্রামের মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন—এ কথা ব্যাপকভাবে বলা হয়। কিন্তু সেই সচেতনতা এখন আগের মতো সরল নয়। এখন মানুষ হিসাব করে কথা বলে, শোনে, দেখে। উন্নয়ন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান—এসব বড় প্রশ্নের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

শহরের ভোটারদের সঙ্গে গ্রামের ভোটারদের ভাবনার পার্থক্যও স্পষ্ট। শহরে আলোচনা বেশি জাতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। গ্রামে আলোচনা বেশি স্থানীয় প্রতিনিধি কেমন হবেন, কে এলাকায় থাকবেন, কে বিপদে পাশে দাঁড়াবেন—এসব নিয়ে। তাঁরা ভাবেন স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়ে কোন প্রার্থী বেশি ভাবেন।

এই নির্বাচন চট্টগ্রামের জন্য আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির যে টানাপোড়েন, আস্থার যে সংকট, তার ভেতর দিয়ে মানুষ আবার ভোটের মাঠে ফিরছে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ যেমন আছে, তেমনি আছে শঙ্কাও—ভোট আদৌ নিজের মতো করে দেওয়া যাবে তো?

নির্বাচনী প্রশাসন বলছে, প্রস্তুতি আছে। কেন্দ্র, কক্ষ, ভোটার—সব হিসাবই ঠিকঠাক। কিন্তু নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক আয়োজন নয়; এটা মানুষের বিশ্বাসের প্রশ্ন। সেই বিশ্বাস কতটা ফিরছে, সেটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এবার কোনো একক অনুভূতি নেই। আছে উৎসব, আছে প্রত্যাশা, আবার আছে অনিশ্চয়তা। এই সবকিছু মিলিয়েই আসন্ন নির্বাচন। হয়তো ফলাফল যাই হোক, এই নির্বাচন চট্টগ্রামকে আরেকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে—আমরা কি কেবল ভোট দিতে পারছি, নাকি সত্যিই অংশ নিতে পারছি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চট্টগ্রামের মানুষ এখন অপেক্ষায়—ভোটের দিনের জন্য।

  • ওমর কায়সার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব