
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে কিছু কাজ হয়েছে। এখন অর্থনীতির সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়েও আলাপ জরুরি। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ছাড়া কেবল রাজনৈতিক সংস্কার দেশে শান্তি আনবে না। অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব
বাংলাদেশে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বড় হচ্ছে। বাজেটের আয়তন বাড়ছে। ৫৪ বছরে অবকাঠামোগত উন্নয়নও অনেক হয়েছে; কিন্তু সমাজে আয়বৈষম্য ও ধনবৈষম্য ব্যাপক এখানে। এই বৈষম্যই সামাজিক শান্তির মুখ্য শত্রু; যদিও মানুষের মনোযোগ সরিয়ে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক যুদ্ধ লাগানো আছে।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের ‘বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদনে’ বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, এখানে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিক সমাজের ওপরতলার ১০ শতাংশ ধনী। শীর্ষ ১ শতাংশের কাছে রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় ২৫ ভাগ। নিচুতলার ৫০ ভাগ মানুষের কাছে আছে জাতীয় সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আয়ের ক্ষেত্রেও তীব্র অসমতা চলছে। জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ চলে যায় শীর্ষ উপার্জনকারী ১০ শতাংশের হাতে। নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষ সবাই মিলে আয় করে মাত্র ১৯ শতাংশ।
অর্থনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা গোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়। প্রশাসনকেও তারা বেশি প্রভাবিত করতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতিদের একচেটিয়া আধিক্য দেখা যাচ্ছে। একটি বড় দলে ৭৫ ভাগ প্রার্থী কোটিপতি। ক্ষমতা পেয়ে ধনী রাজনীতিবিদেরা তাঁদের জন্য সুবিধাজনক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই রক্ষা করতে চাইবেন। ফলে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনে’ও অর্থনীতির বৈষম্যপীড়িত চিত্র হয়তো সামান্যই বদলাবে এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশকে সম্ভাব্য আরেক ‘লাল জুলাই’য়ের ঝুঁকিতে থাকতে হবে।
নাগরিক সমাজের একাংশ মাঝেমধে৵ এ রকম প্রশ্ন তোলে, বৈষম্য কীভাবে কমানো যাবে, সবার স্বার্থে পর্যাপ্ত উন্নয়নের দেশজ সম্পদের জোগান কোথায়? বৈষম্যের পাশাপাশি সম্পদের স্বল্পতা প্রকৃতই পরস্পর সংযুক্ত সমস্যা। তবে সম্পদ বাড়ানো সম্ভব এবং বৈষম্য কমাতে হলে কেবল সম্পদের জোগান যথেষ্ট নয়, বৈষম্য কমানোর উপায় নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
শুরুর কাজ
বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২০ ডলার। টাকার অঙ্কে যা সাড়ে তিন লাখ টাকার কাছাকাছি। এই আয় হিসাব হয় জাতীয় আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। মাথাপিছু আয়ের বড় অঙ্ক দেখিয়ে নীতিনির্ধারকেরা বাহবা পেলেও এতে সমাজের নিচুতলার আয়ের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না। কারণ, দেশে অন্তত ২০ ভাগ মানুষ যে দরিদ্র, সেটিও সমকালীন বহু গবেষণায় জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ কম করে হলেও তিন-চার কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে, যারা গবেষকদের মানদণ্ডে মাসে খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে ৩ হাজার ৮২২ টাকাও খরচ করতে পারছে না।
একদিকে অনেক দরিদ্র, অন্যদিকে গড় আয়ের মোটাতাজা চিত্রে স্পষ্ট, এখানে আয় ও সম্পদের বিপুল বৈষম্যের পাশাপাশি একদল মানুষ বিপুল আয় করে। বিপুল সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে তাদের হাতে। অথচ দেশটি প্রতিবছর অতি কম দেশজ সম্পদ নিয়ে উন্নয়ন বাজেট তৈরি করে। এই কম বাজেটের কারণ রাষ্ট্রের আয় কম। একদিকে সমাজে সম্পদবৈষম্য, অন্যদিকে বিপুল সম্পদশালী একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বাংলাদেশে ভয়াবহ ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগী তিন আন্তর্জাতিক সংগঠনের ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ট্যাক্সিং এক্সট্রিম ওয়েলথ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার ৫৫০ জনের কাছে ৫ মিলিয়ন ডলার বা তার চেয়ে বেশি করে নিট সম্পদ রয়েছে। এর মধে৵ ৫০ মিলিয়ন ডলার বা তার চেয়ে বেশি করে সম্পদ আছে অন্তত ১৯৫ জনের। এই ১৯৫ জনের যৌথ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের সমান, যা নিচুতলার ৫ কোটি বাংলাদেশির সম্পদের চেয়েও ২ দশমিক ৬ গুণ বেশি। গড় সাদামাটা হিসাবে দেখা যায়, এ রকম সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর যদি নতুন করে ৫ শতাংশ সম্পদকর আরোপ করা যায়, তাহলে কেবল ১৯৫ ব্যক্তি থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কর আহরণ সম্ভব। টাকার হিসাবে এটা প্রায় ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
দেশজ সম্পদ সংগ্রহের বড় জায়গা সরকারের আদায়কৃত কর। করব্যবস্থায় সংস্কার করে যদি কর আহরণ বাড়ানো যায় এবং সেটি যদি সুবিধাবঞ্চিতদের উন্নয়ন হয় এমন কাজে ব্যবহৃত হয়, তবেই কেবল বৈষম্য কমানো সম্ভব। অর্থাৎ একদিকে করব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে; অন্যদিকে সেই সম্পদবৈষম্যের শিকার মানুষদের জীবনও এলাকামুখী করতে হবে। এ রকম এলাকা হতে পারে সীমান্ত এলাকা, শ্রমিকপল্লি, দলিতপল্লি, চর এলাকা, নারী সমাজের বিশেষ বিশেষ অংশ, আদিবাসী এলাকা ইত্যাদি।
সমাজের কোথায় সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে এবং কোথায় দারিদ্র্য বেশি, সে বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান, শুমারি ও তথ্যব্যাংক দরকার। এটা শুরুর কাজ। তবে এ রকম নতুন শুমারির আগেও দরিদ্র এলাকা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে শনাক্ত করা কঠিন নয়। নানান সংস্থার ইতিমধ্যে করা দারিদ্র্য গবেষণাগুলো এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়।
আয়বৈষম্য একটি সামাজিক ব্যাধি। এ থেকে অশান্তি, অসন্তোষ, অস্থিতিশীলতা, অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। বৈষম্যপীড়িত মানুষের ভোগ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণে ব্যয় ও বিনিয়োগ কম থাকে। কম আয়, কম পুষ্টি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একটি চক্র তৈরি হয় তাদের জীবনে। এই চক্র নিজেকে পুনঃ উৎপাদন করে প্রতিনিয়ত। অর্থনৈতিক বঞ্চনা যখন বড় একটা জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় পিছিয়ে রাখে, সেটি কার্যত দেশকে পিছিয়ে রাখে। তখন মানবসম্পদের বড় অংশ জাতীয় বোঝায় পরিণত হয়। বৈষম্যের শিকার মানুষ প্রশাসন, রাজনীতি ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায় সহজে প্রবেশ করতে পারে না।
বৈষম্য কমাতে দরকার অর্থনৈতিক সংস্কার
যদি বৈষম্যকে আমরা প্রধান সমস্যা মানি এবং সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টনকে করণীয় ভাবি, তাহলে দায়িত্ব হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার। বৈষম্য কমাতে ও সমাজের সুষম অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বহু ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়। যেমন সম্পদকর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ও সম্প্রসারণ, সংসদ সদস্যসহ নানান জনের শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আনা বন্ধ করা, ব্যক্তি করদাতাদের পরিসর বাড়ানো, করহার পুনর্বিন্যাস করা, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির কর বৃদ্ধি, অর্থ পাচারে জিরো টলারেন্স, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ রাখা, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আইন করা, শিল্পের মুনাফায় শ্রমিকের হিস্যা বাড়ানো, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে যাওয়া, অর্থনীতির অপ্রাতিষ্ঠানিক দিকে করের আওতা সম্প্রসারণ, সারচার্জের ফাঁকি বন্ধ করা ইত্যাদি।
কর আদায়ের ব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত করা গেলে এবং তাতে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা কায়েম করা গেলেও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বিপুলভাবে বাড়বে। গবেষণা সংস্থা সিপিডি ১২৩টি কোম্পানির ওপর এক গবেষণা শেষে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল প্রাপ্ত ফল তুলে ধরে জানিয়েছিল, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকির মাধ্যমে আনুমানিক ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা বঞ্চিত হয়েছে দেশ। এর মধ্যে করপোরেট কর ফাঁকি অর্ধেক। ৪৫ শতাংশ কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদের কাছে ঘুষ চাওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালে যত টাকা কর ফাঁকি দেওয়ার কথা, সিপিডির গবেষণা অনুমান সেটি ২০২৪ সালে আদায়কৃত রাজস্বের (৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা) প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ! তার মানে দুর্নীতি ও কর ফাঁকি রোধ করে বর্তমান ব্যবস্থাতেই অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ দ্বিগুণ করা সম্ভব। পাশাপাশি সেই দেশজ সম্পদ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দিকে স্থানান্তরেও কার্যকর উপায় খুঁজতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের শিক্ষা–সহায়তা, প্রশিক্ষণ–সহায়তা, আবাসন–সুবিধায় বিনিয়োগ, তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, একটি বিশেষ বয়স শেষে সবার জন্য পেনশন–সহায়তা দেওয়া ইত্যাদি।
রাজস্ব আয় ও কর-জিডিপি অনুপাত প্রসঙ্গ
জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের সংশোধিত লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরের বছর ওই লক্ষ্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। রাজস্ব আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ। তবে বাংলাদেশে এ রকম লক্ষ্যমাত্রা পূরণজনিত সমস্যা আছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম গত ডিসেম্বরে এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবে এখানে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এটা দ্বিগুণ হওয়া দরকার। ভারতে এটা ২০২৪-২৫ সালে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। পাকিস্তানে ছিল ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ।
যেকোনো দেশের উচ্চ কর-জিডিপি অনুপাত প্রমাণ করে, দেশের উন্নয়ন-প্রয়োজন মেটাতে পর্যাপ্ত তহবিল আসছে। কম অনুপাত নির্দেশ করেÑসরকার কর আদায়ে দুর্বল, ফলে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও সীমিত। বাংলাদেশকে এই অবস্থা অতিক্রম করতে হবে। এর মানে এই নয়, বিশ্বব্যাংক চায় বলে আমরা সেটি করব। বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে নিজের পরিকল্পনায় সেটি করতে হবে।
করহার যৌক্তিকীকরণ এবং করব্যবস্থায় ভ্যাটনির্ভরতা
বাংলাদেশে কর আসে মোটাদাগে দুই ধরনের পথে। সরাসরি কর ও পরোক্ষ কর আকারে। বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। এরপর আয় অনুযায়ী পাঁচটি ধাপে ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর ধার্য রয়েছে। চূড়ান্ত ধাপে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আয়কারী ব্যক্তিদের পরবর্তী অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর দিতে হয়। এই আয়কর কাঠামো নিয়ে পুনর্ভাবনা দরকার।
এই নিয়মের চূড়ান্ত ধাপের শেষে যাঁদের অতিরিক্ত ৪০ লাখ পর্যন্ত আয় এবং যাঁদের এক কোটি টাকা পর্যন্ত আয়, তাঁদের করহার কেন সমান হবে? উচ্চ ধনীদের করহার ক্রমান্বয়ে আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে কি না, সেটি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশে এ রকম ধনীর সংখ্যা বিপুল বেগে বাড়ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোতে কোটি টাকা বা তার বেশি পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে, এমন হিসাব রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার। এটা হলো পুরো সম্পদচিত্রের ‘টিপ অব আইসবার্গ’।
যেহেতু আয়করদাতার সংখ্যা কম, সে কারণে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের পুরো ব্যাপারটা এখানে বড় আকারে ভ্যাটনির্ভর। ১৯৯১ সালে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করব্যবস্থা চালু হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন বলছে, ভ্যাটের মাধ্যমে কর আদায় ২২ গুণ বেড়েছে। ২০০০-০১ অর্থবছরে ভ্যাট আদায় হয় ৮ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। ভ্যাট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্রেতার কাছ থেকেই সমন্বয় করে। এটা দুভাবে সমন্বয় হয়—বিক্রীত দ্রব্যের পরিমাণ কমিয়ে বা দাম বাড়িয়ে। উভয়ভাবেই ক্রেতার ক্ষতি।
অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, সরকার আয়করের পরিসর বাড়াতে না পেরে ভ্যাটের পরিসর বাড়াচ্ছে। তাতে পরোক্ষ করের চাপ পড়ছে নিম্নবিত্ত ব্যক্তিদের ওপর। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ যা কিনছেন, তার প্রায় সবকিছুতে ভ্যাট। ভোগ্যপণ্যে ক্রমবর্ধমান ভ্যাট মানে সেটি নিম্ন আয়ের মানুষের জমানো টাকা কমিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে আয়করের আওতা ও হার সীমিত থাকার মানে, সেটি ধনীদের জমা বাড়িয়ে চলেছে। যেকোনো ন্যায্য করব্যবস্থায় উল্টোটি হওয়া সংগত।
আয়করব্যবস্থার মতো ভ্যাটব্যবস্থাও এখানে অর্থনীতির অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসরকে আওতায় আনতে পারছে কম। অপ্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহকারীদের অনেকে শত শত পণ্যে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে নগদ লেনদেনে বিপুল আয় করছেন। করের আওতায় আনা হচ্ছে না তাঁদের; কিন্তু উৎপাদক ও ভোক্তাপর্যায়ে মূসক বেড়ে চলেছে। এ অবস্থার উন্নয়নে লেনদেন ব্যাপকভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে আনা জরুরি। তবে একই সঙ্গে এটিও বিবেচনায় রাখতে হবে, রাজস্ব আহরণ যেন মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের ওপর ‘করসন্ত্রাসের’ আদল না নেয়। সেটি যেন বড় পুঁজিমুখী হয়; পাশাপাশি অটোমেশন–নির্ভর কারখানা এবং কর্মসংস্থানবান্ধব শিল্প যেন গড় করের শিকার না হয়।
আলতাফ পারভেজ গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব