ইয়েমেনের চলমান সংকটে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে
ইয়েমেনের চলমান সংকটে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

মতামত

ইয়েমেনে শান্তি ফেরানো যে কারণে কঠিন

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত যুদ্ধবিরতি, সামরিক উত্তেজনা কমানো, মানবিক সহায়তা এবং প্রধান সশস্ত্র পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা গুরুত্ব পায়। যুদ্ধ বন্ধের জন্য এসব উদ্যোগ জরুরি। কিন্তু বারবার শান্তি উদ্যোগ নেওয়ার পরও কেন স্থায়ী সমাধান আসছে না, তার পুরো ব্যাখ্যা এতে পাওয়া যায় না।

ইয়েমেনের সংকট শুধু কেন্দ্রীয় সরকার কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই বিরোধ নয়। রাষ্ট্রের কাঠামো কেমন হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হবে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ মর্যাদা কী হবে, তা নিয়েও বিরোধ রয়েছে। এসব প্রশ্নের মধ্যে দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তা অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

এই প্রশ্ন এড়িয়ে শান্তিচুক্তি হলে সাময়িকভাবে সহিংসতা কমতে পারে। কিন্তু নতুন সংঘাতের কারণগুলো থেকেই যাবে। তাই আঞ্চলিক সরকার ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের শুধু আলোচনার টেবিলে পক্ষগুলোকে ফিরিয়ে আনলেই চলবে না। অস্থিরতার মূল কারণ মোকাবিলায় কার্যকর রাজনৈতিক কাঠামোও গড়তে হবে।

ইয়েমেনের জন্য এমন কোনো চুক্তি দরকার নেই, যা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেয়।

ইয়েমেনের যুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রকল্প, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও গভীর অর্থনৈতিক সংকট জড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরোধ মেটানোর আলোচনা দিয়ে দেশের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জাতিসংঘের শান্তি উদ্যোগ কূটনীতির গুরুত্ব ধরে রাখলেও মৌলিক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কোন কোন জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা সেখানে প্রতিফলিত হবে?

১৯৯০ সালে উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হয়। কিন্তু এতে ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে বিরোধের অবসান ঘটেনি। ১৯৯৪ সালের যুদ্ধ বিভাজন আরও গভীর করে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণের মানুষের ক্ষোভ থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। তবে দক্ষিণের সব জনগোষ্ঠী একই রাজনৈতিক অবস্থান ধারণ করে না, কিংবা একটি সংগঠনকে সবাই নিজেদের প্রতিনিধি মনে করে না। হাদরামাউত, এডেন, শাবওয়া, লাহিজ, আবিয়ান ও আল-মাহরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস, স্বার্থ ও অগ্রাধিকার আলাদা।

তাই দক্ষিণের প্রশ্নকে একটি সংগঠনের অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। আবার দক্ষিণের রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে বলে তাদের আকাঙ্ক্ষাকেও উপেক্ষা করা ঠিক নয়। শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশ, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং দক্ষিণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ইয়েমেনের সামগ্রিক শান্তি আলোচনার পাশাপাশি দক্ষিণের ভবিষ্যৎ নিয়ে পৃথক রাজনৈতিক আলোচনা, সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা থাকা জরুরি।

ইয়েমেনের জন্য এমন কোনো চুক্তি দরকার নেই, যা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেয়। দরকার এমন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে দক্ষিণের মানুষের ভবিষ্যৎ সরাসরি আলোচিত হবে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠী অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করা যাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাজ কোনো পূর্বনির্ধারিত ফল চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং ন্যায্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।

২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি দক্ষিণের অন্তর্বর্তী পরিষদের নেতা এইদারুস আল-জুবাইদি দক্ষিণের জন্য প্রস্তাবিত একটি সাংবিধানিক ঘোষণার কথা জানান। এতে দুই বছরের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের প্রস্তাব করা হয়। এ সময়ের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়।

এই উদ্যোগ দক্ষিণের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে দক্ষিণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ইয়েমেনকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে ঘোষণাটি দক্ষিণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট পথ তৈরির চেষ্টা। কিন্তু একতরফা ঘোষণা করলেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, কিংবা অন্য দেশগুলোকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করা যায় না। ইয়েমেন সরকার এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ঘোষণার সময় জাতিসংঘও এতে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়নি।

তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেই দক্ষিণের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। একইভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর ঘোষণা দিলেই প্রতিনিধিত্ব, আঞ্চলিক শাসন, প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নগুলোর সমাধান হয় না। প্রস্তাবিত গণভোট কীভাবে হবে, দক্ষিণের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কীভাবে অংশ নেবে এবং প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে কী সুরক্ষা দরকার—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা উচিত

স্বাধীনতার সমর্থকদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ তৈরি করা। প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব, ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এমন প্রক্রিয়া, যা দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আস্থা অর্জন করতে পারে। একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

হাদরামাউত এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্পদ, সামাজিক কাঠামো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক একে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। কিন্তু সেখানকার মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। স্থানীয় শাসন, নিরাপত্তা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাদের মতামত উপেক্ষা করা যাবে না। দক্ষিণের কোনো একটি সংগঠন সব জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতে পারে—এমন ধারণা নতুন করে বঞ্চনা সৃষ্টি করতে পারে। তাই স্বচ্ছভাবে সরকারি আয় ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিমূলক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, কার্যকর জনসেবা এবং আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

দক্ষিণের ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর সমাধানের জন্য চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাজনৈতিক মর্যাদা ও সম্ভাব্য সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ পৃথক আলোচনা শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দল, আঞ্চলিক প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আইনি ও কূটনৈতিক পথ স্পষ্ট করতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে অর্থনীতি, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসন ও জরুরি জনসেবা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে।

ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক দুর্দশা বাড়বে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা জরুরি। কিন্তু জরুরি পদক্ষেপের নামে কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে রাখা ঠিক নয়। দক্ষিণের ভবিষ্যৎ অমীমাংসিত থাকলে সাময়িক শান্তির পরও সংঘাত ফিরে আসতে পারে।

ইয়েমেনের জন্য এমন কোনো চুক্তি দরকার নেই, যা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেয়। দরকার এমন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে দক্ষিণের মানুষের ভবিষ্যৎ সরাসরি আলোচিত হবে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠী অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করা যাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাজ কোনো পূর্বনির্ধারিত ফল চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং ন্যায্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।

কূটনীতির সাফল্য শুধু বিরোধকে পিছিয়ে দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং তা সমাধানের পথ তৈরি করার মধ্যে। দক্ষিণের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট উত্তর না আসা পর্যন্ত ইয়েমেনের শান্তিপ্রক্রিয়াও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

  • সাদ্দাম ওবাইদ ইউসুফ আল-জুবাইদি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ও লেখক

  • মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত