বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক

মতামত

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে কেন আপস নয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেরই ধারণা ছিল, ড. আহসান এইচ মনসুর তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করবেন। সেই আশা ভুল ছিল। কারণ, রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নিজেদের পছন্দের লোকদেরই বসায়। এটি বিশ্বজুড়েই প্রচলিত।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদটি অত্যন্ত বিশেষায়িত ও কারিগরি। তাই এই পদ থাকা উচিত রাজনীতির ঊর্ধ্বে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গভর্নরকে অপসারণ করা কোনো সরকারেরই উচিত নয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে আইনগত সুরক্ষার কারণে সহজে অপসারণ করা যায় না।

বাংলাদেশের মতো দেশে গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে নাজুক। শাসনব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম ও প্রক্রিয়ার চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের পরিবেশে অনেক সময় নিয়মকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটে এবং সঠিক প্রক্রিয়ার বদলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রাধান্য পায়। অথচ প্রতিষ্ঠিত নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার ওপর, যা নিশ্চিত হয় সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতেই পারে। কিন্তু সেটি কীভাবে করা হচ্ছে, তা আমাদের প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও পরিপক্বতার পরিচয় দেয়। গভর্নরের পদটি কেবল একটি চাকরি নয়; এটি আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। পরিবর্তন যদি অনিবার্যও হয়, তবু সেটি আরও সম্মানজনক ও শালীনভাবে করা যেত। গণমাধ্যমে হঠাৎ করে অপসারণের ঘোষণা দেওয়া এবং আকস্মিক বিদায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। নীতিগত মতভেদ থাকলেও, সংকটের সময়ে দায়িত্ব পালনকারী একজন গভর্নর আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানজনক বিদায় পাওয়ার অধিকার রাখেন।

নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়েও অনেক প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠেছে। তাঁর যোগ্যতা, পেশাগত পটভূমি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ ধরনের নিয়োগের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সরকারের এখতিয়ারভুক্ত, কারণ বাংলাদেশে এসব পদে সাধারণত উন্মুক্ত ও কাঠামোবদ্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না।

বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের পদ্ধতি আলাদা হলেও প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে সাধারণত দক্ষতা, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রাখা হয়। গভর্নর হওয়ার জন্য অর্থনীতি, বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সাধারণত নিয়োগ দেয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষায় এবং ইচ্ছেমতো অপসারণ ঠেকাতে আইনগত সুরক্ষা রাখা হয়।

উন্নত ও উদীয়মান অনেক দেশে সাধারণত তিনটি বিষয় দেখা যায়। প্রথমত, গভর্নর নিয়োগ হয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নয়। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট মেয়াদ দেওয়া হয়, যাতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তৃতীয়ত, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অপসারণের সুযোগ সীমিত থাকে বা তা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়। কিছু দেশে সংসদীয় শুনানি বা আইনসভায় অনুমোদনের ব্যবস্থাও থাকে, যা স্বচ্ছতা বাড়ায়।

উন্নত ও উদীয়মান অনেক দেশে সাধারণত তিনটি বিষয় দেখা যায়। প্রথমত, গভর্নর নিয়োগ হয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নয়। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট মেয়াদ দেওয়া হয়, যাতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তৃতীয়ত, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অপসারণের সুযোগ সীমিত থাকে বা তা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়। কিছু দেশে সংসদীয় শুনানি বা আইনসভায় অনুমোদনের ব্যবস্থাও থাকে, যা স্বচ্ছতা বাড়ায়।

মূল নীতিটি সহজ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করবে, তবে দৈনন্দিন রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। সুদের হার, তারল্য ব্যবস্থাপনা বা ব্যাংক তদারকির মতো সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত দক্ষতা। তাই যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া গভর্নরকে হঠাৎ নিয়োগ বা অপসারণ করা হলে বাজারে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বস্তুত, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে না; বরং নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচিত ও সুরক্ষিত হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট মেয়াদ এবং আইনগত সুরক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। এগুলো আর্থিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ভিত্তি।

বাংলাদেশ ব্যাংকে যে ধরনের সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু একটি দপ্তর নয়; এটি দেশের আর্থিক সার্বভৌমত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতীক। যদি কোনো গোষ্ঠী শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা বাজার ও আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দেয়। এতে শুধু গভর্নরের কর্তৃত্বই নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করা আইনের শাসন ও জন–আস্থা বজায় রাখার
জন্য অপরিহার্য।

গভর্নর অপসারণ ও নতুন নিয়োগের পুরো ঘটনাটি আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড. মনসুর ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন।

ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, নিয়ম শিথিল করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ—এসব কারণে শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এসব গভীর সমস্যা সমাধানে কঠোর ও অনেক সময় অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল। তাঁর সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুর্বল কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়। কিছু ব্যাংকে সম্পদের গুণগত মান যাচাই (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) করা হয়, যাতে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানা যায়। আরও কয়েকটির পর্যালোচনা চলমান রয়েছে।

বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে একটি শক্তিশালী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাও শুরু হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন ও ব্যাংক রেজোল্যুশন কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন ও শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি। তবে সংশোধিত আদেশটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে।

নতুন গভর্নর নিয়োগের পর আশা করা হচ্ছে, আগের শুরু হওয়া সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যাতে ব্যাংক খাত অর্থনীতিকে আরও কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারে। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, নতুন গভর্নর প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও সততা রক্ষা করবেন। গভর্নরের দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার নির্ধারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সিদ্ধান্তগুলো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে নিতে পারে।

নিউজিল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, জার্মানি, চিলি, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো দেখিয়েছে যে স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে ১৯২০-এর দশকে জার্মানির উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্জেন্টিনার পুনরাবৃত্ত সংকট, জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা যুক্তরাষ্ট্রের ষাট ও সত্তর দশকের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক প্রভাব কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর মুদ্রানীতি, বিনিময় হার সমন্বয় এবং সমন্বিত স্থিতিশীলতা কর্মসূচির মাধ্যমে তারা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে বড় ধস এড়াতে সক্ষম হয়েছে। এটি দেখায়, সময়মতো দৃঢ় ও পেশাদার সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হতে পারে।

তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংককে তার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে, সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং নীতিগত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে হবে। স্বাধীনতা ও জবাবদিহি একসঙ্গে চলতে হবে। স্বচ্ছতা ছাড়া স্বাধীনতার গ্রহণযোগ্যতা থাকে না, আর স্বাধীনতা ছাড়া জবাবদিহি অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ, তখন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত হবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি ও সবার জন্য সমৃদ্ধির ভিত্তি শক্ত করা।

  • ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

    মতামত লেখকের নিজস্ব