মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মতামত

ট্রাম্পকে কেন শুনতে ‘বাধ্য’ গোটা বিশ্ব?

মার্কিন সংবিধানে ‘ক্ষমতার বিভাজন’ শব্দবন্ধটি সরাসরি নেই, কিন্তু সংবিধান কার্যত তিনটি শাখার মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দিয়েছে। বিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসে, নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে এবং বিচারিক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টে। সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত ক্ষমতাবলির মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যাপক নির্বাহী, আইন প্রণয়ন-সম্পর্কিত এবং সামরিক ক্ষমতার অধিকারী—সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক, আইন স্বাক্ষর বা ভেটো প্রদান, চুক্তি সম্পাদন (সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে), বিচারপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগ, ক্ষমা প্রদান এবং আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা—সবই তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

এ অর্থে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশটির, এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তবে এই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত থাকার কথা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বেড়েছে, বিশেষত নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়নের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন প্রেসিডেন্টের পেছনে থাকে অনুগত কংগ্রেস এবং তাঁর দলের প্রতি সহানুভূতিশীল সুপ্রিম কোর্ট, তখন এই ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে বিদেশে আকস্মিক সামরিক হামলা, এমনকি দূরবর্তী দেশে যুদ্ধ শুরুর মতো সিদ্ধান্তও নির্বাহী ক্ষমতার জোরে নেওয়া হয়।

এমনটি কেন সম্ভব হয়—বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রে?
দেশের ভেতরে প্রেসিডেন্টের শক্তি অনেকটাই নির্ভর করে কংগ্রেসের সমর্থন এবং তাঁর দলের রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর। আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর শক্তির উৎস একটাই—যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। অন্য দেশগুলো প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না করলেও তাঁকে বিরক্ত করার ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা জানে, প্রেসিডেন্ট মানেই রাষ্ট্রশক্তির প্রতীক।

দ্বিধাবিভক্ত বিশ্ব থেকে এক মেরু বিশ্বে পরিণত হলো। ৫০ বছর আগে বিশ্ব ছিল দুই শিবিরে বিভক্ত—যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। ঠান্ডা যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ, পারমাণবিক প্রতিযোগিতা—এসব ছিল স্বাভাবিক শব্দ। এই দুই শক্তির মাঝখানে ছিল দরিদ্র দেশগুলো, যাদের বলা হতো তৃতীয় বিশ্ব। তারা শক্তিহীন হলেও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল; কারণ, তারা কোনো পক্ষের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কি বিশ্ব নিরাপদ হলো? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কি সমৃদ্ধ হলো? দুঃখজনকভাবে না। দ্বিতীয় সুপারপাওয়ারের পতনের পর দুই দশকের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বড় যুদ্ধ শুরু করে—দুটি উপসাগরীয় অঞ্চলে এবং একটি আফগানিস্তানে। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবার নতুন যুদ্ধ—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান ইরানে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চাপ প্রয়োগ থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরিণত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে। দুর্বল প্রতিপক্ষ হয়েও ইরান বিস্ময়কর প্রতিরোধ দেখিয়েছে। চার সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ চলছে, থামার কোনো লক্ষণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি রক্তক্ষরণ করছে, বিশ্ববাজার অস্থির, তেলের দাম বাড়ছে, মার্কিন অর্থনীতি নিম্নমুখী। তবু প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড়। কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ চলছে, অথচ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইতিমধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট চেয়েছেন।

আজকের বিশ্ব অনেকটাই ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতায় পরিচালিত, যেখানে বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ভঙ্গি, ভাষা ও প্রতীকী আচরণ। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন কথা বলেন, তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত মত নয়, তা রাষ্ট্রশক্তির বার্তা।
বিশ্ব তখন প্রশ্ন করে:
যুক্তরাষ্ট্র কি শক্তি প্রয়োগ করতে যাচ্ছে? জোট বদলাচ্ছে? নিষেধাজ্ঞা দেবে? নাকি পিছিয়ে আসছে?
বিদেশি সরকারগুলো প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস না করলেও তাঁর কথাকে উপেক্ষা করতে পারে না। কারণ, সামান্য সম্ভাবনাও নীতি হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণমাধ্যমের মনস্তত্ত্ব। ট্রাম্প যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ—তিনি আবেগ-উদ্দীপক ভাষা ব্যবহার করেন, ছোট বাক্য, তীক্ষ্ণ লেবেল, নাটকীয় ভঙ্গি এবং নৈতিক দ্বৈততা। তাঁর অনিশ্চয়তা সাংবাদিক, বাজার, কূটনীতিক—সবাইকে সতর্ক অবস্থায় রাখে। বাজার অনিশ্চয়তা ঘৃণা করে, কিন্তু একই সঙ্গে তাতে আসক্তও। তাই তাঁর একটি বাক্যেই শেয়ারবাজার, তেল, মুদ্রা, পণ্য—সবকিছু দুলে ওঠে।

প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্ব—দুটির মিলিত শক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আরও ক্ষমতাবান করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্সির শক্তি আসে দুটি উৎস থেকে—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্ব। যুক্তরাষ্ট্র সুপারপাওয়ার, তাই তার প্রেসিডেন্টের কথা বিশ্বকে না শুনে উপায় নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে তাঁর কথার প্রভাব কত দূর যাবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশিষ্ট্য—অনিশ্চয়তা, তীক্ষ্ণ ভাষা, নাটকীয়তা ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতি তাঁকে আরও প্রভাবশালী করে তোলে। মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করুক বা না করুক, তাঁকে উপেক্ষা করতে পারে না।

আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন হোয়াইট হাউসের একটি বাক্য বাজার কাঁপাতে পারে, জোট বদলে দিতে পারে, এমনকি যুদ্ধও শুরু করতে পারে। বিশ্ব শোনে—চাই বা না চাই—কারণ, শোনা ছাড়া উপায় নেই। এটাই আমাদের সময়ের কঠিন বাস্তবতা।

  • জিয়াউদ্দিন চৌধুরী সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও লেখক