৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়।
৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়।

মতামত

সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই

গোটা পৃথিবীতে সুন্দরবন আর নেই। এই সুন্দরবন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো বাদাবনে আজ বাঘও বেঁচে নেই। তাই বাদাবনের এই বাঘ দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের কাছে সব সময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁরা সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা করেন। এই বাঘ তুখোড় সাঁতারু, প্রতিদিন ছোট-বড় কয়েকটি নদী পাড়ি দিতে হয় শিকার-প্রাণী কিংবা সঙ্গীর খোঁজে। অন্যান্য বাংলা বাঘের চেয়ে এরা আকারে খানিকটা ছোট। আর সবচেয়ে কম শিকার-প্রাণীর বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এই বাঘ এখনো টিকে আছে। ফলে এই বাদাবন আর অনন্য বৈশিষ্ট্যের বাঘ রক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্যের পাশাপাশি দেশের আপামর জনগণের ভূমিকা অপরিহার্য।

অতীতে আমাদের দেশের অধিকাংশ বনাঞ্চলে বাঘ ছিল। আমরা আমাদের শালবনের বাঘ হারিয়েছি গত শতকের গোড়ার দিকে, পাহাড়ি বনের বাঘও নির্বংশ হলো আমাদের চোখের সামনে। আজ শুধু সুন্দরবনের কাদাপানিতে কোনোরকমে বাংলার সর্বশেষ বাঘের এক খণ্ডাংশ পপুলেশন টিকে আছে। সুন্দরবনের মতো জলার বনে টিকে থাকা বাঘ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে—মানুষের সঙ্গে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে।

মাত্র দুটি শিকার-প্রাণীর ওপর তাদের নির্ভরশীলতা এই বাঘের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে সারাক্ষণ। প্রধান শিকার-প্রাণী চিত্রা হরিণ বাঘের খাবারের ৭৯ শতাংশ জোগান দেয়। অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দরবন থেকে চিত্রা হরিণ শিকার করে। সুন্দরবনের আশপাশের জেলার বাইরেও হরিণের মাংস পাচার হয়। সমাজে মুখোশধারী কিছু লোভী মানুষ এই মাংসের জন্য লালায়িত থাকে সব সময়। এরা সুন্দরবনের হরিণের নিয়মিত ভোক্তা।

সুন্দরবন বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ২০১০-১৫ সময়েও সুন্দরবনের ওপর এমন সংকট নেমে এসেছিল। ওই সময় চোরা শিকারি ও বনদস্যুরা সুন্দরবনের ওপর জেঁকে বসে। হরিণের পাশাপাশি বাঘ শিকারের এক মহোৎসবে নেমে পড়ে বনদস্যু ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা চোরা শিকারিরা। বনজীবীরাও চরম নিপীড়নের মধ্যে পড়ে। ওই সময় অনেক চোরাকারবারি বাঘের চামড়াসহ ধরা পড়ে। এসব বিপর্যয়ের প্রতিফলন পরবর্তী সময়ে আমরা বাঘ জরিপের ফলাফলে দেখতে পাই।

সুন্দরবন ও বাঘের এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দ্রুত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, সুন্দরবনকে অতিসত্বর দস্যুমুক্ত করতে হবে। এটি করতে হলে বন বিভাগের পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

জুলাই বিপ্লবের পর সুন্দরবনের ওপর আবারও নেমে এসেছে তেমন এক বিপর্যয়। অতীতে আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবার সুন্দরবনে ফিরে এসেছে, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বনদস্যু। নিরীহ বনজীবীদের জিম্মি করে অত্যাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি নিজেরাও বাঘ-হরিণ শিকারে জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ওত পেতে থাকা চোরা শিকারিরা হামলে পড়েছে সুন্দরবনে। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত অসংখ্য হরিণের ফাঁদ উদ্ধার হতে দেখছি। সম্প্রতি সেই ফাঁদে আহত বাঘ উদ্ধারের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এমন নির্মম ঘটনা আমাদের অজান্তে নিশ্চয় আরও ঘটছে।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। অন্যদিকে বাঘ আমাদের গৌরবের প্রতীক, আমাদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এ ছাড়া এই দুই বিরল প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক। ফলে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার।

রাষ্ট্র বন বিভাগের ওপর এদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে মাত্র। কিন্তু বন বিভাগের রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা, আছে জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি। বিপরীতে সুন্দরবনের ওপর জীবিকার জন্য আছে স্থানীয় মানুষের তীব্র চাপ। ফলে সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের সবাইকে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি প্রত্যেকের অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

সুন্দরবন ও বাঘের এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দ্রুত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, সুন্দরবনকে অতিসত্বর দস্যুমুক্ত করতে হবে। এটি করতে হলে বন বিভাগের পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবন থেকে বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, হরিণশিকারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সুন্দরবনে নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে। সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চোরা শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী জেলেদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।

  • এম এ আজিজ অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়