
বাংলাদেশের জন্মলগ্নে যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাঁরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের সেই ভয়াল দিনগুলোয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে স্বাধীনতার লড়াই শুরু করেছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের অনেকের হাতে প্রশিক্ষণ ছিল না, ছিল না আধুনিক অস্ত্র। ছিল শুধু বুকভরা সাহস আর একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। সেই সাহসকেই একমাত্র অস্ত্র করে তাঁরা যুদ্ধে নেমেছিলেন। মানিক পশারী ছিলেন এমন মুক্তিযোদ্ধাদেরই একজন।
৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ আর অগণিত মানুষের সীমাহীন কষ্টের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। এই দেশের পতাকা, মানচিত্র, আমাদের আত্মপরিচয়, সবকিছুর পেছনে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাম, রক্ত আর তাঁদের শহীদ সহযোদ্ধাদের আত্মদান।
অথচ সেই মানিক পশারীকে শেষযাত্রায় যে অসম্মানের মুখোমুখি হতে হলো, তা খুবই লজ্জাজনক। একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে ছবি আমরা দেখলাম, তা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই ২৪ অক্টোবর তিনি মারা যান। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে গার্ড অব অনারের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীদের বাধায় তা হতে পারেনি। পরে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে গার্ড অব অনার দেওয়ার কাজটি সারা হয়। প্রতিবেদন বলছে, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে প্রায় ১৫ ঘণ্টা তাঁর দাফন আটকে থাকে। শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতে, পুলিশ পাহারায়, রাতের আঁধারে তাঁকে কবর দিতে হয় (প্রথম আলো, ২৫ অক্টোবর ২০২৬)।
মানিক পশারীর কবর খুঁড়তে তাঁর মেয়ে ও বোনদের বাধ্য হওয়ার দায় আমাদের নিজেদের কাঁধেও পড়ে। একটি সমাজ কতটা সুস্থ, তা বোঝা যায় সে তার দুর্বল ও প্রয়াত মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখে। মানিক পশারীর ঘটনা আমাদের সেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে, আর সেই আয়নায় যে ছবি ফুটে উঠছে, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
আমাদের সমাজে সাধারণত কবর খোঁড়ার কাজ করেন পুরুষেরা, বিশেষ করে প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়স্বজন। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিষয়টি হলো, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁড়তে হয়েছে তাঁর মেয়ে ও বোনকে। বাংলাদেশের সমাজে এমন দৃশ্য বিরল।
একবার দৃশ্যটি ভাবুন। একজন মানুষ, যিনি একদিন এই দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁর নিথর দেহ পড়ে আছে, অথচ পাড়া-প্রতিবেশী কেউ জানাজা-দাফনে এগিয়ে আসছেন না। কী অদ্ভুত প্রতিদান আমরা মানিক পশারীকে দিলাম!
খবর বলছে, মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সাক্ষী ছিলেন। এই সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য এখন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী । ফলে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর প্রতি যেভাবে প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখিয়েছেন, তাকে স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
এই ঘটনা আমাদের বেশ কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যে রাষ্ট্র একজন মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মান জানায়, সেই রাষ্ট্র কেন তাঁর মর্যাদাপূর্ণ দাফন নিশ্চিত করতে ১৫ ঘণ্টা সময় নিল? কেন দিনের আলোয় নয়, রাতের আঁধারে লুকিয়ে কবর দিতে হলো? একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কি মুক্তিযুদ্ধ করে অপরাধ করেছেন যে তাঁকে লোকচক্ষুর আড়ালে কবর দিতে হবে? পুলিশ পাহারা ছাড়া যদি একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফনই সম্ভব না হয়, তাহলে এই দেশ যে মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা-ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, গণতন্ত্রে তা স্বাভাবিক। কিন্তু মৃত্যুর পরও কি বিরোধ থামবে না? একজন মানুষের কবর দেওয়া নিয়েও কি রাজনীতি করতে হবে? মৃত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁর দাফনে বাধা না দেওয়া, এগুলো তো আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা।
তাহলে যাঁরা কথায় কথায় ধর্মের কথা বলেন, রাজনীতির মাঠে ধর্মকে টেনে আনেন, সেই দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা কোথায়?
একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা যে অপরাধ করেছিলেন, সেই অপরাধে তাঁদের অনেকের বিচার ও শাস্তি হয়েছে। এই বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়কে ঘিরে দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা যে অবস্থান নিলেন, তাতে প্রশ্ন জাগে, দলটি কি আজও একাত্তরের বিরোধী অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে?
এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের নেতা-কর্মীদের একটি অংশও পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকারই বয়ে বেড়াচ্ছেন, অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত নন। যাঁদের বিরুদ্ধে এই বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের দলের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উচিত ছিল বিষয়টি স্পষ্ট করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই একাত্তরের কলঙ্কিত অবস্থান থেকে নিজেদের সংশোধন করত, তাহলে আজ মানিক পশারীর জানাজায় নিজেরাই শরিক হতে পারত। কিন্তু সেই পরিচয় তারা দিতে পারেনি। বরং এমন আচরণ দলটির পুরোনো ক্ষতকেই আবার সামনে আনছে, আর তাতে শেষ পর্যন্ত দলটি নিজেরই ক্ষতি করছে।
মানিক পশারীর কবর খুঁড়তে তাঁর মেয়ে ও বোনদের বাধ্য হওয়ার দায় আমাদের নিজেদের কাঁধেও পড়ে। একটি সমাজ কতটা সুস্থ, তা বোঝা যায় সে তার দুর্বল ও প্রয়াত মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখে। মানিক পশারীর ঘটনা আমাদের সেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে, আর সেই আয়নায় যে ছবি ফুটে উঠছে, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে এসে আমরা উন্নয়নের কথা বলি, অগ্রগতির কথা বলি। কিন্তু যে চেতনার ওপর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, সেই চেতনার ধারকদের যদি শেষবিদায়ে এমন অবমাননা সইতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের ভিত কতটা মজবুত, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। মুক্তিযোদ্ধারা আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ, প্রতিদিন তাঁদের সংখ্যা কমছে। আর কিছু বছর পর হয়তো একজন জীবিত মুক্তিযোদ্ধাও থাকবেন না। তাঁরা চলে যাওয়ার আগে অন্তত এটুকু নিশ্চয়তা কি আমরা দিতে পারি না যে মৃত্যুর পর তাঁরা নিজের মাটিতে সম্মানের সঙ্গে শায়িত হতে পারবেন?
কবরে আগুন দেওয়া, কবর থেকে লাশ তুলে ফেলা কিংবা কাউকে কবর দিতে না দেওয়া যে সমাজে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, সেই সমাজ টিকিয়ে রাখা কঠিন। এমন অমানবিক রাষ্ট্র নিশ্চয়ই আমরা কেউ চাই না।
মুক্তিযুদ্ধে মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে? যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কবর দিতে পুলিশ পাহারা লাগে, যেখানে তাঁর মেয়েকে নিজ হাতে বাবার কবর খুঁড়তে হয়, সেটি কি সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকে খুঁজতে হবে, বিশেষ করে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোকে। নইলে ইতিহাস একদিন আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।
ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ই-মেইল: nadim.ru@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব