
মেলা মানে হাজার মানুষের ভিড়। এই ভিড় ঠেলে মতিচুরের লাড্ডু খেতে খেতে স্কুলশিক্ষক ফারুক হোসেন কাছে এসে বললেন, ‘জীবনে এত সুস্বাদু লাড্ডু খাইনি ভাই। আর জিলাপি তো মনে হচ্ছে, তাকাইয়ে আছে।’ তাঁর কথামতো কেনা হলো লাড্ডু আর জিলাপি। হাজার হোক মেলার মিষ্টি!
মেলার বৈশিষ্ট্যই তো হচ্ছে, পুরোনো জিনিসকে নতুন করে দেখানো। তাই বলে কি মেলায় কৃষকের বিয়ের কথা উঠতে পারে? নিশ্চয় পারে। এ রকম একটি বৈশাখী মেলা বসেছিল রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পীরগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। গ্রামের সব মানুষ চাঁদা দিয়ে প্রতিবছর এ মেলার আয়োজন করেন। মেলার অন্যতম আকর্ষণ থাকে লাঠিখেলা, বৈশাখী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এবার তিন দিনের মেলার প্রথম দিনে—পয়লা বৈশাখে ছিল লাঠিখেলা। দ্বিতীয় দিনে বৈশাখী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর তৃতীয় দিনে ছিল বাউলগান। মেলার মানুষের ভিড় দেখে মনে হলো অনেক দিন তাদের কোনো এক ঘরের ভেতরে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। সুযোগ পেয়ে তারা দরজা ভেঙে বের হয়ে এসেছেন। একেই বলে মানুষের ঢল।
চুয়াডাঙ্গা থেকে এসেছিলেন বাউলশিল্পী আলামিন দেওয়ান আর নাটোরের বড়াইগ্রামের শম্পা রানি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য কুষ্টিয়া থেকে এসেছিলেন তানিয়া বাউল, সালমা সারগাম, রাজশাহীর সেজুতি ও সোনিয়া এবং বগুড়ার অমৃতা দাস ও সমৃতা দাস।
এখনো দেশের কৃষকের মান এই পর্যায়ে আসেনি যে একজন উচ্চশিক্ষিত মেয়েকে তার বাবা বিয়ের জন্য কৃষককে পছন্দ করবেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট বা বড় চাকরিজীবীরাই সেই তালাকায় থাকবেন। তাঁরা ছোঁ মেরে গ্রামের ভালো মেয়েটিকে বউ করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। এ সময় দর্শকেরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাঁকে সমর্থন জানান।
কৃষকের বিয়ের কথা কথা উঠল বৈশাখী আলোচনার দিনে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদের। কিন্তু সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার কারণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি।
প্রধান আলোচক ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য ফরিদ খান। তিনি বিগত সরকারের আমলে দেশের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে একাই প্রতিবাদী পদযাত্রা করে সারা দেশে আলোচিত হয়েছিলেন। তিনি বৈশাখী মেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করলেন।
রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মোছা. মেহেরুন্নেছা, সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর দৌহিত্র কবি আজাদ খাঁসহ স্থানীয় আলোচকেরা কথা বললেন। মজার ব্যাপার এই মেলার হাজারো মানুষ আলোচনার সময় চুপচাপ মঞ্চের চারদিকে বসে যান। ডান পাশটা দখল করে বসেন এলাকার নারীরা।
শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য আনসার বা পুলিশের দরকার পড়ে না। সবকিছু সামলান মেলা কমিটি। মেলার দ্বিতীয় দিনে ছিল ভীষণ গরম। মেয়েরা সবাই বাড়ি থেকে হাতপাখা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা অনবরত হাতপাখা নাড়ছিলেন। সে এক ছবির মতো দৃশ্য।
আলোচনা সভার একজন আলোচক ছিলেন কৃষক মনিরুজ্জামান। তাঁর বাড়ি রাজশাহী নগরের মহিষবাথান এলাকায়। তিনি পড়াশোনা করে কোনো দিন চাকরির জন্য আবেদন করেননি। কৃষিকাজ শুরু করেন। তা–ও নিজের জমি নেই। এই পর্যন্ত শুনে হয়তো পাঠকের মনে হতে পারে—নিজের জমি নেই, তিনি আবার কেমন কৃষক। আসলেই তা–ই।
রাজশাহী শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার পশ্চিমে গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামের স্থানীয় কৃষকদের জমি ইজারা নিয়ে তিনি কৃষিকাজ শুরু করেন। ওই এলাকায় আগে বৃষ্টিনির্ভর একটা আমন ধান ছাড়া আর কোনো ফসল হতো না। এখন ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে ধান চাষ হয়। তবে এক কেজি বোরো ধান উৎপাদন করতে প্রায় তিন হাজার লিটার পানি তুলতে হয়। মনিরুজ্জামান ওই গ্রামে পানি সাশ্রয়ী এবং হাই ভ্যালু ক্রপস (উচ্চ মূল্যের ফসল) চাষ শুরু করেন। তাঁকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল মেলার কৃষকদের নতুন ফসলের গল্প শোনানোর জন্য।
তিনি এই গল্প শোনাতে শোনাতে বললেন, এখনো দেশের কৃষকের মান এই পর্যায়ে আসেনি যে একজন উচ্চশিক্ষিত মেয়েকে তার বাবা বিয়ের জন্য কৃষককে পছন্দ করবেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট বা বড় চাকরিজীবীরাই সেই তালাকায় থাকবেন। তাঁরা ছোঁ মেরে গ্রামের ভালো মেয়েটিকে বউ করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। এ সময় দর্শকেরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাঁকে সমর্থন জানান।
মনিরুজ্জামান বলেন, তা–ই যদি হয়, তাহলে দেশের শিক্ষিত যুবকেরা কেন কৃষিকাজ করবেন? কৃষিপ্রধান দেশে বাংলাদেশের উন্নতি হবে কী করে? আমাদের কৃষিকাজকে সেই মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য আমাদের কৃষকদের শিক্ষিত হতে হবে। উন্নত চাষাবাদের জ্ঞানার্জন করতে হবে। তাহলে তাদের আর চাকরি নামের সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে হবে না। একজন কৃষক যদি কোটি টাকার গাড়িতে চড়েন, তখন চাকরি আর কৃষিতে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। তখনই বাইরের দেশের মতো একজন নারী ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার কৃষককে বিয়ে করতে আগ্রহী হবেন। অস্ট্রেলিয়ার কৃষকেরা যেমন বিত্তবান। তাঁরা জীবনসঙ্গীর জন্য বিজ্ঞাপন দেন। আবেদন করেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার সবাই।
দর্শকদের অনেকেই মনিরুজ্জামানের কাছ থেকে আঙুর চাষের পদ্ধতি জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। মনিরুজ্জামান ১০০ চাষিকে উপহার হিসেবে ১০০টি আঙুরের চারা দেওয়ার ঘোষণা দেন। খুশি হয়ে দর্শকেরা তাঁকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। এমনই ছিল বৈশাখী মেলার আলোচনা। সেখানে গোদাগাড়ীর ঈশ্বরীপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকারও আমন্ত্রিত ছিলেন। তিনি এলাকার কৃষকদের ঝড়বৃষ্টির খবর আগেই জানিয়ে দেন। ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে পাকা ধান এক দিন আগে কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেন অথবা বৃষ্টির খবর থাকলে অনর্থক সেচটা না দেওয়ার পরামর্শ দেন।
প্রথম আলোতে এই খবর পড়ে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ তাঁকে একটি অভিনন্দনপত্র পাঠিয়েছিলেন। দুদকের চেয়ারম্যানে চিঠির খাম হাতে নিয়েই অতনু সরকার ভয়ে প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে খাম খুলে দেখেন, সেটা অভিনন্দনপত্র।
সেই অভিনন্দনপত্র দর্শকদের উদ্দেশে পাঠ করে শোনান রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী ঔড়ব আজাদ। দর্শকেরা আগ্রহভরে সেই চিঠি শোনেন। সেই চিঠিতে খনার বচনের উদ্ধৃতি ছিল, ‘কোদাল কুড়ুলে মেঘের গাঁ, মাঝে মাঝে দিচ্ছে বা, কৃষককে বলোগে বাঁধতে আল, আজ হবে না, হবে কাল।’ মেলা থেকে ফিরতে ফিরতে খনার সেই বচনের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে থাকি, আমাদের কৃষকের ভাগ্য আজ না হোক, কাল বদলাবে।
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী