মতামত

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, জামায়াতের বিষয়ে কী অবস্থান?

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস বেশ পুরোনো। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিককালে আওয়ামী লীগ, তার পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীও নিষিদ্ধ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দলগুলো রাজনীতিতে ফিরে আসে। চব্বিশের আন্দোলনে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াতে ইসলামী ও তাঁদের ছাত্রসংগঠনকে ‘নিষিদ্ধ ঘোষণা’ করা হয়।

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যে নোংরামিটা করে গিয়েছিল, তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক দিন। তাদের অপশাসনের পতনের পর জামায়াতে ইসলামীর ‘নিষেধাজ্ঞা’ আদালত থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস পর কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশের প্রাচীন ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির বিরুদ্ধে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচারের আগ পর্যন্ত দলটির কার্যক্রমে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিচার শুরু করে, নির্বাচন কমিশন থেকে দলটির নিবন্ধন স্থগিত করার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ে।

এই যখন অবস্থা, তখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। খোদ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল।

কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘নির্বাহী’ আদেশে রাজনৈতিক দলটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পর দেশে কার্যত আওয়ামী লীগ নিষ্প্রভ হয়ে যায়। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করলেও দলটি এই নিষ্প্রভতা থেকে কতটা বের হতে পারত তা বলা মুশকিল, তবে গণতান্ত্রিক চর্চায় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ থাকা কোনো গণতন্ত্রমনা নাগরিক প্রত্যাশা করতে পারে না। যদিও বিগত আওয়ামী শাসনের সময় এ দেশের গণতন্ত্রচর্চা বড় ধরনের বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের কাছে অনেকেই প্রত্যাশা করেছিল, এই সরকার অন্তত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রম ও পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে প্রগতির ধারার গণতান্ত্রিক চর্চার পথ উন্মুক্ত করবেন। চব্বিশের আন্দোলনে দেশের রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তাকে পূর্ণতা প্রদান করবে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ নেওয়ার পর জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা নানা অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে পাস করার পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হওয়া কয়েকটি অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘সতর্কতা’ অবলম্বনের স্বার্থে সরে এলে দেশজুড়ে যখন আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় চলছে, বিরোধী দলের সংসদ বহির্গমন হরহামেশা ঘটছে। বিরোধী শিবিরে গুঞ্জন চলছে, বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগকে ফেরানোর পাঁয়তারা করছে।

দেখা যাচ্ছে, সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিলটি সংসদে পাশ হওয়ার পরদিনই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সংশোধনে বিলও পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামী পার্টির নাম বহাল রাখা হয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিলটি পাশ করার মধ্য দিয়ে সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশটি বিল আকারে পাস করিয়ে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা কণ্টকময় করে তোলা হলো।

এই বিলটি উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, বিলটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে সন্ত্রাসীবিরোধী আইন ছিল, তা সংশোধনের জন্য। বিরোধীদলীয় নেতার নিশ্চয় স্মরণ থাকার কথা, তাঁরা এবং এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটি আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মোটামুটি বাংলাদেশে একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধনটাও স্থগিত হয়ে আছে। এই আইনের অনুবলে পরবর্তী সময়ে ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টেও পরিবর্তন এনে সংগঠনের বিচারে বিধান যুক্ত করে সেই আইনটাও সংশোধন করা হয়েছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুসারে তাকে গণহত্যা বলা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই, এই গণহত্যার দায়ে সত্তা হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ‘নিষিদ্ধের’ কাতারে পড়ে, তাহলে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে নারকীয় হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রমকেও নিষিদ্ধের কাতারে ফেলতে হবে। একই আইনের বলে জামায়াতে ইসলামীকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘দল’ হিসেবে ‘গণহত্যার’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করার বিষয়ে কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, তাহলে সেটি কি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?

কারণ দেখা যাচ্ছে, এই সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিলটি সংসদে পাশ হওয়ার পরদিনই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সংশোধনে বিলও পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামী পার্টির নাম বহাল রাখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের অপশাসন নিয়ে দেশের সিংহভাগ মানুষের ভেতর অসন্তোষ রয়েছে। তাদের ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনব্যবস্থার কারণে তারা আজ দেশছাড়া, তবে এ দেশের একটি অংশ তো দলটির সমর্থক আছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীরা সেই দলটির ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নানা অভয় ও ভোট চেয়ে এসেছেন। দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ তো ভোটও দিয়েছে। বাকি যারা দেয়নি এদের মধ্যে একটি অংশ তো আওয়ামী লীগের সমর্থকগোষ্ঠী ছিল বলে ধারণা করা যায়।

দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের ‘কর্তৃত্ববাদী’ আচরণের কারণে দলটিকে যাঁরা এখনো পছন্দ করেন, যাঁরা আওয়ামী লীগের শুদ্ধীকরণ চান, তাঁদের মতাদর্শকে আপনি কীভাবে উপেক্ষা করতে পারেন? দলটির প্রতি যাঁদের ভালোবাসা রয়েছে, যাঁরা দীর্ঘদিন তৃণমূল পর্যায়ে নিখাদ রাজনীতি করে এসেছেন, তাঁদের আদৌ কি রাজনীতির বাইরে রাখা সম্ভব?

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নানা অস্ত্রের ব্যবহার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, পত্রপত্রিকা আর নাগরিক সমাজের পরামর্শ উপেক্ষা করে কর্তৃত্ববাদী হওয়াকে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু এই সরকারও যদি ‘রাজনৈতিক দলকে’ নিষিদ্ধ করার পক্ষে নিজেদের পথচলাকে পোক্ত করে, তাহলে সেটি হবে দুর্ভাগ্যজনক।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে নানা সময়ে বলে এসেছে, তারা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে নয়, বিশেষ করে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর যদি আইন পাস করে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে, তাহলে সেটা হবে হতাশাজনক। এই নিষিদ্ধের ঘেরাটোপে ক্ষমতাসীনরাও একদিন নিজেদের সেই পোডিয়ামে দাঁড়াবে কি না, তা কেউ কি বলতে পারে?

আমরা চাই, চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রকৃত হত্যাকারীদের তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তি হোক। পাশাপাশি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে আওয়ামী লীগও যদি নিজেদের সংশোধন না করে, তাহলে এই দলটি ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ার মধ্যে দিয়ে নয়, নিজেরাই ‘আত্মহত্যা’ করবে। আমরা চাই, সবাই গণতান্ত্রিক উদার রাজনৈতিক চর্চায় ফিরুক। জনগণকে দায়িত্ব নিতে দিন, তারা দলটিকে কীভাবে নিষিদ্ধ করতে চায়। এভাবে ক্ষমতার শক্তিমত্তা দেখিয়ে নিষিদ্ধ নয়, বরং ভোটের ময়দানকে বেছে নিন কোন দল থাকবে আর কোন দল বিলীন হয়ে যাবে।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: nadim.ru@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব