ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত মিসরের ‘ইয়াঙ্গার মেমনন’ নামের গ্রানাইটের ভাস্কর্য
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত মিসরের ‘ইয়াঙ্গার মেমনন’ নামের গ্রানাইটের ভাস্কর্য

মতামত

ব্রিটিশ মিউজিয়াম কেন ‘প্যালেস্টাইন’ মুছে ফেলতে চায়

ইসরায়েলপন্থী আন্দোলনকর্মীদের চাপের মুখে ব্রিটিশ মিউজিয়াম তাদের কিছু সংগ্রহের লেবেল থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই খবরে অনেক পর্যবেক্ষক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকে মোটেও বিস্মিত হননি দুটি কারণে এবং এর মধ্যে আমিও একজন।

প্রথম কারণটি পরিস্থিতিগত। ইউকে লইয়ার্স ফর ইসরায়েল (ইউকেএলএফআই) নামের সংগঠনটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে আমার নিজের প্রতিষ্ঠান ওপেন ইউনিভার্সিটির কাছেও একই ধরনের দাবি তুলেছিল। তারা বলেছিল, আমাদের পাঠ্যসামগ্রী থেকে ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দবন্ধটি মুছে ফেলতে হবে।

আমার অবাক না হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো আমি জাদুঘরগুলোকে ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি। তাই দখলের শিকার জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে দখলদারের অবস্থান আমাকে বিস্মিত করে না।

ইউরোপের অধিকাংশ জাতীয় জাদুঘরের মতো ব্রিটিশ মিউজিয়াম একটি সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান। এটি ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর ভৌত উপস্থিতি ও সংগ্রহ—কোনোটিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছাড়া কল্পনা করা যায় না।

এই জাদুঘরে এমন সব বস্তু রয়েছে, যা উপনিবেশের শিকার জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে লুট করা হয়েছে। সেই জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর অত্যাচার করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের ইতিহাস চুরি করে মুছে ফেলা হয়েছে। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ব্রিটিশ মিউজিয়াম সৃষ্টি করেছিল, আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ইসরায়েলকেও সেই একই সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছে।

জাতিসংঘসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা বলেছে, যেসব উপনিবেশবাদী শক্তি ইসরায়েলকে গড়ে তুলেছিল, ইসরায়েল নিজেই এখন তাদের মতো একটি ঔপনিবেশিক দখলদার রাষ্ট্র। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ সব সময়ই ইতিহাসকে কাটাছেঁড়া করে নতুনভাবে লেখার চেষ্টা করেছে।

যখন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী সিসিল রোডস জিম্বাবুয়ে (যার নাম তিনি রাখেন রোডেশিয়া) দখল করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি প্রাচীন শহর গ্রেট জিম্বাবুয়েতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি দল পাঠিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেখান থেকে এমন প্রমাণ নিয়ে ফিরবেন, যাতে বলা যায় গ্রেট জিম্বাবুয়ে আসলে প্রাচীন আফ্রিকানরা বানাননি, বানিয়েছেন ফিনিশীয়রা। এভাবে ব্রিটিশরা দেখাতে চাইতেন ইউরোপীয়দের উপস্থিতি সেখানে নতুন কিছু নয়, আগেও সেখানে ইউরোপীয়রা ছিলেন।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেমন ইতিহাস পুনর্লিখন জরুরি ছিল, তেমনি ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক প্রকল্পের জন্যও সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিজেদের দখলদারত্বকে বৈধতা দিতে হলে ইসরায়েলের এমন একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, যা বাস্তবে খুব বেশি পুরোনো নয়। প্রাচীন ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সত্তা নিজেকে চিরকালীন অস্তিত্বশীল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।

আসলে প্রাচীন ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া নানারূপে ঘটছে। ফিলিস্তিনের ভেতরেই ইসরায়েল প্রাচীন স্থাপনাগুলো ধ্বংস ও দখলের একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনের বাইরে ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ও জাদুঘরের মতো ইতিহাস নিয়ে কাজ করে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা তাদের পরিভাষা পরিবর্তন করছে এবং ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দবন্ধটি সম্পূর্ণভাবে নথি থেকে মুছে দিচ্ছে। এই মুছে ফেলাটা ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর মাধ্যমে তাদের অতীত ও বর্তমান—দুটিকেই নিশানা করা হয়।

অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেমন ইতিহাস পুনর্লিখন জরুরি ছিল, তেমনি ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক প্রকল্পের জন্যও সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিজেদের দখলদারত্বকে বৈধতা দিতে হলে ইসরায়েলের এমন একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, যা বাস্তবে খুব বেশি পুরোনো নয়। প্রাচীন ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সত্তা নিজেকে চিরকালীন অস্তিত্বশীল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।

পেছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, একেবারে গোড়ার দিকের জায়নবাদের সঙ্গে প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহের একটি সম্পর্ক ছিল।

১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিসর ও সিরিয়ায় তার ঔপনিবেশিক অভিযানের সম্প্রসারণ হিসেবে ফিলিস্তিনে আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর সেনারা আক্কা (ফিলিস্তিনের একটি প্রাচীন শহর, যা বর্তমানে ইসরায়েলে অবস্থিত) দখল করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। তখন তিনি এমন একটি ধারণা দেন, যার মধ্যমে তিনি শক্তিশালী মিত্র জুটবে বলে আশা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিনকে কি একটি ইহুদি রাষ্ট্রে রূপান্তর করা যায়?

নেপোলিয়ানের পরিকল্পনা সফল হয়নি; কিন্তু তাঁর ধারণাটি বিলুপ্ত হয়নি। এক শতাব্দী পরে ১৮৯৯ সালের জুন মাসে নিউইয়র্ক টাইমস বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত জায়নবাদীদের এক সম্মেলনের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে তারা ‘ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপন’ করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল।

ফিলিস্তিন, মিসর ও সিরিয়ায় নেপোলিয়ানের আক্রমণ প্রাচীন বিশ্বের গবেষকদের কাছে আরেকটি কারণেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর আক্রমণ শুধু সামরিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ছিল না। তিনি সেনাদের সঙ্গে ১০০ জনের বেশি শিক্ষাবিদ নিয়েছিলেন। এসব শিক্ষাবিদ পরে মিসরতত্ত্ব (ইজিপ্টোলজি)-এর প্রথম পেশাদার বইগুলো লিখেছেন।

এ থেকেই বোঝা যায়, জাদুঘর, ইতিহাস ও প্রাচীন বিশ্বের গবেষণা সবই ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের প্রভাব এবং শক্তিশালী আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

সম্প্রতি আমেরিকায় জর্জ ফ্লয়েড হত্যার অব্যবহিত পরপরই ‘ডিকলোনাইজ দ্য কারিকুলাম’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে বহু জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিজেদের উপনিবেশমুক্ত দেখাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মে না হোক, অন্তত কথায় এই উপনিবেশমুক্তির আহ্বানে সাড়া দিতে চেয়েছিল, এখন তারাই টার্গেটে পড়ে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনের ইতিহাস মুছে ফেলার প্রকল্পে সহায়ক বানানোর চেষ্টা আমাদের উপনিবেশমুক্তি আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

তবে এই জায়নবাদী গোষ্ঠীর বক্তব্যকে সরলভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। তারা ভয় দেখিয়ে যে স্বীকারোক্তি আদায় করে, সেটিকে বড় করে দেখায়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাম্প্রতিক বিবৃতিও কিছুটা এ ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিন্তু তারা ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দ ব্যবহারের যৌক্তিকতা বা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের ইতিহাস পুনর্লিখনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু বলেনি।

গ্যালারির লেবেল বা শিক্ষাসামগ্রী থেকে ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দটি সরানো ইতিহাসের সঠিকতার জন্য নয়। এটি প্রাচীন যুগে এই অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে সঠিক নাম।

  • মারচেলা ওয়ার্ড ওপেন ইউনিভার্সিটির ক্লাসিক্যাল স্টাডিজের প্রভাষক

    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ