
বর্তমান সরকারের আমলে মার্চের অগ্নিঝরা ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা নিয়ে লিখেছেন সৌমিত জয়দ্বীপ
ইংরেজি ভাষার কিংবদন্তি কবি টি এস ইলিয়ট তাঁর জগদ্বিখ্যাত দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড কাব্যগ্রন্থের একদম প্রথম চরণেই লিখেছিলেন ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’। আমাদের ইতিহাসে এমন ‘নিষ্ঠুরতম মাস’ কম আসেনি, কিন্তু সব ছাপিয়ে মহিরুহ হয়ে আছে মার্চ। আমাদের রোমহর্ষ রাজনৈতিক ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী এই মার্চ মাস। ভালোবেসে আমরা তার নাম দিয়েছি ‘অগ্নিঝরা মার্চ’!
মার্চ মানেই উত্তাল জনসমুদ্র, স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম পতাকা উত্তোলন আর স্বাধীনতার ইশতেহার। মার্চ মানেই অনলবর্ষী কণ্ঠ আর তেজস্বী তর্জনী উঁচিয়ে উচ্চারিত ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। মার্চ মানেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’। মার্চ মানেই পঁচিশের রাতে নৃশংস গণহত্যায় ভারাক্রান্ত জনপদ আর ছাব্বিশের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার আস্বাদ। মার্চ মানেই সাতাশের স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে একজন বিদ্রোহী মেজরের কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। মার্চ মানেই ‘উই রিভোল্ট’।
আমাদের মার্চ, সেই অগ্নিঝরা মার্চের ৫৫ বছর হলো। আমাদের ৯ মাসের অসামান্য প্রতিরোধ প্রত্যয়ী মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুরু এই মাস থেকে। মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতার মাস। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা, সে আমার—স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন’। বেদনার বিষয় হলো, আমরা আমাদের সেই স্বজনের ‘জন–ইতিহাস’ ভুলে গেছি, কিংবা তৈরিই করতে চাইনি কখনো।
যে রাজনৈতিক সংগ্রাম আমাদের এই স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, সেই রাজনীতিরই বলি হতে হয়েছে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত সময়কে; অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধকে। রাজনৈতিক বাইনারির পাশাখেলায় মত্ত আমরা অনুধাবন করিনি যে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্য বিচার করা জরুরি। যখনই এ দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, তখনই ইতিহাস পুনর্নির্মিত হয়েছে ক্ষমতাবানের ইচ্ছায়। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ এ দেশে দাঁড়ায়নি। দাঁড়ায়নি বলেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’কে নিজের বাটখারায় মাপার সুযোগ নিয়েছে হরহামেশা।
সত্য যে মহাকালের ইতিহাসে ৫৫ বছর অত্যন্ত কম সময়। কিন্তু ঘটনাকালে অনুপস্থিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সময়ের পার্থক্যটা অনেক বড়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাই রাষ্ট্রের দায় আছে। দায় আছে রাষ্ট্রের ক্রিটিক্যাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জন–ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার। নিতান্তই সামান্য এক আকাঙ্ক্ষা। আমাদের এই আকাঙ্ক্ষা কি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়?
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত ‘তারেক রহমানের সামনে “স্টেটসম্যান” হওয়ার সুযোগ এসেছে’ শিরোনামের নিবন্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফল প্রসঙ্গে লিখেছিলাম, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল বাংলাদেশের পক্ষে এটা বিএনপিকে জনগণের উপহার!...বিএনপি যতটা জিতেছে, তার চেয়ে বেশি প্রগতিপন্থী জনগণ তাকে জিতিয়েছে।’ সঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করেছিলাম, ‘আদর্শিক, গাঠনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সর্বোপরি রাজনৈতিক—কোনো দিক দিয়েই তো বাংলাদেশ ঠিক অবস্থায় নেই; না দেশে, না বিদেশে। নির্বাচনের আগে অনেক কথাই তো বলা যায়, কিন্তু সামনে যে বাধার বিন্ধ্যাচল, তা পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ তো কম নয়। কীভাবে জনগণের মেজরিটি পার্টির নেতা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবেন?’
এই লেখা তাই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সরকারের উদ্দেশে, ডানপন্থার অভূতপূর্ব উত্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের মহানুভবতা ও আদর্শ সমুন্নত রাখা ছিল যাদের প্রধানতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। অতীতে যা–ই ঘটুক, এবার জনগণের বেশির ভাগ অংশ বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয়েছে। বস্তুত, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বিএনপির ভূমিকা এতটাই ঐতিহাসিক ছিল যে দলটি মেরুদণ্ড সোজা করে সম্মুখে না দাঁড়ালে বাংলাদেশ বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কায় থাকত।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক, সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের ব্রিগেড কমান্ডার জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক বা উদার গণতন্ত্রী মনোভাবাপন্ন বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়েছে তাই এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার জনপ্রত্যাশা। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বাদ দিলে, নতুন সরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের কিছু ‘গ্লিম্পস’ ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে।
তবে আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংকট বিষয়ে আগের লেখাটিতে যা উল্লেখ করেছিলাম, তার বড় অংশজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বাহাস। এই বাহাসের প্রারম্ভ বিন্দুই হলো একাত্তরের মার্চ মাসের ইতিহাস। চর্বিতচর্বণ রেটোরিক ও বাইনারির বাইরে গিয়ে এই ইতিহাসকে কি ‘দলনিরপেক্ষ’ রাখতে পারবে সরকারি দল, তথা তাদের নেতৃত্বাধীন সরকার? আসল চ্যালেঞ্জ এখানেই। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে নতুন ধরনের রাজনীতির প্রয়োজন। বিএনপি কি পারবে এই নতুন রাজনীতির খোঁজ দিতে?
যুদ্ধ আমরা চাইনি, আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের (ইউনিভার্সেল অ্যাডাল্ট ফ্র্যাঞ্চাইজি) ভিত্তিতে মাত্র একটা জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল পাকিস্তানে। হ্যাঁ, মাত্র একটা নির্বাচন! এর চেয়ে বড় অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিদর্শন আর কী হতে পারে! সেই নির্বাচনেও জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। কারণ, দলটি ছিল পূর্ব বাংলাকেন্দ্রিক।
পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ভ্রান্তি ও ভূত আরও আগেই মরে যাওয়া উচিত ছিল। অন্তত ১৯৫৪ সালে মাত্র আড়াই মাসের মাথায় পূর্ববঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার পরপরই। কিন্তু মরল সত্তরের ডিসেম্বরের নির্বাচনে এসে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বিখ্যাত ভাষণে এই ২৩ বছরের এক জলজ্যান্ত ইতিহাস তুলে ধরেছিলেন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ ২৩-২৪ বছরের রাজনৈতিক, তথা স্বাধীনতাসংগ্রামের পথ বেয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সব নির্যাস ওই ভাষণে উপস্থিত ছিল।
স্বাধীনতা না স্বাধিকার—এ নিয়ে তখন তর্কও চলছিল। বিশেষত, তরুণদের মধ্যে। ২ মার্চ ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগের সমাবেশে শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছেন। সে ঘোষণায় ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত উল্লেখ করা হয়েছে; অর্থাৎ দেশ স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও ৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না শেখ মুজিবুর রহমান।
এ প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর প্রতিনায়ক: সিরাজুল আলম খান গ্রন্থে শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ভাষ্য উদ্ধৃত করেছেন (পৃষ্ঠা ১৯০-১৯১): ‘আওয়ামী লীগের তরুণেরা, যেমন সিরাজুল আলম খান, যিনি কাপালিক নামে পরিচিত, এখনই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পুরোদস্তুর মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পক্ষে ছিলেন। ৭ মার্চের সভায় যাওয়ার আগে...কাপালিকের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁকে হতাশ মনে হলো। তিনি বললেন, স্বাধীনতার কোনো নাটকীয় ঘোষণা আসছে না।’ মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ওই ভাষণে বলা কথার চেয়ে না বলা কথা কম ছিল না।’
স্বাধীনতার ঘোষণা না থাকলেও ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শুনে সমগ্র জাতি সেদিন মুক্তিযুদ্ধেরই প্রস্তুতি নিয়েছিল। ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’ কথাটির মধ্যে গণমানুষ পেয়েছিল তার প্রতিরোধের বাণী। ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মুক্তিযুদ্ধ) পাওয়া লেখক মঈদুল হাসান তাঁর মূলধারা একাত্তর গ্রন্থে ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে লিখেছেন (পৃষ্ঠা ৪), ‘পাকিস্তানী আক্রমণের সাথে সাথে অধিকাংশ মানুষের কাছে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ঘোষণা হয়ে ওঠে এক অভ্রান্ত পথ-নির্দেশ।’
অন্যদিকে ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা আন্দোলন সমন্বয় কমিটির জনসভায় সভাপতির ভাষণে স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা করেন মাওলানা ভাসানী। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি গ্রন্থে মাওলানা ভাসানীর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে (পৃষ্ঠা ২৪), ‘বর্তমান সরকার যদি ২৫ মার্চের মধ্যে আপসে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা না দেয়, তাহলে ’৫২ সালের মত মুজিবের সঙ্গে একযোগে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম শুরু করব।’ অর্থাৎ শেখ মুজিবের দুই দিন আগের ভাষণ যে মোটেও কোনো প্রতীকী ব্যাপার ছিল না; বরং ভাষণে বলা অসহযোগ আন্দোলন অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালনের মাধ্যমে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করারই নির্দেশনা ছিল, তা পরিষ্কার বোঝা যায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের যেকোনো আলোচনা রেসকোর্সের এ ঐতিহাসিক ভাষণ ছাড়া যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের গল্পও থেকে যায় অসমাপ্ত। এটি আমাদের দীর্ঘ স্বাধীনতাসংগ্রামেরই এক প্রামাণ্য দলিল। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এতটাই যে ২০১৭ সাল থেকে সেটি ইউনেসকোর বৈশ্বিক প্রামাণ্য ঐতিহ্যেরও অংশ। কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সব আওয়ামী লীগপন্থী বয়ান রাষ্ট্রের গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে শেখ মুজিবের ২৪ বছরের সংগ্রামকে হেয় করা হয়েছে। ৭ মার্চের ওপরও নেমে আসে খড়্গ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এতটা গুরুত্ববাহী হওয়ার পরও এ ব্যাপারে রাষ্ট্র কি নির্বিকার থাকতে পারে?
বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগের বয়ানকে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র বয়ান হিসেবে নাকচ করার বিপরীতে আমাদের যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক ইতিহাসের পাঠ নিতে হয়, তবু ৭ মার্চের ভাষণকে অবজ্ঞা করা চলে না। অথচ অতীতে এসব করা হয়েছে অত্যন্ত অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এভাবেই চলবে এই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠ?
সংবিধান পরিবর্তন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে চাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের লাগাতার সমালোচনা জারি রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের ‘সোল এজেন্সি’ থেকেও বের করে নিয়ে আসা জরুরি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে একটি বিশেষ দোষে দুষ্ট বলে এই দলের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকাকে ক্রিটিক্যালি পাঠ করা যাবে না।
উল্লেখযোগ্যই বটে, আওয়ামী লীগের গত তিন মেয়াদে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে খোদ আওয়ামী লীগও অপসারিত হয়েছিল। গণসংগ্রামের আলাপ তো ছিলই না, ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কুশীলব তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্য রাজনৈতিক নেতারাও। আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতিপক্ষ যেহেতু বিএনপি, সেহেতু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকাও অপাঙ্ক্তেয় ছিল।
প্রায় নির্দয়ভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব’ শব্দবন্ধ হয়ে উঠেছিল সব ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে এই কেন্দ্রবিন্দুর কোনো দায়ই ছিল না। যে কারণে সরকারের সমালোচকমাত্রই বিবেচিত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে। দেশের স্বার্থে একসঙ্গে লড়াই করার পরও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের স্বার্থে মতাদর্শিক পার্থক্য জরুরি—রাজনীতির এই সাধারণ সূত্রটুকুও মান্য করা হয়নি।
আপনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের হয়ে লড়লেও ঘরোয়া ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। না হলে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা চলবে কী করে? এক দলের এক টুর্নামেন্ট আর প্রতিবার তাদেরই জয়জয়কার! মুক্তিযুদ্ধ ছিল সেই মহামঞ্চ, যেখানে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আমরা বিভিন্নভাবে এক হয়েছি, লড়েছি এবং জিতেছি। তারপর আমরা যে যার পথে গেছি, এই স্বাভাবিকতা রাজনীতিরই অংশ। আমরা সেই রাজনীতিটাকে ভুল পথে পরিচালিত করলাম এ দেশে।
মনে রাখা দরকার, মুক্তিযুদ্ধ একটা রাজনৈতিক জনযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বই এর মূল কারিগর। মুক্তিযুদ্ধ যদি উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পাটাতন হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক দর্শন, তথা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সব জবরদস্তিমূলক বয়ানের বিপরীতে রক্ষা করা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে প্রারম্ভেই অগ্নিঝরা মার্চের রাজনৈতিক ইতিহাসকে দলনিরপেক্ষ জায়গা থেকে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
যে রাজনীতি আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র এনে দিয়েছে, সে রাজনীতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই। সব মতপথের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজনীতিকেরা যদি এই সত্য উপলব্ধি না করেন, তাহলে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ড. সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব