কোটা সংস্কারে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও পরবর্তী সংঘর্ষ–সহিংস পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই ২০২৪) সন্ধ্যার পর থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার (২৩ জুলাই ২০২৪) রাত থেকে সীমিত আকারে ইন্টারনেট চালু করা হয়। এ কয়দিনের প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকার সম্পাদকীয়, লেখা ও সাক্ষাৎকার ধাপে ধাপে অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে। এর জন্য পরবর্তী কিছু লেখাও অনলাইনে প্রকাশ করতে বিলম্ব হচ্ছে। বুধবার (২৪ জুলাই ২০২৪) ছাপা পত্রিকায় এ লেখা প্রকাশিত হয়।
মৃত্যু তো কেবল সংখ্যা নয়; প্রত্যেক মানুষের মৃত্যু কিছু ক্ষতচিহ্ন রেখে যায় স্বজন ও স্বদেশের বুকে। সময়ের ব্যবধানে আমরা অনেকেই মৃত্যুর কথা ভুলে যাব। আগের আন্দোলনগুলোয় যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের কথাও আমরা মনে রাখিনি। কিন্তু যে মা-বাবা সন্তানকে, যে স্ত্রী স্বামীকে, যে সন্তান বাবাকে হারালেন, তাঁরা কীভাবে স্বজনের বিয়োগব্যথা ভুলে যাবেন?
কোটা সংস্কার আন্দোলনে মৃত্যুর সারি থেকে এখানে কয়েকজনের কথা তুলে ধরা হলো। তাঁদের কেউ সাংবাদিক, কেউ শিক্ষার্থী, আবার কেউ দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ।
গত শুক্রবার মাদারীপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান খানের অনুসারীরা তাঁদের বাধা দিতে সার্বিক পেট্রলপাম্পের সামনে অবস্থান নেন। সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ সময় রোমান ব্যাপারী ও তৌহিদ সন্যামত গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। নিহত রোমান ছিলেন ট্রাকচালক। তাঁর চার বছরের একটি মেয়ে আছে। পুরো পরিবার চলত রোমানের আয়ে।
তাঁর স্ত্রী কাজল আক্তার আহাজারি করে বলছিলেন, ‘আমার স্বামীর দোষ কী? ওরা কেন আমার স্বামীকে মাইরা ফালাইল? এখন আমার সংসারডা কে দেখব? অবুঝ মাইয়াডা লইয়া কার কাছে যামু?’ তৌহিদ সদর উপজেলার মস্তাফাপুর ইউনিয়নের সুচিয়ারভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা। তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি কাঠমিস্ত্রি বাবাকে সাহায্য করতেন। শুক্রবার সকালে তিনিও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দিয়ে ফিরে এলেন লাশ হয়ে। আন্দোলনকারীদের বাধা দেওয়া না হলে সংঘর্ষের ঘটনা এড়ানো যেত আর রোমান ও তৌহিদকেও এভাবে জীবন দিতে হতো না।
সিলেটের সাংবাদিক ছিলেন এ টি এম তুরাব। দুই মাস আগে তিনি বিয়ে করেন। শহরের বন্দরবাজার এলাকায় পুলিশ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষের সময় পুলিশ গুলি চালালে তিনিও আহত হন। তাঁর শরীরে ৯৪টি ছোট গোলাকার কালো জখম ছিল বলে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একজন মানুষের শরীরে ৯৪টি গুলির দাগ, ভাবা যায়! বড় ভাইয়ের অভিযোগ, তুরাবের শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ টার্গেট করেই তাঁকে গুলি করেছে।
হানিফ ফ্লাইওভারে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের খবর পেয়ে নিউজ পোর্টাল ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক হাসান মেহেদী গিয়েছিলেন ছবি তুলতে। তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারজানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁদের সুখের সংসার ছিল। একটি গুলি সব শেষ করে দিল। তাঁদের দুই মেয়ে এখনো জানে না তাদের বাবা নেই। তাঁর বড় মেয়ে মিশার বয়স তিন বছর ও ছোট মেয়ের ছয় মাস। ঢাকা টাইমসের আগে হাসান মেহেদী কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশের আলোয় কাজ করতেন।
রাষ্ট্র ও সমাজের কোনো সান্ত্বনা–সহায়তা স্বজনহারাদের কান্না থামাতে পারবে না। নিহত বাবার স্মৃতি সন্তানকে, নিহত স্বামীর স্মৃতি স্ত্রীকে এবং নিহত সন্তানের স্মৃতি মা–বাবাকে তাড়িয়ে বেড়াবে আজীবন, আমৃত্যু
মোহাম্মদ হোসেন একজন ট্রাকচালক। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে ট্রাক থেকে বালু নামিয়ে বাসায় ফেরার পথে ঢাকার মোহাম্মদপুরের সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ওই সময় সেখানে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছিল।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর নূরুল আমিন গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন ঢাকা উদ্যানের লাউতলা এলাকায়। মৃত্যুর খবর শুনে মা রিনা বেগম বলেন, ‘আমার পোলারে ফিরাইয়া দে। নাতনিদের কী অইবে?’
আল আমিন ওরফে রনি মহাখালীর মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপে কাজ করতেন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিম, মা মেরিনা বেগম ও ছোট ভাই রহিমকে নিয়ে ঢাকার মহাখালী সাততলা বাউন্ডারি বস্তি এলাকায় বাস করতেন তিনি।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গেলে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান এবং গুলিবিদ্ধ হন। রাত আটটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মা তাঁর লাশ শনাক্ত করেন। অনাগত সন্তানের ‘বাবা’ ডাক শোনা হলো না রনির। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
এই সব মৃত্যু পরিবারের ওপর যে ক্ষতচিহ্ন রেখে গেল, তা কখনো মুছে ফেলা যাবে না। রাষ্ট্র ও সমাজের কোনো সান্ত্বনা–সহায়তা স্বজনহারাদের কান্না থামাতে পারবে না। নিহত বাবার স্মৃতি সন্তানকে, নিহত স্বামীর স্মৃতি স্ত্রীকে এবং নিহত সন্তানের স্মৃতি মা–বাবাকে তাড়িয়ে বেড়াবে আজীবন, আমৃত্যু।
● সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com