ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে লন্ডনের সেন্ট জেমস প্রাসাদে ঢুকছেন সাবেক ছয় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, জন মেজর, গর্ডন ব্রাউন, টনি ব্লেয়ার, বরিস জনসন ও ডেভিড ক্যামেরন। লন্ডন, ব্রিটেন, ১০ সেপ্টেম্বর
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে লন্ডনের সেন্ট জেমস প্রাসাদে ঢুকছেন সাবেক ছয় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, জন মেজর, গর্ডন ব্রাউন, টনি ব্লেয়ার, বরিস জনসন ও ডেভিড ক্যামেরন। লন্ডন, ব্রিটেন, ১০ সেপ্টেম্বর

মতামত

ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী পদে টিকে থাকা কি কারও পক্ষে সম্ভব?

কিয়ার স্টারমার লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন, যার অর্থ যথাসময়ে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদও ছাড়ছেন। মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহামের বিশাল জয়ের পর, শেষ পর্যন্ত শত চেষ্টা আর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও প্রবল চাপ আর সামলাতে পারলেন না স্টারমার। এর মধ্য দিয়ে গত এক দশকে ষষ্ঠ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি পদত্যাগ করলেন।

তাঁর এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল দল এবং মন্ত্রিসভায় তাঁর ওপর থেকে সমর্থন পুরোপুরি চলে যাওয়া। গত সপ্তাহের শেষে ব্যক্তিগত আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবে নিজের বিদায়ী পরিকল্পনা এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের মতো গণপদত্যাগের মুখে পড়ে তাঁকে বিদায় নিতে না হয়।

সব মিলিয়ে লক্ষ্যটি ছিল পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ সরকারের চেয়ে একটু ভালোভাবে—সুনামের সঙ্গে—ক্ষমতার হস্তান্তর নিশ্চিত করা। তা সত্ত্বেও, সর্বোচ্চ পদে থাকার দিনগুলো নিয়ে তাঁর আবেগঘন বক্তব্য একজন ব্যর্থ নেতারই প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে।

১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পা রাখার আগের দিনও স্টারমার খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ইপসসের জরিপে তাঁর জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল মাইনাস ২১। ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাওয়া কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন রেটিং। সে সময় মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ তাঁর কার্যকলাপে সন্তুষ্ট ছিলেন, আর ৫২ শতাংশ ছিলেন অসন্তুষ্ট। ইতিহাসে তিনিই প্রথম নেতা যিনি এত নেতিবাচক রেটিং নিয়েও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন।

অবশ্য ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন পরিসংখ্যান খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ইউগভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে স্টারমারের পূর্বসূরি ঋষি সুনাকের রেটিং ছিল মাইনাস ৫৬।

জনগণ হয়তো সাময়িকভাবে কোনো সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একজোট হতে পারে, কিন্তু নীতির অন্যান্য প্রশ্নে তারা গভীরভাবে বিভক্তই থেকে যায়। ফলে স্টারমার (কিংবা করবিন) এর মতো নেতারা মূলত বালুর তৈরি একটি দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে জোট ধরে রাখার চেষ্টা করেন, যা জোয়ারের পানি আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে।

সে সময় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে দীর্ঘ ১৪ বছর পর লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় এনে দেওয়ায় স্টারমারের জনপ্রিয়তা হয়তো কিছুটা বাড়বে। যেমনটা ১৯৯৭ সালে দেখা গিয়েছিল, নির্বাচনের পর টনি ব্লেয়ারের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে প্লাস ৬০-এ পৌঁছেছিল। এমনকি ২০১০ সালে জোট সরকার গঠনের পর ডেভিড ক্যামেরনের জনপ্রিয়তাও লাফিয়ে প্লাস ২১ হয়েছিল। নতুন প্রধানমন্ত্রীর আসনটি সাধারণত একজন নেতার যোগ্যতার ওপর একধরনের আস্থার আলো তৈরি করে।

স্টারমারের জনপ্রিয়তা সত্যিই বেড়েছিল, তবে তা কেবল একধরনের দায়সারা নিরপেক্ষ অবস্থানে গিয়ে ঠেকেছিল। নির্বাচনের পরপরই ওপিনিয়ামের প্রথম জরিপে তাঁর রেটিং বেড়ে প্লাস ৩ হয় এবং ইউগভের জরিপেও পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায়। কিন্তু টনি ব্লেয়ারের আমলের মতো সেই দীর্ঘস্থায়ী উল্লাস স্টারমারের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। তাঁর জনপ্রিয়তার গ্রাফটি বড়জোর পানির স্তর ছুঁয়েছিল, জোয়ারের তোড়ে তা আবার তলিয়ে যেতে সময় লাগেনি।

পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

একই সময়ে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে তাঁর অবস্থানকে অভেদ্য মনে হচ্ছিল। তবে বরিস জনসনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা বলা হয়েছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর ভাবা হয়েছিল কনজারভেটিভরা আগামী এক দশক আধিপত্য ধরে রাখবে।

মনে করা হচ্ছিল ‘রেড ওয়াল’-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দলটিকে এমন এক স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে, যা ২০৩০ সালের আগে লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় আসতে দেবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তিন বছরের মাথায় জনসন বিদায় নিলেন এবং এখন কনজারভেটিভদের অস্তিত্বসংকটের কথা আলোচনা হচ্ছে।

একটি বিপজ্জনক প্রবণতা

তাহলে স্টারমারের ভুলটা কোথায় ছিল? পরিহাসের বিষয় হলো, এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর আগের লেবার নেতা জেরেমি করবিনের ভাগ্যের মধ্যে। করবিনের রেকর্ড এখন স্টারমারের মতোই দেখাচ্ছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে করবিনের ব্যক্তিগত রেটিং ২০১৭ সালের নির্বাচনী প্রচারণার মাইনাস ১১ থেকে নেমে ২০১৯ সালের পরাজয়ের সময় মাইনাস ৪৪-এ গিয়ে ঠেকেছিল। তখন ব্রেক্সিট ইস্যুতে করবিনের ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি ভেস্তে যায়।

স্টারমারের উত্থান ও পতনও ঠিক সমপরিমাণ সময়ের মধ্যেই ঘটল। আর এর পেছনের কারণগুলো লেবার পার্টির দুই শিবিরের জন্যই স্বীকার করা বেশ অস্বস্তিকর। ২০১৭-১৯ এবং ২০২২-২৪ উভয় সময়েই লেবার পার্টির এই ক্ষণস্থায়ী লিড মূলত বিরোধী দলের প্রতি জনগণের ভালোবাসার কারণে আসেনি, বরং তা এসেছিল ক্ষমতাসীন সরকারের চরম ব্যর্থতার ফলে। ২০২৪ সালের ‘নিস্পৃহ ভূমিধস’ জয়ের তথ্যই প্রমাণ করে, লেবার পার্টি মাত্র ৩৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশের ৬৪ শতাংশ আসন জিতেছিল—যা ইতিহাসে যেকোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের জন্য সর্বনিম্ন ভোটের রেকর্ড।

ঠিক যেভাবে ২০১৯ সালে ব্রেক্সিট নিয়ে করবিনের মধ্যপন্থা নীতি একদিকে উগ্র ডানপন্থী ব্রেক্সিট পার্টি এবং অন্যদিকে ইউরোপপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিল, স্টারমারও এই সময়ে এসে একই ধরনের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়েন। একদিকে রিফর্ম ইউকে লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চলের ভোটব্যাংকে ধস নামায়; অন্যদিকে গ্রিন পার্টি এবং গাজাপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শহরের প্রগতিশীল ভোটারদের নিজেদের দিকে টেনে নেয়। এর ফলে ২০২৪ সালে গ্রিন পার্টি তাদের আসনসংখ্যা চার গুণ বাড়াতে সক্ষম হয় এবং লেবারদের দুর্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঐতিহাসিক জয় পায়।

ক্ষমতায় থাকাকালীন লেবার পার্টির নির্বাচনী ফলাফলগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে—রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টির কাছে উপনির্বাচনে হার, ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনে বিপর্যয় এবং স্কটল্যান্ডে নানা কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিকে (এসএনপি) হঠাতে না পারা।

খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে, এই পদত্যাগের ঘটনাটি ঘটল ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের ঠিক ১০ বছর পূর্তির কাছাকাছি সময়ে। এটা নিশ্চিত যে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিভাজনগুলো এখনো ব্রিটিশ রাজনীতির মূলে রয়ে গেছে—যদিও অনেকে হয়তো সেই বিতর্কের খুঁটিনাটি ভুলে গেছেন।

অধ্যাপক টিম বেল সম্প্রতি যেমনটা যুক্তি দিয়েছেন, ব্রিটিশ রাজনীতিকে দুটি ব্লকের মেরুকরণ হিসেবে দেখাই সবচেয়ে শ্রেয়। ভোটাররা মূলত পরিচয়ভিত্তিক দুটি শিবিরে বিভক্ত এবং ব্রেক্সিট নিয়ে তাঁদের অবস্থানই এর মূল ভিত্তি। তবে এই বাস্তবতা মাঝেমধ্যে আড়ালে পড়ে যায়, কারণ এই ব্লকগুলো ভেতর থেকে খণ্ড–বিখণ্ড এবং খুব কম সময়ই তারা সরাসরি মূল সমস্যাটি নিয়ে কথা বলে।

জনগণ হয়তো সাময়িকভাবে কোনো সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একজোট হতে পারে, কিন্তু নীতির অন্যান্য প্রশ্নে তারা গভীরভাবে বিভক্তই থেকে যায়। ফলে স্টারমার (কিংবা করবিন) এর মতো নেতারা মূলত বালুর তৈরি একটি দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে জোট ধরে রাখার চেষ্টা করেন, যা জোয়ারের পানি আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে।

  • নিকোলাস ডিকিনসন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার। দি কনভারসেশন থেকে অনূদিত।