
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত নিজের ঘোষিত আলটিমেটামের একেবারে কিনারে গিয়েও খানিকটা পিছু হটলেন। ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ বাড়াবেন, না থামবেন—এই সিদ্ধান্ত তাঁর নেওয়ার কথা ছিল মঙ্গলবার রাতেই। কিন্তু তিনি আপাতত যুদ্ধবিরতির পথই বেছে নিলেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি হবে। তবে শর্ত হলো—ইরানকে অবিলম্বে, সম্পূর্ণভাবে এবং নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে।
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির দিকেও অনেকটা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
একদিক থেকে দেখলে, এটা অবশ্যই স্বস্তির খবর। ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার যে হুমকি ছিল, তা আপাতত থেমেছে। তার ওপর ট্রাম্প বলেছেন—ইরান থেকে তিনি ১০ দফার একটি প্রস্তাব পেয়েছেন, যা আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’ হতে পারে। এটাও ইতিবাচক ইঙ্গিত।
কিন্তু সমস্যার মূল জায়গা অন্যখানে। এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ীভাবে থামাতে হলে সবচেয়ে বড় বাধা হলো—বিশ্বাসের ঘাটতি। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। আর যে সব মূল বিরোধ থেকে এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার একটিও এখনো মেটেনি।
সব দিক বাদ দিয়ে সরলভাবে দেখলে ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ ছিল—হামলা বাড়ানো, পিছু হটা, অথবা আলোচনায় বসা। কিন্তু বাস্তবে অল্প সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
গত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রস্তাব আদান-প্রদান করেছে। এর লক্ষ্য ছিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি যাতে হরমুজ প্রণালি আংশিক খোলা যায় এবং চূড়ান্ত সমাধানের জন্য সময় পাওয়া যায়।
যদিও একটি অস্থায়ী সমঝোতা হয়েছে, তবুও বাস্তবতা হলো ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সহজে বিশ্বাস করছে না। তাদের এই সন্দেহের কারণও আছে। গত এক বছরে দু’বার (একবার গত জুনে, আরেকবার ফেব্রুয়ারিতে) আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে।
এই কারণেই ইরান এখন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছে। ট্রাম্প বা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভবিষ্যতে আবার সংঘাতে না ফেরেন—এমন গ্যারান্টি তারা চায়। কিন্তু এই প্রশ্ন সহজে মেটার নয়, অন্তত এই দুই সপ্তাহে তো নয়ই।
এর পাশাপাশি, ইরানের আরও কিছু দাবি আছে। যেমন—লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে হবে। আর হরমুজ প্রণালিতে একটি যৌথ ইরান-ওমান টোল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব দাবিতে বোঝা যায়, ইরান এখনো মনে করছে খেলার মাঠে তাদের অবস্থান মোটেই দুর্বল নয়।
সোমবার যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—এই সংঘাত কি ধীরে ধীরে থামবে, নাকি আরও বাড়বে, তখন তিনি যে জবাব দেন সেটিই অনেক কিছু বলে দেয়। তিনি ওই দিন বলেন: ‘আমি বলতে পারছি না। আমি জানি না।’
ট্রাম্পের লক্ষ্যও বারবার বদলেছে। কখনো তিনি বলছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যাবে না। কখনো বলছেন, ইরানের সামরিক শক্তি ভেঙে দিতে হবে। আবার কখনো বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কথা তুলছেন।
এই লক্ষ্য বদলানোই তাঁর পথকে জটিল করে তুলেছে। কারণ, একটি স্পষ্ট লক্ষ্য না থাকলে বিজয় ঘোষণা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সাময়িক বিরতির পরও যুক্তরাষ্ট্র যে আবার উত্তেজনা বাড়াবে না, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শুধু ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সেতুতে হামলার হুমকি নয়, প্রয়োজনে স্থলবাহিনী পাঠানোর কথাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কিন্তু যুদ্ধ বাড়ানোর ঝুঁকি বড়। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যই বড় সংকটে পড়তে পারে। ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামোতে হামলা হলে দেশটি অন্ধকারে ডুবে যাবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে দেশটি পুনর্গঠন করাও কঠিন হয়ে উঠবে।
এতে একদিকে যেমন ইরানি জনগণের কল্যাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে, অন্যদিকে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আমেরিকার প্রতি সামান্য সমর্থন আছে, সেটিও হারিয়ে যাবে। এটি শেষ পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর পক্ষেই যাবে।
যুদ্ধ জারি রাখলে ইরানও পাল্টা আঘাত বাড়াবে। এখন পর্যন্ত ইরানের বিপ্লবী বাহিনী আইআরজিসির কৌশল ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালানো। লক্ষ্য একটাই—জ্বালানির দাম এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে বাধ্য হন যে দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক খরচ বহন করা সম্ভব নয়।
ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি মার্কিন বিমান হামলার পরও ইরান পিছু হটেনি। ফলে সংঘাত বাড়লে আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি আছে—এমনকি ইরানের মাটিতে মার্কিন স্থলবাহিনী নামানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প চাইলে শুরুতেই ‘আমরা জিতেছি’ বলে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রেরই লাভ হতো। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটা করা সহজ না।
এই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই কিছুটা কাজ করছে। ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪২ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দামও গত বছরের তুলনায় গড়ে প্রতি গ্যালনে ৮৮ সেন্ট বেড়েছে।
তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। যদি ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা বাড়ায় এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সহায়তা নেয়, তাহলে বাব আল-মানদেব প্রণালিও অচল হয়ে যেতে পারে। এই পথ দিয়েই সৌদি তেল বিশ্ববাজারে যায়।
ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন, ‘প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দেব’ ধরনের হুমকি দিয়ে ইরানকে চাপে ফেলা যাবে। তিনি যে শর্তগুলো দিয়েছেন, তা-ও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন—ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে, পারমাণবিক জ্বালানি রাখা যাবে না, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা কমিয়ে আনতে হবে।
কিন্তু শুধু আশা করলেই তো কৌশল হয় না। এই ফলাফল যে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ইরানের শাসকগোষ্ঠী এই সংঘাতকে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তাই আত্মসমর্পণের মতো কোনো সিদ্ধান্ত তারা সহজে নেবে না।
ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি মার্কিন বিমান হামলার পরও ইরান পিছু হটেনি। ফলে সংঘাত বাড়লে আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি আছে—এমনকি ইরানের মাটিতে মার্কিন স্থলবাহিনী নামানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প চাইলে শুরুতেই ‘আমরা জিতেছি’ বলে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রেরই লাভ হতো। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটা করা সহজ না।
কারণ, ডেমোক্র্যাট নেতারা ও ট্রাম্পের সমালোচকেরা তখন বলতেন—চাপের মুখে ট্রাম্প পিছিয়ে গেছেন এবং এতে আমেরিকারই ক্ষতি হয়েছে। জ্বালানি, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার উদাহরণ দেখিয়ে তাঁরা এই যুক্তি জোরালো করতেন। এমনকি রক্ষণশীল ভাষ্যকাররাও একইভাবে সমালোচনা করতে পারতেন।
তবুও বাস্তবতা হলো—অনেক সাধারণ মার্কিন নাগরিক এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতেন। জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ খুবই অজনপ্রিয়। প্রতি চারজনের তিনজনই ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিরোধী।
এই কারণে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করলে ওয়াশিংটনে বা টিভি চ্যানেলে অনেক হইচই হতে পারত, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য সেটাই ভালো হতো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যদি এখনই যুদ্ধ থামানো যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও প্রাণহানি ও ধ্বংস এড়ানো সম্ভব। এছাড়া যুদ্ধ যদি এখনই থামানো যায় তা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থলযুদ্ধে জড়াতে হবে না যা চালিয়ে আসলে ওয়াশিংটনের কী লাভ—তা পরিষ্কার নয়।
তাই এখন যে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটাকেই আপাতত একটি ভালো শুরুর দিক হিসেবে দেখা ভালো।
ড্যানিয়েল আর. ডেপেট্রিস ডিফেন্স প্রায়োরিটিস-এর একজন ফেলো এবং শিকাগো ট্রিবিউনের সিন্ডিকেটেড পররাষ্ট্রবিষয়ক কলাম লেখক।
নিউইয়র্কভিত্তিক নিউজ চ্যানেল এমএস নাউ (সাবেক এমএসএনবিসি)-এর ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ