ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

মতামত

আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে বাজি ধরছে যুক্তরাষ্ট্র

২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধসংক্রান্ত প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বলে এসেছে, যে দেশগুলো রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি, তাদের নাগরিকদের ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার নেই। এই তালিকায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র দুটিই রয়েছে।

কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাইডেন নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন। তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। বাইডেন এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় তার মিত্র ইসরায়েলের পাশে থাকবে। এখানে বলা দরকার, ইসরায়েলও রোম সংবিধির স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। 

পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং তাঁদের সম্পদ জব্দ করেন। ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালতটিকে ‘আইনের অপব্যবহারের হাতিয়ার’ বলে আখ্যা দেন। একই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আদালতের ১১ জন বিচারক ও প্রসিকিউটরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আদালতটিকে দুর্বল করার একটি প্রচারণা শুরু করে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এমন আচরণ করছে যে শত্রুর বিরুদ্ধে হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঠিক মনে করে, কিন্তু মিত্রদের ক্ষেত্রে তা মানতে চায় না। অথচ রোম সংবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘পরিপূরকতা’। সহজভাবে বললে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তখনই এগিয়ে আসেন, যখন কোনো দেশ নিজ থেকে সঠিকভাবে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করে না।

ইসরায়েল বলছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নয়, তাই আদালতের এখতিয়ার নেই। কিন্তু এই যুক্তি আসল সমস্যাকে আড়াল করে। সহজ ও সঠিক পথ হলো—যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ ও সত্যিকারের তদন্ত করা। 

কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সে পথে না গিয়ে আদালতের কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তবে এভাবে অবজ্ঞা দেখিয়ে খুব বেশি লাভ হয় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের উদ্দেশ্য কাউকে সরাসরি গ্রেপ্তার করা নয়, কারণ তাদের নিজস্ব পুলিশ নেই। বরং তাদের ক্ষমতা হলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলাফেরা কঠিন করে তোলা।

উদাহরণ হিসেবে, ভ্লাদিমির পুতিন রোম সংবিধি অনুমোদন করা ১২৫টি দেশে গেলে গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়বেন। এ কারণেই তিনি ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে সরাসরি না গিয়ে ভিডিওতে অংশ নেন। একইভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তাঁকে ভাবতে বাধ্য করে, বিদেশ সফরে গেলে অন্য দেশ কী ব্যবস্থা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এই উদ্বেগ কমাতে পারেনি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিতে পারে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা—এক. এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে ভেতর থেকে প্রভাব বিস্তার করা; দুই. এই আদালতগুলো বর্জন করে নিজের প্রভাব ছেড়ে দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতি থামে না, বরং অন্য দেশগুলো নিয়ম লেখার সুযোগ পায়।

একদিকে আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ব ধীরে ধীরে বিভিন্ন শক্তির বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কে নিয়ম তৈরি করবে, সেই প্রশ্ন এখন উন্মুক্ত।

এরিক অল্টার আবুধাবির আনোয়ার গারগাশ কূটনৈতিক একাডেমির ডিন এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সদস্য

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ