
জামায়াতের ৯০ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ইশতেহার পড়লে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো অস্পষ্ট সাধারণ কথার আধিক্য। এসব গড় বক্তব্যের ভেতর যে কয়েকটি পরিষ্কার অবস্থান পাওয়া যায়, সেগুলোর অনেকটাই উদ্বেগজনক এবং স্পষ্টতই গণবিরোধী।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে সংসদে আসন ও ভোটের সংখ্যার অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রশ্ন হলো, কেন? এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি অর্থ পাবে ক্ষমতাসীন দলই। জনগণ কি তাদের কষ্টার্জিত করের টাকা দেবে সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক ব্যয় মেটানোর জন্য, নাকি জনসেবা পাওয়ার জন্য? গণতন্ত্রের নামে দলীয় রাজনীতির খরচ রাষ্ট্রীয়করণ করার এই প্রস্তাবের কোনো নৈতিক বা অর্থনৈতিক যুক্তি ইশতেহারে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
দুর্নীতি দমন নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য শুনলে আওয়ামী লীগ আমলের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগানের কথা মনে পড়ে যায়। সব সরকারি লেনদেন ডিজিটাল করলেই ঘুষ ও তদবির বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনলাইনে অভিযোগ জানানো এবং অভিযোগের অগ্রগতি ওয়েবসাইটে দেখানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু অভিযোগ ‘প্রক্রিয়াধীন’ দেখিয়ে বছরের পর বছর ফেলে রাখার সংস্কৃতি কীভাবে বন্ধ হবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বরং দুর্নীতি দমন প্রসঙ্গে ইশতেহারের সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সরলীকরণ। সরকারি দপ্তরে সর্বত্র সিসিটিভি, সব সেবা ডিজিটাল, মন্ত্রী এমপি ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করলেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমন ধারণা প্রায় শিশুসুলভ। সিসিটিভির সামনে ঘুষ না খেয়ে বাইরে গিয়ে খাওয়া হবে, বেনামি অ্যাকাউন্টে টাকা জমবে, প্রক্সি ব্যবহৃত হবে। এসব ঠেকানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, শক্তিশালী তদন্তব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা ইশতেহারে নেই।
‘আমার টাকা আমার হিসাব’ নামের যে অ্যাপের কথা বলা হয়েছে, সেটিও মূলত প্রতীকী। যে তথ্য দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বহু আগে থেকেই বাজেট ডকুমেন্ট আকারে সরকারের ওয়েবসাইটে আছে। জেলা উপজেলা থানা পর্যায়ের হিসাব যুক্ত করা ছাড়া এই অ্যাপে নতুন কিছু নেই। পরিচালন ব্যয়ের খুঁটিনাটি হিসাব, টেন্ডার পাস হওয়া প্রকল্পের ডিপিপি প্রকাশ কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি উন্মুক্ত করার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণে নৈতিক অনুশাসন যুক্ত করার প্রস্তাবও ঝুঁকিপূর্ণ। নৈতিকতার কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। এই ধারণা সহজেই নতুন ধরনের মোরাল পুলিশিংয়ের জন্ম দিতে পারে। আনসারের ক্ষমতা বৃদ্ধি, বড় শহরে ফেস রিকগনিশন, স্মার্ট সিসিটিভি, রোবোটিক নজরদারি এবং ডিজিটাল পাহারাদার অ্যাপের প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে জামায়াত যে আরও কড়া পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে যেতে চায়, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
অপরাধ রিপোর্টের জন্য অ্যাপ চালু করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত নয়। খুনি কি খুন করার পর ২৪ ঘণ্টা বসে থাকবে? ভুয়া অভিযোগ, প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ছবি বা অডিও ব্যবহার করে কেউ অভিযোগ করলে কী হবে, এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। পররাষ্ট্রনীতিতে জামায়াতের একমাত্র স্পষ্ট কথা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পর্ক এবং উন্নত বিশ্বের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক। অসম বা গোপন চুক্তি নিয়ে কোনো অবস্থান নেই। ভোটের মাঠে যে দলটি চরম ভারতবিরোধী ভাষা ব্যবহার করে, তাদের ইশতেহারে ভারত প্রসঙ্গে নীরবতা এবং বাস্তবে আওয়ামী লীগের মতোই নতজানু কূটনীতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জামায়াত কোনো সরাসরি দায় নিতে চায় না। প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষণ দিলেই কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নিয়ে নীরবতা রয়েছে। মাতৃত্বকালীন কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টা করার প্রস্তাব থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি বাতিলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি, নতুন সামরিক ডকট্রিন, বাজেট বৃদ্ধি, অস্ত্র উৎপাদন, গোয়েন্দা সংস্থার আধুনিকীকরণ এবং সেনাসদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবগুলো মিলিয়ে ইশতেহারে একধরনের উদগ্র সামরিকীকরণের বাসনা প্রকাশ পেয়েছে। জ্বালানি নীতিতে জামায়াত বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল না করে দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির কথা বলেছে। এটি রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আওয়ামী লীগের ‘আলট্রাসুপারক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তির যুক্তিরই পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ কয়লা পোড়ানো নীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।
করনীতিতে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে ২০ শতাংশের নিচে নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরোক্ষ কর কমানোর কথা নেই। অর্থাৎ করের বোঝা বড়লোকদের নয়, সাধারণ মানুষের কাঁধেই থাকবে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জামায়াত কোনো সরাসরি দায় নিতে চায় না। প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষণ দিলেই কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নিয়ে নীরবতা রয়েছে। মাতৃত্বকালীন কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টা করার প্রস্তাব থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি বাতিলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কৃষি বিপ্লবের কথা বলা হলেও কৃষকদের জন্য কার্যকর ও বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই। রপ্তানিমুখী কৃষি এবং বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রস্তাব কৃষি খাতকে করপোরেট ও বহুজাতিক স্বার্থের কাছে উন্মুক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে। গুদাম ও হিমাগার নির্মাণে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেওয়ার কথাও নেই।
পরিবেশ প্রশ্নে তিন শূন্য ভিশনের মতো অবাস্তব স্লোগান আনা হয়েছে। পরিবেশগত অবক্ষয় বলতে মূলত বন উজাড়কে বোঝানো হয়েছে, অন্য ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষিত। বেদখল বন উদ্ধারের কোনো অঙ্গীকার নেই।
শিক্ষানীতিতে স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের কথা বলা হলেও তার স্বাধীনতা নিয়ে স্পষ্টতা নেই। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ এবং স্নাতক পর্যায়ের বিষয়গুলোকে কেবল চাকরিমুখী করার প্রবণতা জ্ঞান উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। শিক্ষা ধারার পুনর্বিন্যাস ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
স্বাস্থ্যবিমার প্রস্তাব থাকলেও দরিদ্র মানুষের অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি অনুপস্থিত।
সংস্কৃতি বিষয়ে মানুষের বোধ, বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষার নামে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অশ্লীলতা বা ধর্ম অবমাননার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই। এতে ভবিষ্যতের সৃজনশীল চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
ধর্ম ও নৈতিকতা নিয়ে ইশতেহারটি স্পষ্টতই ইসলামকেন্দ্রিক। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ইমামদের সমাজনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হলেও অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে নীরবতা রয়েছে।
পরিবহন নীতিতে প্রধান সড়কে রিকশা ও অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব শহরকে কার্যত প্রাইভেট গাড়ির দখলে দেওয়ারই নামান্তর। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
যুবকদের উদ্দেশে ‘প্রথমেই উদ্যোক্তা’ হওয়ার আহ্বান আসলে কর্মসংস্থানের রাষ্ট্রীয় দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পুরো ইশতেহারেই অস্পষ্ট।
নারীর সমান অধিকার নিয়ে ঘোষণার পরও বাস্তব প্রস্তাবে তার প্রতিফলন নেই। মজুরি বৈষম্য, ডে কেয়ার, গ্রামীণ নারী নিরাপত্তা এসব বিষয়ে নীরবতা রয়েছে। হিজড়া জনগোষ্ঠী শনাক্ত করার প্রস্তাব মানবিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সংস্কারের কথা বলা হলেও কার সঙ্গে আলোচনা করে, কোন ভিত্তিতে এই প্রস্তাব তা স্পষ্ট নয়। জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়েও ইশতেহার নীরব।
সবশেষে, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর কথা যাঁরা বলেন, কিন্তু নিজেরা এখনো যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেননি, তাঁদের এই প্রতিশ্রুতি স্বস্তির নয়, বরং গভীর আশঙ্কার জন্ম দেয়।
এই ইশতেহার মূলত পরিচিত রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই আরও বেশি নজরদারি, সামরিকীকরণ ও ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের এক নকশা। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুনত্ব নেই। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে এটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ লেখক, গবেষক ও সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি
ই-মেইল: mahtabjuniv@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব