
ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন একগুঁয়ে স্বভাবের নেতা। তাঁর প্রথম মেয়াদে, ২০২০ সালের ৬ জুলাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে বের করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বাইডেন ক্ষমতায় এসে কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন এবং ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি সংস্থাটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পুনর্বহাল করেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই বিষয়টির ইতি ঘটেছে।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি আবারও একটি নির্বাহী আদেশে সংস্থাটি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর গত মাসের শেষে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটি থেকে বেরিয়ে গেছে।
সংস্থাটির লম্বা ইতিহাসে বড় শক্তিধর দেশ বেরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এই নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো ঘটল। এর আগে ১৯৪৯ সালে শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সংস্থাটি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে সময় এর কারণ হিসেবে সোভিয়েতের দিক থেকে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এই সংস্থায় মাত্রাতিরিক্ত খবরদারি করে। পরে ১৯৫৬ সালে রোগ নজরদারি ও সংক্রমণ বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আবার জাতিসংঘ ব্যবস্থায় ফিরে আসে।
ডব্লিউএইচও ছাড়ার পক্ষে ট্রাম্প যে যুক্তি দিয়েছেন, তা অনেকটা যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজের বক্তব্যের মতো। ট্রাম্পের প্রথম অভিযোগ ছিল, কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে সংস্থাটি নাকি দেশগুলোকে লকডাউনে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্থা। কোনো দেশকে লকডাউন ঘোষণা করতে বা অন্য কোনো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার এখতিয়ার বা কোনো আইনি ক্ষমতা সংস্থাটির নেই। আদতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারই নিয়েছিল।
ট্রাম্পের আরেকটি অভিযোগ হলো, ডব্লিউএইচও স্বাধীন নয়। তাঁর এই অভিযোগ ঠিক তো নয়ই, বরং সংস্থাটি অতিরিক্ত স্বাধীন বলেই আজ শাস্তির মুখে পড়েছে।
ডব্লিউএইচওর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে কি না, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল খেলে অটিজম হয় কি না,
কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অস্বীকারের বিষয়ের মতো অনেক বিষয়ে সংস্থাটিকে ‘মাগা’ শিবিরের কিছু বক্তব্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কথা বলতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি যখন জানায় ট্রাম্প শিবিরের দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তখন তাদের ভর্ৎসনা করা হয়।
এ ছাড়া গাজায় গণহত্যা ও হাসপাতাল ধ্বংসের বিষয়ে চুপ থাকতে ইসরায়েল চাপ দিয়েছিল। আবার ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে চাপ দিয়েছিল রাশিয়া। ডব্লিউএইচও এসব ক্ষেত্রেও নীরব থাকতে রাজি হয়নি।
স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপের বাইরে বিশ্বাসযোগ্য থাকতে হলে সংস্থাটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বাধীন থাকতেই হবে। এতে কিছু নেতার অসন্তোষ তৈরি হলেও কিছু করার নেই।
অর্থ জোগানের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ছিল ডব্লিউএইচওর সবচেয়ে বড় দাতা। নিয়মিত চাঁদা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট কর্মসূচির জন্য আলাদা অনুদান—দুই ক্ষেত্রেই তারা সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে। ট্রাম্পের আগে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছিল দুই প্রধান দলের সমর্থিত। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সমর্থনও ছিল।
আমি নিজে ডব্লিউএইচও নিয়ে গবেষণা করেছি এবং এ বিষয়ে সহলেখক হিসেবে একটি বইও লিখেছি। আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে এই দেখে যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখন সেই সংস্থার বিরোধিতা করছে, যেটি গড়ে তুলতে এবং শক্তিশালী করতে বহু বছর ধরে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতিসংঘ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল এই বিশ্বাস থেকে যে দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে বিশ্বযুদ্ধের মতো বড় বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হবে। গুটিবসন্ত দূর করা, পোলিও নিয়ন্ত্রণ, এইচআইভি ও এইডস মোকাবিলা এবং শিশুমৃত্যুর হার কমানোর মতো বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থ জোগানের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ছিল ডব্লিউএইচওর সবচেয়ে বড় দাতা। নিয়মিত চাঁদা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট কর্মসূচির জন্য আলাদা অনুদান—দুই ক্ষেত্রেই তারা সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে। ট্রাম্পের আগে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছিল দুই প্রধান দলের সমর্থিত। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সমর্থনও ছিল।
আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। এই বিষয়ে কথা বলতে আমি কয়েকজন মার্কিন গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু কেউই প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি। তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন, এ নিয়ে কথা বললে তাঁদের গবেষণা তহবিল বা চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এখন অবস্থা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
ভাগ্যক্রমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর্থিক সংস্কার শুরু করেছিল। ফলে এখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থের ওপর আগের চেয়ে কম নির্ভরশীল। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটের প্রয়োজনীয় অর্থের ৮৫ শতাংশ ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। বাকি ১৫ শতাংশও তোলা যাবে বলে সংস্থাটি আশাবাদী। তবু বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে নেতৃত্বের একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জার্মানির মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো সেই জায়গা পূরণের চেষ্টা করছে, যাতে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা টিকে থাকে।
অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। তারা স্বাস্থ্য সহায়তার সঙ্গে নিজেদের প্রভাবও জুড়ে দিচ্ছে। এদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়ে গেছে। বার্ড ফ্লুর এইচ৫এন১ ধরন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আসল ঘটনা হলো ট্রাম্পের দল লোকচক্ষুর আড়ালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তারা সেই সংস্থার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে। এতে তারা দুটো সুবিধা পাচ্ছে।
প্রথমত, এতে ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকেরা খুব খুশি হন। কারণ, তাঁদের কাছে দেখানো যায়, ট্রাম্প একটা বিদেশি শত্রুর (এই ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) বিরুদ্ধে
লড়াই করছেন। দ্বিতীয়ত, এই যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আসলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে যায়। যেমন বিশ্বে নতুন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে কি না, সেটা তারা জানতে পারে।
তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ট্রাম্প এক কথা বলেন, কিন্তু কাজ করেন ঠিক উল্টোটা। তিনি বাইরে থেকে যতই বলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো প্রয়োজন নেই, আসলে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই সংস্থার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাদের কাছ থেকে তথ্য না পেলে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি হবে।
● দেবী শ্রীধর ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গ্লোবাল পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ার
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদি