রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনের সামনে টিসিবির ট্রাক কেন্দ্র করে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন শ দেড়েক মানুষ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনের সামনে টিসিবির ট্রাক কেন্দ্র করে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন শ দেড়েক মানুষ।

মতামত

‘এই ট্রাক থাইক্যা যদি একটু চাল আর ডিম সস্তায় দিত’

দুপুর সাড়ে ১২টা, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে তখন প্রখর রোদ। সেই রোদের তীব্রতার ভেতরেই সিএ ভবনের সামনে ভ্রাম্যমাণ ট্রাক কেন্দ্র করে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন শ দেড়েক মানুষ। তাঁদের সিংহভাগই মধ্যবয়সী। সেখানে নারী-পুরুষের সারি ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে। কেউ কেউ বয়সের ভারে এতটাই ক্লান্ত যে দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা বেশি ক্লান্ত—পায়ের ওপর ভর করে থাকা জীবন, নাকি জীবনের ভারে পিষ্ট পা?

তাঁরা সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক থেকে সুলভ মূল্যের প্যাকেজ পণ্য কিনবেন বলে। প্যাকেজে রয়েছে দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল ও এক কেজি চিনি, যার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮০ টাকা। সাধারণ খুচরা বাজার থেকে এই পরিমাণ পণ্য কিনতে খরচ হবে কমপক্ষে ৬৭৫ টাকা। হিসাবটা খুব সোজা—লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষের লক্ষ্য একটাই, বাজারদরের তুলনায় ১৯৫ টাকা বাঁচানো।

যাঁদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের কিছুটা নিশ্চয়তা আছে, তাঁদের চোখে হয়তো ১৯৫ টাকা বাঁচানোটা খুব বড় কোনো বিষয় নয়। অন্তত সেই কটা টাকার জন্য কাঠফাটা গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কেনার ভোগান্তির কথা অনেকেই দুঃস্বপ্নেও ভাবতে চাইবেন না।

কিন্তু সিএ ভবনের সামনে লাইনে অপেক্ষমাণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতেই আরেক বাস্তবতা বেরিয়ে আসে। ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা কপালের ঘাম মুছতে মুছতে যখন বলেন, ‘১৯৫ টাকা তো অনেক টাকা। এই টাকা দিয়া আমাগো একটা গোটা দিনের বাজার হয়, এক দিনের ভাত-পানির ব্যবস্থা হয়। এক দিনের রিজিকের সমান এই টাকা বাঁচানোর লাইগা রইদ কোনো ব্যাপার না।’

অভাবের আগুন যেভাবে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে কেবল উৎসবের আগের এই ১০ দিনের প্রলেপে তা মেটার নয়। এই ভ্রাম্যমাণ ট্রাক কার্যক্রমের ব্যাপ্তি শুধু ১০ দিনের পরিবর্তে, প্রতিটি শহর-উপশহর এবং প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা অপরিহার্য। যত দিন না খোলাবাজারের আগুনে লাগাম পড়ছে, অন্তত তত দিন যেন তা চলমান থাকে।

টিসিবির ট্রাকের লাইনের এই অস্তিত্বের সংগ্রামের পেছনে রয়েছে রাজধানীর বাজারগুলোর রূঢ় পরিস্থিতি। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাজার যেন এখন এক জ্বলন্ত উনুন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে শুধু ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের দাম ডজনপ্রতি বেড়েছে ১০ টাকা। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ১০০ টাকার ডিম গিয়ে ঠেকেছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। ডিম ছাড়াও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সবজি, মাছ, মুরগি ও মাংসের দাম।

সবজি বাজারের চিত্র আরও ভয়াবহ। তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পরিবহন ভাড়ায়, সঙ্গে বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কম—এ দুই মিলিয়ে ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি কেনাই দায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি ২০০ ছুঁই ছুঁই, সোনালি মুরগি সাড়ে তিন শ পার হয়েছে আর গরুর মাংস তো ৫০ টাকা বেড়ে ৮৫০ টাকায় ঠেকেছে।

টিসিবি ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যগুলো যেন সাধারণ মানুষের চাপা আর্তনাদের প্রকাশ্য সনদ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বিবিএস বলছে, এপ্রিল মাসেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। আর টিসিবির হিসাবে এক মাসে বেগুনের দাম ৮২ শতাংশ ও কাঁচা মরিচ ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতের দেড় মাসের স্থবিরতার পরও চালের বাজার সরকার কোনো রকমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল।

তবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম সেই সুফলটুকুও কেড়ে নিয়েছে। গরিব মানুষ হয়তো চাল ঠিকমতো কিনতে পারছে, কিন্তু তার থালার বাকি পুষ্টির জোগানগুলো থেকে যাচ্ছে কখনো একদম তলানিতে, কখনো কেবলই দিবাস্বপ্নে। চালের দামের সেই স্বস্তির সুবাতাস এই গ্রীষ্মের প্রখর তাপে খেটে খাওয়া নিরন্ন মানুষের কাছে আর পৌঁছাতে পারছে না।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনের সামনে টিসিবির ট্রাক কেন্দ্র করে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন শ দেড়েক মানুষ।

টিসিবির ট্রাকের সামনে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাস শুধু একটু সাশ্রয়ের জন্যই নয়, আক্ষেপ তাঁদের অভাব নিয়েও। অপেক্ষমাণ এক ক্রেতা বললেন, ‘ডাল আর তেলে তো ভাই দিন পার হয় না! আমাদের এই ট্রাক থাইক্যা যদি অন্তত একটু চাল আর ডিম সস্তায় দিত! আমাগো জন্য আরেকটু সহজ হইতো।’

এই মানুষগুলোর জন্য দুঃখের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোটা হয়তো নিয়তি হয়ে গেছে, তবে তাঁদের মূল যন্ত্রণা হচ্ছে টিসিবির ওই তালিকায় সেই অতিজরুরি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারগুলোর চরম শূন্যতা।

সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা, তাই কিছুটা সাশ্রয়ী মূল্যে এই টিসিবির ট্রাক সেল। প্রতিদিন একেকটি ট্রাক থেকে প্রায় ৪০০ জন মানুষ কেনাকাটার সুযোগ পাবেন। ১০ দিনে মোট ১৩ হাজার ৯৩৯ টন পণ্য ২৮ লাখ ৮০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টে এটিকে বড় পদক্ষেপ মনে হলেও, দেশে এই সংকটগ্রস্ত মানুষের বিশাল সংখ্যার কথা বিবেচনা করলে সারা দেশের মাত্র ৭২০টি ট্রাক আর ১০ দিনের এই কার্যক্রম সাগরের বুকে একবিন্দু জলের মতো অপর্যাপ্ত।

অভাবের আগুন যেভাবে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে কেবল উৎসবের আগের এই ১০ দিনের প্রলেপে তা মেটার নয়। এই ভ্রাম্যমাণ ট্রাক কার্যক্রমের ব্যাপ্তি শুধু ১০ দিনের পরিবর্তে, প্রতিটি শহর-উপশহর এবং প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা অপরিহার্য। যত দিন না খোলাবাজারের আগুনে লাগাম পড়ছে, অন্তত তত দিন যেন তা চলমান থাকে।

নইলে এই গরিব আর খেটে খাওয়া মানুষের সারা জীবন ১৯৫ টাকার মতো ছোটখাটো অঙ্কের পিছু ছুটেই অতিবাহিত হবে। বাজার নামের এই কঠিন বাস্তবতার মুখে পরাজিত এই শ্রেণির মানুষকে দিনের পর দিন টিকে থাকতে হবে অনিশ্চয়তা নিয়েই। আর আমাদের বাধ্য হয়ে নীরবে দেখে যেতে হবে তারাপদ রায়ের ‘দিন আনি দিন খাই’ কবিতার সেই নির্মম উপাখ্যানের বাস্তবায়ন—

‘কেউ যদি হঠাৎ জানতে চায়, এরকম একটা প্রশ্ন করে,

আমরা যারা কিছুতেই সদুত্তর দিতে পারবো না, কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবো না

কি করে আমরা দিন এনেছিলাম,

কেন আমরা দিন আনি, কেন আমরা দিন খাই,

কেমন করে আমরা দিন আনি, দিন খাই।’

  • সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

    ই-মেইল: shoikotamin@yahoo.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব