
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের দুই সদস্য শরীফ ভূঁইয়া ও ফিরোজ আহমেদ দুটি বিষয়ে কমিশন বরাবর দুটি নোটের মাধ্যমে লিখিত মতামত দিয়েছিলেন। সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আগ্রহীদের কথা বিবেচনা করে তাঁদের সেই লিখিত নোট প্রকাশ করা হলো।
আমরা, সংবিধান সংস্কার কমিশনের দুই সদস্য শরীফ ভূঁইয়া ও ফিরোজ আহমেদ, দুটি বিষয়ে কমিশন বরাবর দুটো লিখিত মতামত দিয়েছিলাম। প্রথমটি দেওয়া হয়েছিল ২৩ নভেম্বর ২০২৪। এটি ছিল রাষ্ট্রপতির পদকে শক্তিশালী করা প্রসঙ্গে। অন্যটি দেওয়া হয়েছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪। এটি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ ও রাষ্ট্রধর্ম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। এই দুটি লিখিত মতামতে আমরা আমাদের যৌথ ভাবনা প্রকাশ করেছিলাম, যা কমিশনের বাকি সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মতামত থেকে ভিন্ন ছিল।
রাষ্ট্রপতির পদ সম্পর্কিত মতামতটি দেওয়া হয়েছিল এমন একটি প্রেক্ষিতে, যখন কমিশনের অধিকাংশ সদস্য দুটি পদক্ষেপের মাধ্যমে পদটিকে শক্তিশালী করার কথা বিবেচনা করছিলেন; প্রথমত, রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে এবং দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করে। এই প্রসঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। আমাদের মতামতের প্রেক্ষিতে এই বিষয়ে অধিকতর আলোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত কমিশন তা গ্রহণ করে।
রাষ্ট্রধর্ম প্রসঙ্গে আমাদের মত কমিশনে গৃহীত না হলেও আমাদের চিঠির প্রেক্ষিতে কমিশনের অভ্যন্তরে এ বিষয়ে আরও আলোচনা হয় এবং কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন আনায় তা ভূমিকা রাখে। উপরন্তু, এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমাদের এই ভিন্নমতের প্রতিফলন হিসেবে কমিশনের প্রতিবেদনের রাষ্ট্রধর্ম অংশে ‘তবে কমিশনের সদস্যরা এই বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি’ এই বাক্যটি সংযোজন করা হয়।
এই লিখিত মতামতগুলো সর্বস্তরের পাঠক এবং বিশেষভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংবিধান সংক্রান্ত বিষয়ের গবেষকদের আগ্রহ জাগাতে পারে, এই বিবেচনায় লিখিত মতামত দুটি আমরা হুবহু প্রকাশ করছি।
কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বাংলাদেশের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের জন্মদাতা। রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানের বিনাশ সাধন, জবাবদিহির সংস্কৃতির ক্রমঃঅবসান এবং আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের প্রধানের পদটি দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে শক্তি অর্জন করেছে; পরিণামে ভোটাধিকারবিহীন নির্বাচন ও ফ্যাসিজমের জন্ম দেওয়ার কাঠামোগত বাস্তবতা তৈরিতেও এই প্রক্রিয়াটি অন্যতম প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই একক ক্ষমতার অবসান ও তাঁর ক্ষমতাকে ভারসাম্যে আনার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশনে দুটি প্রধান যুক্তিধারা আলোচিত হয়েছে। প্রথমটি হলো, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কতগুলো ব্যবস্থার মাধ্যমে একচেটিয়া ক্ষমতার অবসান ঘটানো; অন্যটি হলো, এই ব্যবস্থাগুলো গ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরাল আরও একটি পদকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ক্ষমতার ভাগাভাগি করা।
১. আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর একচেটিয়া ক্ষমতা হ্রাস বিষয়ক প্রস্তাবের দুটো অংশ আছে:
ক. সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর একচেটিয়া ক্ষমতা হ্রাস বা সীমিত করা। সুনির্দিষ্টভাবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ রদ কিংবা সংস্কার করে সেটার বড় অংশ অর্জন করা সম্ভব। সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা হলে সেটাও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে কার্যকরভাবে আরেক দফা হ্রাস করবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পদে কত বছর থাকা যাবে সেটা নির্ধারণ করে, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর পদে এক ব্যক্তির না থাকাকে বাধ্যতামূলক করে, এবং এমনি আরও কিছু ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
খ. রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী এবং প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতায় আনা, জনগণের ভোটাধিকারকে অবারিত করা এবং দুর্নীতিকে কঠিন করে ফেলার পরিবেশ সৃষ্টি সম্ভব। তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ, বদলি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচেটিয়া অধিকার নির্বাহী বিভাগের থাকবে না।
২. অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতির পদটিকে ক্ষমতাশালী করার দ্বিতীয় প্রস্তাবটিতে প্রথম প্রস্তাবকে বাতিল করা হয়নি। বরং সেটার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে ভারসাম্যে আনতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পদ প্রবর্তন করার কথা বলা হয়েছে, যিনি কিছু নির্দিষ্ট সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন, প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতাকে ভারসাম্যে আনবেন এবং ক্ষমতার একচেটিয়াকরণকে প্রতিরোধ করবেন।
আমাদের বিবেচনায়, নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পদের কারণে ভবিষ্যতে নিম্নলিখিত কিছু সংকট ও জটিলতার সুযোগ তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে:
ক. রাষ্ট্রপতি সরাসরি নির্বাচিত হলে তাঁর পদটি হবে রাষ্ট্রের মাঝে একমাত্র প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত পদ। এটা প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরাল একটি ক্ষমতাবলয় তৈরি করতে পারে। এমনকি, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত না হয়ে সংসদের বাইরে অন্য যেকোনো পর্যায়ে নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচিত হলেও রাষ্ট্রপতির পদটির নতুন একটি ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হবার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না।
খ. রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপের কারণে সংসদের দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত, বিঘ্নিত ও বিলম্বিত হতে পারে। এটার সমাধান হয়তো সম্ভব, তার জন্য নানা আইনগত প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে, একই সঙ্গে প্রয়োজন হবে ‘সদিচ্ছা’, যেটি খুব বেশি পরিমাণে ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল একটা শর্ত।
গ. রাজনৈতিক দলে ভাঙনের প্রবণতা এবং জন–অনাস্থা, উভয়টিই বৃদ্ধি পেতে পারে রাষ্ট্রপতির অসহযোগিতা ও বিরূপ ভূমিকার কারণে। এটা ‘২ক’ অংশে বর্ণিত রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবার ফলে পদটির গুরুত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়াকে রাষ্ট্রপতির বাড়তি এখতিয়ারের বৈধতা হিসেবে গণ্য করতে পারে নানা রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং জনগণের একটি অংশ ।
এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে প্রধানমন্ত্রীকে কেবল সংসদের বিরোধিতারই মোকাবিলা করতে হবে না, তাঁকে রাষ্ট্রপতিকেও, এবং তাঁর পেছনে জড়ো হওয়া শক্তিগুলোকেও মোকাবিলা করতে হতে পারে। এটা একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হবার সম্ভাবনা থাকে।
ঘ. বাস্তব একটি আশঙ্কা হলো, রাষ্ট্রপতির আলংকারিক পদকে কেন্দ্র করেই বহু দেশের রাজনীতিতেই সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপতির পদটির পেছনে একটি জনরায়ের বৈধতা থাকলে এই প্রবণতা সংগত কারণেই আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বহু অজনপ্রিয় প্রাত্যহিক কাজ প্রধানমন্ত্রীকে করতে হয়, রাষ্ট্রপতি তেমন দায় থেকে মুক্ত থাকেন।
ফলে সমান্তরাল একটি পদের উপস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী বহু ক্ষেত্রে কঠিন সময় পার করার সুযোগ পাবেন না, বরং রাজনীতির বাইরেও বহুমুখী চাপের মাঝে থাকবেন। একই সঙ্গে, রাজনীতিতে চাপ অতিক্রমের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মাঝে সমঝোতার মাধ্যমে দেশের সংকট নিরসনের সংস্কৃতি বিলম্বিত বা ক্ষীণতর হতে পারে রাষ্ট্রপতির পদটির বাড়তি সাংবিধানিক ক্ষমতার জন্য।
একই সঙ্গে, রাষ্ট্রপতির পদটি একটি মীমাংসার কেন্দ্র হিসেবেও হাজির হতে পারে, সেটা ভালো ও মন্দ, উভয় ধরনের ফলই বয়ে আনতে পারে।
ঙ. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন বিকাশে একটি বড় বাধা হিসেবে এবং দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, তদবির ও চাপ প্রয়োগের নতুন একটি উৎস হিসেবেও নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির পদটি আবির্ভূত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে অংশ নিতে হয় না, সংসদে নিয়মিত জবাবদিহি করতে হয় না এমন একজন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ও ঝুঁকি তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, তাঁর হাতে সময়, যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বেশি বলে এই আশঙ্কা থাকে।
একজন আলংকারিক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে হাওরের মাঝে সড়ক নির্মাণ করেছেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তিকে উপেক্ষা করে। নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতিকে উপেক্ষা করা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও কঠিন হতে পারে। ফলে, নির্বাচিত ও ক্ষমতায়িত রাষ্ট্রপতির পদটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বলতর করে ফেলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
এভাবে, রাষ্ট্রপতির একটি সমান্তরাল পদকে ক্ষমতায়ন করা হলে সংসদে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পদকে দুর্বলতর করার এবং পরিণামে অগণতান্ত্রিক শাসনের একটা পরিসর তৈরি করার আশঙ্কাকে নাকচ করা যায় না। ওপরে বর্ণিত সবগুলো ঝুঁকিই অত্যন্ত প্রবল বলে মনে করি।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করাও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইনগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার রাশ টেনে ধরা, সংসদে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর বিকাশই এ ক্ষেত্রে অধিকতর কার্যকর সমাধান হতে পারে। এই পথ অবলম্বন করা হলে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগেই জবাবদিহির চর্চা এবং দলগুলোর মাঝে রাজনৈতিক মীমাংসার সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকবে, এমনটাও আশা করা যায়।
এই বিষয়ে নানামুখী মতামত এসেছে। পুনরাবৃত্ত হবার আশঙ্কা এড়াতে হয়তো সেগুলো লিখিত থাকলে আলোচনা সুবিধাজনক হবে এই আশায় সেগুলোকে লিখিতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি
১. সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া সংখ্যায় যারা কম, তাদের মাঝে অসাম্য ও অমর্যাদার অনুভূতি তৈরি করবে। অথচ আমাদের সংবিধানের প্রস্তাব হলো সকল মানুষের জন্য সাম্য ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান।
২. সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম এমনিতেই সমাজে বিশেষভাবেই প্রতিষ্ঠিত আছে। একে আলাদা করে উল্লেখ করাটা রাষ্ট্রের অভিমুখ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবেই কিছু তাৎপর্যও বহন করবে, কিছু বার্তা প্রদান করবে।
৩. আলেম সমাজের একটা বড় অংশ রাষ্ট্র ও ধর্মকে পৃথক রাখাকে ধর্মের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং একে অভিসন্ধিমূলক ব্যবহারের বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে প্রদান করেছেন।
৪. ধর্ম নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য, রাষ্ট্র সকলের। রাষ্ট্রকে সেইভাবে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, জনগণের যৌথ আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। অথচ, রাষ্ট্রধর্মের কার্যত কোনো আইনি তাৎপর্য নেই এবং তা যৌথ নয়, এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠেরও যৌথ আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ নয়।
৫. উদাহরণ হিসেবে মদিনা সনদের কথাও আসতে পারে, সেখানে কোনো একটি সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয়নি। বরং সকলের যৌথ মর্যাদার কথাই বলা হয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধিতেও সমতা প্রতিপাদনের জন্য সহচরদের আপত্তির মুখেও নবী নিজের বিশেষ মর্যাদার প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন, কেননা এই মর্যাদার প্রকাশটি প্রাথমিকভাবে নিজের সম্প্রদায়ের মাঝেই প্রযোজ্য।
৬. পশ্চিম ইউরোপের অনেকগুলো সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম থাকার প্রসঙ্গ আলোচনায় এসেছে। বলা হয়েছে যে, এটা তাদেরকে ধর্মবাদী রাষ্ট্র কিংবা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করেনি। কিন্তু আদতে, শুরুতে তারা ধর্মীয় পরিচয়বাহী রাষ্ট্রই ছিল। ভিন্ন ধর্ম, উপদলকে নিপীড়ন ও বৈষম্যের মাঝেই থাকতে হতো সেখানে। পরবর্তী সময়ে নানা সংস্কারের মাধ্যমে তার অবসান ঘটানো হয় এবং সংবিধান ও আইনের সেই বিধানগুলো অকার্যকর হয়ে যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই রাষ্ট্রগুলো শত শত বছরের রক্তাক্ত ধর্মীয় যুদ্ধ, এবং বিশেষ করে ধর্মীয় উপদলগুলোর যুদ্ধের যে অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেটা এই বিশেষ বাস্তবতার কারণ। বাংলাদেশের এই রকম ধর্মযুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রায় নেই। বরং এই অঞ্চলের ইতিহাস সাধারণভাবে সহিষ্ণুতার এবং সমমর্যাদার।
৭. আমাদের ভৌগোলিক ভূখণ্ডের বিশেষ পরিচয় ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, এমন যুক্তি এসেছে। এটার সত্যতা থাকলেও তা কেবল আংশিক চিত্রই দেয়। মধ্যযুগ থেকে এই অঞ্চলের কৃষি ও জনসমাজ পত্তনে ইসলামের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু তা একইভাবে অন্য ধর্মেরও রয়েছে। এমনকি মোগল আমলে যখন এই প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়, তখনো অন্যান্য ধর্মসম্প্রদায়ও সমভাবে যুক্ত ছিল এবং তাদেরও সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
৮. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রধর্মের প্রস্তাবনা একটা ভুল বার্তা প্রদান করবে।
৯. যুক্তি হিসেবে এটাও এসেছে যে, রাষ্ট্রধর্মের প্রসঙ্গ না থাকলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবত কোনো পার্থক্য থাকে না, এবং এটা প্রদেশ হলেও কার্যত একই বিষয় হবে। এই বিষয়ে আমাদের মত এটাই যে, এর আগের ৭ম অনুচ্ছেদে যা আমরা বলেছি, সেটা অনুযায়ী, ইসলাম যেমন এই জনপদের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে একটা স্বাতন্ত্র্যসূচক ভূমিকা রেখেছে, একই সঙ্গে তা অন্য ধর্মগুলোও রেখেছে। সামষ্টিকভাবেই তা বাকি পৃথিবীর তুলনায় একটা যৌথ সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করেছে, যা তাকে বাকি সকল রাষ্ট্র থেকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করেছে।
১০. জাতিগঠন ও সামষ্টিক জাতি নির্মাণের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে আমাদের তাই সকল ধর্ম ও সংস্কৃতির সমমর্যাদা, নিজস্ব বিকাশের অধিকার প্রদান করার মাধ্যমেই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠনে মনোযোগী হতে হবে।
শরীফ ভূঁইয়া সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
ফিরোজ আহমেদ লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকদের নিজস্ব