ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে মাত্র তিন সপ্তাহে ১ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই মৃত্যুর মিছিল থামার কোনো লক্ষণ নেই; বরং নিহত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
৭ মার্চ তেহরানে দাফন করা হলো দুই বছর বয়সী জয়নাব সাহেবিকে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত এই শিশুর কফিনের পাশে পড়ে ছিল তার প্রিয় একটি পুতুল। শোকাতুর স্বজন ও প্রতিবেশীরা যখন তাকে বিদায় জানাতে সমবেত হয়েছিলেন, তখন সবার চোখে ছিল বিষাদ আর প্রিয়জনকে হারানোর হাহাকার। জয়নাবের এই বিদায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বর্তমানে ইরানের করুণ বাস্তবতার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।
এর আগে ৩ মার্চ হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। বোমা হামলায় শাজারেহ তাইয়েবাহ বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৭৫ জনের গণজানাজায় অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। কফিনের দীর্ঘ সারি শহরজুড়ে বয়ে নেওয়া হচ্ছিল। এটি ছিল এই যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস একটি ঘটনা।
সহিংসতার এই ধারা অনেক পুরোনো ও পরিচিত। গাজা থেকে লেবানন এবং এখন ইরানেও সাম্রাজ্যবাদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই সংঘাত কেবল বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির উচ্চপদস্থ অনেক সামরিক কর্মকর্তা।
আফ্রিকা মহাদেশের জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এই ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো অস্থিরতা ঐতিহাসিকভাবেই আফ্রিকার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। লাগোস থেকে নাইরোবি কিংবা জোহানেসবার্গ থেকে ডাকার পর্যন্ত পুরো আফ্রিকার পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ মূলত আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম বাড়ার অর্থ হলো তীব্র মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যসংকট।
আফ্রিকার মানুষ আগে থেকেই জানে যে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার রক্ষার নাম করে শুরু হওয়া পশ্চিমা সামরিক অভিযান কীভাবে ক্রমে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে লিবিয়ার উদাহরণটি সবার সামনে উজ্জ্বল।
২০১১ সালের মার্চ মাসে লিবীয় জনগণকে রক্ষার নাম করে জাতিসংঘ যে প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল, পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই ন্যাটো সেখানে নির্বিচার বোমা হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার পতন এবং দেশটির নেতার নৃশংস মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
আজ এক দশকের বেশি সময় পরেও লিবিয়া বিভক্ত ও রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে আছে। লিবিয়ার সেই অস্থিতিশীলতা পরবর্তী সময়ে মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলোয় উগ্রপন্থা ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ডেকে আনে।
ইরান হোক বা কঙ্গো কিংবা লিবিয়া—সবখানেই ইতিহাসের এক করুণ চিত্র স্পষ্ট ফুটে ওঠে। এই দেশগুলো যখনই নিজেদের কৌশলগত সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, তখনই তাদের ওপর পশ্চিমাদের আঘাত এসেছে। ১৯৬০ সালে কঙ্গোর নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা নিজের খনিজ সম্পদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে চেয়ে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারান। দীর্ঘ সময় পর একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে। আজ ইরানের নেতাও তথাকথিত নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে চালানো এক সামরিক অভিযানে নিহত হলেন।
আফ্রিকা ও দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো আজ এক মহাসংকটে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের সনদই এখন শেষ দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি না থাকলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আবারও আগের মতো যখন ইচ্ছা অন্য দেশকে লুটে খাওয়ার সুযোগ পাবে। যেমনটা অতীতে আমরা কঙ্গোয় বেলজীয় রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের ভয়াবহ শাসনের সময় দেখেছিলাম, যেখানে লাখ লাখ মানুষ নির্মমভাবে মারা গিয়েছিল। অথবা মেক্সিকো কিংবা কিউবার ওপর চালানো মার্কিন আগ্রাসনের সেই দিনগুলোও বিস্মৃত হওয়ার নয়।
বর্তমান এই আইনহীনতার বিরুদ্ধে আফ্রিকার নেতাদের অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। অবিলম্বে এই সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানাতে হবে। এই সংকটের পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের স্পষ্টভাবে নিন্দা জানানোর সময় এসেছে। আফ্রিকার সংহতিকে সমন্বয় করতে হবে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে।
তফি এমহাকা কলামিস্ট ও আফ্রিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
[ ২৩ মার্চ ২০২৬ প্রথম আলোর ই–পেপার সংস্করণে এ লেখা আজ ইরান, আগামীকাল কি আফ্রিকা—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে]