উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অহেতুক ভোগান্তি থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অহেতুক ভোগান্তি থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।

মতামত

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্ত ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলে তাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে, বাংলাদেশেরও উচিত প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ইতিবাচক বদলের জন্য কাজ করে যাওয়া।

উদ্দেশ্যহীন নিরীক্ষা চালানো থেকে দূরে থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি স্তর পরবর্তী স্তরের সঙ্গে সুসংগতভাবে যুক্ত থাকে। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। যেখানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ গড়ে তোলা যায়।

বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষাব্যবস্থা শুধু মানবসম্পদ তৈরির একটি মাধ্যম নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে উদ্ভাবনী গবেষণা অপ্রতুল, যা উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম অগ্রাধিকার।

বিশেষ করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ। সে তুলনায় আমাদের দেশে এ ধরনের গবেষণা কিছুটা হলেও তার কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পরবর্তীকালে খুব একটা দেখা যায় না। ফলে উদ্ভাবনী চিন্তা খুব একটা আলোর মুখ দেখতে পায় না।

শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ই সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হবে, যা তাদের গড়ে তুলবে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানবশক্তিতে। পাশাপাশি দক্ষ মানবশক্তিতে রূপান্তরের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন।

আমরা সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা সমালোচনা করে থাকি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কেন এ ধরনের উদ্ভাবনী বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে পারে না, সীমাবদ্ধতা কী, সে বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা দেখা যায় না। আমরা সব সময় উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদাহরণ দিই, কিন্তু কখনো আমরা সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বরাদ্দ কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিসরে খাতভিত্তিক বিভিন্ন রিসার্চ কাউন্সিলের অভাব নিয়ে জোরালো আলাপ তুলি না।

যেমন যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কলা ও মানবিক, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে আলাদা গবেষণা কাউন্সিল রয়েছে, যারা গবেষণার জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় গবেষণা বরাদ্দ দিয়ে থাকে, যার ছিটেফোঁটাও আমাদের দেশে নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা চাইলে তার পূর্বশর্ত হিসেবে সেই সুযোগ-সুবিধাগুলোও আগে নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

তাই গবেষণা, উদ্ভাবন ও তার মান নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে হবে আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও তা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের তুলনায় অপ্রতুলই থেকে যাবে। উদ্ভাবননির্ভর উচ্চশিক্ষাকে ত্বরান্বিত করে আমদের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

যার মাধ্যমে নতুন ধরনের উচ্চমানের উৎপাদনশীল শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। কেননা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে উদ্ভাবনী গবেষণাই হবে প্রগতি ও উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা হতে হবে গবেষণাভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর।

এভাবে অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে শিক্ষার একটি সংযোগ তৈরি করতে হবে। আমরা চীনের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত রাখে, যার মধ্য দিয়ে তারা কেবল মানবসম্পদই তৈরি করেনি; বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায়ও আমরা এই অগ্রাধিকার দেখতে পাই। চীনের উদাহরণ এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে তারা যেভাবে ধীরে ধীরে উন্নয়নের এমন একটি দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের জন্য প্রেরণামূলক হতে পারে।

দেশের অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সম্পর্কিত বিষয়ের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একধরনের সহযোগিতামূলক ও পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এভাবে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলা যায়।

এভাবে শিক্ষা হয়ে উঠবে বাস্তবসম্মত ও প্রায়োগিক, যাতে করে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ই সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হবে, যা তাদের গড়ে তুলবে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানবশক্তিতে।

পাশাপাশি দক্ষ মানবশক্তিতে রূপান্তরের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। আমরা যদি শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগর ব্যবস্থার একটি কার্যকর সমন্বয় করতে পারি, তাহলে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে আরও বেশি দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবে। এখানে বিষয় অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

শিক্ষার্থীদের এমন দক্ষ করে গড়ে তোলার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে শিক্ষকদেরও দক্ষতার উন্নয়ন ও মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের চর্চা, যা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুটি অন্যতম সমস্যা। শিক্ষক নিয়োগে মেধাভিত্তিক চর্চার বিপরীতে এখন যেন রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচিতিই হয়ে উঠেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের অন্যতম মানদণ্ডে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে বেশ বেগ পেতে হয়।

এর সঙ্গে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক যুক্ততাকে একধরনের যোগ্যতা হিসেবে দেখার প্রবণতা। যে কারণে আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ প্রশাসনিক নিয়োগেও রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব। যার মাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী শিক্ষকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের ক্ষমতার উৎস ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল।

তথাকথিত সেই রাজনৈতিক সাফল্যকে ধরে রাখতে শিক্ষকদের অনেকেই দলীয় লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির অন্যতম প্রধান অংশীদার হয়ে উঠছে এবং শিক্ষার্থীদের তাদের হীন স্বার্থে ব্যবহার করছে। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যকার আন্তসম্পর্ক নির্ধারিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় রাজনৈতিক আদর্শ, নীতি ও নৈতিকতার প্রেক্ষাপটে।

যে প্রক্রিয়া একভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হিসেবে তৈরি করছে, যা তাদের ক্ষমতার চর্চার বলয়ে নিয়ে আসছে। যে ক্ষমতার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলীয় শিক্ষার্থীদের কাছে বলা চলে একভাবে জিম্মি থাকে এবং শিক্ষকদের মধ্যেও একটা বড় অংশ এই জিম্মিদশা থেকে রেহাই পায় না, যা আমরা এখনো দেখছি।

দেশজুড়ে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনাগুলো এরই ধারাবাহিকতামাত্র। তাই শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ উচ্চশিক্ষার বিকাশের জন্যই জরুরি। কেননা এর খড়্গ থেকে শিক্ষার্থীদের যেমন উদ্ধার করতে হবে, ঠিক তেমনই শিক্ষকদেরও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা থাকা অতি জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হতে পারে, যা থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা প্রণয়নে একটি দিকনির্দেশনা তৈরি করা যেতে পারে।

একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক স্বাধীন শিক্ষা কমিশনের মধ্য দিয়ে সমন্বিত উপায়ে আমাদের প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার দিকনির্দেশনা এবং একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

জাতীয় পর্যায়ের মতোই শিক্ষা সংস্কারকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে ধাপে ধাপে এর রূপান্তর ঘটাতে হবে, কোনো ‘বিগ ব্যাং’ বা জনতুষ্টিমূলক পরিবর্তন এখানে প্রয়োজন নেই, কেননা এমন বদল যে টেকসই হয়নি, সেটি আমরা বিগত সময়গুলোতে দেখেছি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষানীতিকে রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে রাখার একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। একটি জাতীয় ঐকমত্যভিত্তিক শিক্ষাকাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে এবং পরিবর্তন আসবে গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে, যা সফল হলেই কেবল জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে ‘একদিন এক মডেল, পরের দিন আরেক মডেল’ গ্রহণের মতো নীতিগত অস্থিরতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে এবং গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষানীতির সম্প্রসারণ ও বিস্তার ঘটাতে হবে। তাহলেই আমরা উচ্চশিক্ষাকে নিয়ে যেতে পারব বৈশ্বিক পরিসরে।

  • বুলবুল সিদ্দিকী, অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব