আট দশক আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উঠে আসা বিজয়ী পশ্চিমা শক্তিগুলো এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো নির্মাণ করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল—আর যেন কখনো এমন সর্বগ্রাসী যুদ্ধ না ঘটে। তিনটি পরস্পর জড়ানো প্রতিশ্রুতি ছিল সেই কাঠামোর ভিত্তি। সেগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা; শিল্পোন্নয়ন, যা ক্রমে মানুষের জীবনমান উন্নত করবে; বিশ্বায়ন, যা বাণিজ্য ও পারস্পরিক সংযুক্তির মাধ্যমে সমৃদ্ধি ছড়িয়ে দেবে।
এই যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থা বাস্তব সাফল্যও এনে দিয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক
স্বাচ্ছন্দ্য একসঙ্গে ভোগ করেছিল। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল। একসময় ইতিহাসের গতি স্পষ্টই টের পাওয়া যাচ্ছিল। বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সেই গতি যেন অনিবার্য বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এই ব্যবস্থার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তার পতনের বীজ। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল পশ্চিম-নিয়ন্ত্রিত সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে, যারা নিজেদের ‘বিশ্বের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে তুলে ধরত।
বিশ্বায়নও গড়ে তুলেছিল এক অসম চুক্তি। দরিদ্র দেশগুলোর সস্তা শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ফলে ধনী দেশের ভোক্তারা পেয়েছিল অঢেল পণ্য। কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছে বৈশ্বিক পরিবেশকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু কোম্পানি উৎপাদন বিদেশে সরিয়ে নেওয়ায় স্থানীয় সমাজগুলো হারিয়েছে কাজ। হারিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। একই সঙ্গে এমন এক অর্থনীতির জন্ম দেয়, যেখানে সমাজের জন্য প্রকৃত কোনো মূল্য সৃষ্টি না করেই জল্পনা ও শেয়ারমূল্যের কৃত্রিম স্ফীতির মাধ্যমেই বিপুল সম্পদ সঞ্চয় সম্ভব হয়। এতে সবচেয়ে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ছিল এক আগাম সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল করেছিলেন, কিন্তু সারাই করেননি। ফলে বৈষম্য বেড়েছে, রাজনীতি হয়ে উঠেছে ক্রুদ্ধ ও বিভাজিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন তাঁর উত্থান আর ব্যতিক্রম বলে মনে হয়নি। সেটি ছিল জমে ওঠা দেনার বিল পরিশোধের সময়।
২০২৫ সালে এই সঞ্চিত চাপ আর উপেক্ষা করা যায়নি। বিশেষ করে যেসব দেশ একসময় বিশ্ব শাসন করত, সেই সব দেশে এই চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। একসময় অটুট মনে হওয়া ট্রান্স–আটলান্টিক জোট ভেঙে পড়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ ও সুরক্ষাবাদী শিল্পনীতি দেখিয়ে দিয়েছে, নির্বিঘ্ন মুক্তবাণিজ্যের যুগ শেষ। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জনতুষ্টিবাদ আসলে অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি গভীর অনাস্থা প্রকাশ করেছে। আর অভিবাসীরা হয়ে উঠেছে বলির পাঁঠা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবন ও কাজের ধরন আমূল বদলে দেবে। এটি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহৃত হবে, তার ওপর নির্ভর করবে ক্ষমতা ও সম্পদ আরও কেন্দ্রীভূত হবে, নাকি জ্ঞান ও উৎপাদনশীলতার প্রবেশদ্বার খুলে যাবে।
এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাত যোগ করলে বোঝা যায়, কেন পশ্চিমা নেতারা ও চিন্তকেরা আজ ‘পলিক্রাইসিস’ বা বহুমুখী সংকটের
ভারে দিশাহারা।
এই শব্দটি বৈশ্বিক বিপদের জটিল জালকে বর্ণনা করতে পারলেও, এটি মূল রোগনির্ণয়ে ব্যর্থ। এটি ভয়ের স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু দায় নির্ধারণ করে না। এটি পশ্চিমা বিশ্বের ধাক্কাকে বৈশ্বিক বিপর্যয় হিসেবে দেখায়, অথচ পৃথিবীর বাকি অংশের (যাকে বলা যায় ‘বৈশ্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠ’) বিষয়কে উপেক্ষা করে।
পুরোনো ব্যবস্থার মৃত্যুসংবাদ উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রশ্ন আসে—পুরোনো ব্যবস্থার জায়গায় কী আসছে। কারণ, গভীর অস্থিরতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মৌলিক রূপান্তরের বিরল সুযোগ। তাই এই সময়কে ‘পলিক্রাইসিস’ নয়, বরং ‘পলিটিউনিটি’ বা এক বহুমুখী সম্ভাবনার যুগ হিসেবে দেখা উচিত। এটি প্রান্তিক অঞ্চলগুলো থেকে শুরু হওয়া এক প্রজন্মগত বৈশ্বিক রূপান্তরের দ্বার খুলে দিচ্ছে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার কিছু রেখাচিত্র ইতিমধ্যে দৃশ্যমান—বিশেষ করে তিনটি ক্ষেত্রে।
প্রথমত, ভূরাজনীতিতে আসছে বহু মেরু। এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থাকবে দুটি বৃহত্তম শক্তি হিসেবে। কিন্তু কেউই একক আধিপত্য বিস্তার করবে না। ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণ বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে—এমনটা অবধারিত হয়ে উঠবে না, যদি অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালী দেশগুলো বৈশ্বিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করার দায় আরও বেশি করে নেয়।
দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবন ও কাজের ধরন আমূল বদলে দেবে। এটি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহৃত হবে, তার ওপর নির্ভর করবে ক্ষমতা ও সম্পদ আরও কেন্দ্রীভূত হবে, নাকি জ্ঞান ও উৎপাদনশীলতার প্রবেশদ্বার খুলে যাবে। অনুবাদ, শিক্ষা সহায়তা, দ্রুত সমস্যার সমাধান—এসবের মাধ্যমে দীর্ঘদিন অভিজাত নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, বিশ্বায়ন শেষ হয়ে যাচ্ছে না; তার রূপ বদলাচ্ছে। কেবল দক্ষতার জন্য নির্মিত দীর্ঘ ও ভঙ্গুর সরবরাহ শৃঙ্খলের জায়গায় আসছে সংক্ষিপ্ত ও স্থিতিস্থাপক ব্যবস্থা। আজকের উন্নয়নশীল দেশগুলো আর কেবল ধনী বাজারে রপ্তানির ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধির আশা করতে পারে না; তাদের আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে, বাণিজ্যের আঞ্চলিক বাধা ভাঙতে হবে।
● ইউয়েন ইউয়েন অ্যাং জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ