
১৫ জুন ইভিওঁ লা বাঁ–তে জি-৭ নেতারা যখন মিলিত হচ্ছেন, তখন তাঁদের সামনে এক স্পষ্ট সত্য দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই সত্যটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার যুগ শেষের পথে। জাতিসংঘ, ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যান্য স্তম্ভ—সবই গড়ে উঠেছিল এই বিশ্বাসে যে কিছু সর্বজনগ্রাহ্য নিয়মের ভিত্তিতেই বিশ্ব শাসন সম্ভব।
বহু দশক ধরে এই কাঠামো আপেক্ষিক স্থিতি ও অর্থনৈতিক সংহতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবী আর সেই সরল সমীকরণে আটকে নেই। এখন বিশ্ব বহু মেরুতে বিভক্ত, ডিজিটালভাবে অদৃশ্য সুতায় বাঁধা আর রাজনৈতিকভাবে বহুবর্ণে বিভক্ত। ফলে শুধু সর্বসম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ব পরিচালনা আর সম্ভব নয়।
জি-৭–এর সামনে মূল প্রশ্নটি হলো এই নতুন ব্যবস্থাকে তারা নেতৃত্ব দেবে, নাকি ক্ষমতার কাঁচা রাজনীতি সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে? অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অনেকাংশে মিল থাকা রাজনৈতিক মূল্যবোধ—এই সব মিলিয়ে জি-৭ এই রূপান্তরের পথপ্রদর্শক হতে পারে। তবে তার জন্য নিজেদের ভাবনার কাঠামো বদলাতে হবে।
জাতীয় স্বার্থ ক্রমেই আলাদা পথে হাঁটছে। অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এখন সহযোগিতার বদলে চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। তারই ফল হিসেবে তৈরি হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলগত জোট। ঠিক সেই সময়েই জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশ্বিক সংকট দ্রুততর হচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মেলাতে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় পুরোনো ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে থাকা কিংবা স্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে মেনে নেওয়া—দুটোর কোনোটাই সমাধান নয়। প্রয়োজন এক নতুন পথ। সেই পথ হলো জোটভিত্তিক শাসনব্যবস্থা।
আসলে এই পরিবর্তন নীরবে শুরু হয়ে গেছে। সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ থেকে শুরু করে জলবায়ু বা নিরাপত্তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশগুলো এখন নির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক জোটে কাজ করছে। এই নমনীয় সহযোগিতা ভাঙা অথচ গভীরভাবে সংযুক্ত এক নতুন পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।
তাই জি-৭–এর সামনে মূল প্রশ্নটি হলো এই নতুন ব্যবস্থাকে তারা নেতৃত্ব দেবে, নাকি ক্ষমতার কাঁচা রাজনীতি সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে? অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অনেকাংশে মিল থাকা রাজনৈতিক মূল্যবোধ—এই সব মিলিয়ে জি-৭ এই রূপান্তরের পথপ্রদর্শক হতে পারে। তবে তার জন্য নিজেদের ভাবনার কাঠামো বদলাতে হবে।
প্রথমেই সর্বসম্মতির মোহ ছাড়তে হবে। কারণ, আজকালকার দিনে সর্বসম্মতি অনেক সময় অচলাবস্থার জন্ম দেয়। আর কোনোমতে চুক্তি হলেও তার বাস্তবায়ন হয় খণ্ডিতভাবে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি তার স্পষ্ট উদাহরণ। সেখানে লক্ষ্য ঠিক হলেও দেশভেদে দায়বদ্ধতা আলাদা এবং প্রয়োগও দুর্বল দেখা গেছে। একই চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল শাসন, করনীতি, বাণিজ্য ও অভিবাসন ক্ষেত্রেও। এই জায়গায় জোটভিত্তিক শাসন বাস্তবসম্মত বিকল্প। এখানে সবার একমত হওয়া জরুরি নয়। বরং নির্দিষ্ট সমস্যায় আগ্রহী দেশগুলো একত্র হয়ে কাজ করবে, যৌথ মানদণ্ড তৈরি করবে, নজরদারি ও প্রয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেই এই মডেল কার্যকর হতে পারে। দেশগুলো একত্র হয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারে, তথ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম গড়তে পারে, সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নজরদারি রাখতে পারে এবং ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা করতে পারে। এই জোটের বাজার, আর্থিক কাঠামো বা গবেষণা নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার পেতে হলে সেই মানদণ্ড মানতেই হবে। একই সূত্র জলবায়ু, বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জৈবপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এতে বহুপাক্ষিকতা পরিত্যাগ করা হচ্ছে না, বরং তাকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু কাঠামো বদলালেই হবে না, শাসনের ধরনও বদলাতে হবে। আজকের বড় সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, অথচ সরকারগুলো এখনো আলাদা খোপে সেগুলোকে সামলাতে চায়। এতে সমাধান আসে না। বাণিজ্যনীতি পরিবেশ বা প্রযুক্তি নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। আর্থিক নীতিতে জলবায়ু ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির হিসাব রাখতে হবে। ডিজিটাল শাসনে উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার ভারসাম্য জরুরি।
জি-৭ চাইলে এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব নিতে পারে। খাদ্য, পানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল মানবাধিকার কিংবা জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও শিল্প রূপান্তরের মতো আন্তসম্পর্কিত বিষয়গুলোকে একসঙ্গে রেখে জোট গড়া যেতে পারে। সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিরাপত্তা সংস্থা, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে, যাতে নীতিগুলো আলাদা না থেকে সমন্বিতভাবে এগোয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার সাফল্যের সংজ্ঞায়। এত দিন জিডিপি বৃদ্ধিই ছিল উন্নতির প্রধান মাপকাঠি। কিন্তু বাস্তব বলছে, জিডিপি বাড়লেও অনিশ্চয়তা, সামাজিক ভাঙন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আস্থার সংকট এবং পরিবেশের ক্ষয় একসঙ্গে বাড়তে পারে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা কোনো একক শক্তি বা মডেলের ওপর দাঁড়াবে না। বরং তা হবে নানা ইস্যুভিত্তিক, আংশিকভাবে একে অপরের সঙ্গে মিলে থাকা জোটের সমষ্টি। চ্যালেঞ্জ একটাই—এই জোটগুলো যেন সংঘাত না বাড়িয়ে বরং একে অপরকে শক্তিশালী করে।
● ডেনিস জে স্নোয়ার গ্লোবাল সলিউশনস ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির সাবেক সভাপতি
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ