
ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলের সমুদ্রপথ আজ একেকটি মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে প্রতিদিনের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি প্রতিটি সংঘাত এবং সুয়েজ ক্যানালের পরিবর্তে কেপ অব গুড হোপ হয়ে জাহাজের পথ পরিবর্তন—এসবের প্রতিটিই জ্বালানি বিল, খাদ্যের দাম ও মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তবে যে বিষয়টি তুলনামূলক কম আলোচিত হচ্ছে তা হলো—এই বহুমুখী সংকটের সবচেয়ে কঠিন ধাক্কাগুলো যাদের সামলাতে হচ্ছে, সেই পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসর একই সময়ে নিজেদের সীমানাতেও নতুন করে উত্তেজনা সামাল দিচ্ছে। দেশগুলোর সীমান্তে যথাক্রমে ভারত, গ্রিস ও ইসরায়েলের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে। এর পাশাপাশি সুদান ও লিবিয়ার অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, ইরান নিজেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ। ফলে এই যুদ্ধে সরাসরি কোনো পক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও এই তিনটি দেশকে একসঙ্গে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হচ্ছে: সাগরে অর্থনৈতিক ফ্রন্ট এবং স্থলে নিরাপত্তা ফ্রন্ট।
এর সমীকরণটি অত্যন্ত সহজ। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ব্যাপক প্রভাব থাকায় তেলবাহী ট্যাংকার আক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি হিসাব করেই সেগুলোতে বিমার খরচ নির্ধারণ করছেন বিমাকারীরা। অন্যদিকে, হুতি বাহিনী ধুবাব অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করার পর বাব আল-মানদেব প্রণালি ব্যবহারের ঝুঁকি ও খরচ বাড়িয়ে দিয়েছেন জাহাজ মালিকেরা। আর মিসরের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎস সুয়েজ ক্যানালের রাজস্ব আয় কমে গেছে ৬০ শতাংশের বেশি।
এই দেশগুলোর কারোরই নতুন কোনো ধাক্কার প্রয়োজন ছিল না। ফলে এই যুদ্ধ এমন সময়ে পুরোনো ক্ষতগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে, যখন প্রতিটি দেশই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের সীমান্তের ওপর নজর রাখছিল।
পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ৯০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। এই যুদ্ধে পাকিস্তান একদিকে যেমন সব পক্ষের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে তেমনি আফগানিস্তানের সঙ্গে সক্রিয় সীমান্ত সংঘাত এবং ভারতের সঙ্গে গত বছরের সংক্ষিপ্ত উত্তেজনা সামলাতে বাধ্য হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নেমে এলেও তা আগস্টের মধ্যে আবারও ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় মূলত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে।
পাকিস্তান কেবল একটি নয়, বরং তিনটি সীমান্ত সামলাচ্ছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এখনো ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতকে একটি সক্রিয় ঝুঁকি হিসেবে দেখে। একদিকে ভারতের সঙ্গে গত বছরের চার দিনের পাল্টাপাল্টি হামলা, অন্যদিকে আফগানিস্তানের সঙ্গে ডুরান্ড লাইন বরাবর লড়াই—এসবের মাঝেই ইসলামাবাদকে ইরানের ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, তুরস্কের প্রধান ঝুঁকি লুকিয়ে আছে জ্বালানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। আঙ্কারা বছরের পর বছর ধরে নিজেকে ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার মধ্যে একটি সেতু হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে—যে কৌশলটি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে মূল্যস্ফীতি ৮৫ শতাংশ থেকে কমে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি এলেও তা জ্বালানি ও খাদ্যের চড়া দামের কারণে আবার বাড়তে শুরু করেছে। আঙ্কারার এই সমুদ্রভিত্তিক সেতু হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশেই যুক্ত হয়েছে গ্রিসের সঙ্গে তাদের পুরোনো বিরোধের পুনরুত্থান।
ইসরায়েলের সঙ্গে গ্রিসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আঙ্কারাকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে। ২০২৩ সালের ‘এথেন্স ডিক্লারেশন’-এর পর যে সামান্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তাকে পেছনে ফেলে ইজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোতে গ্রিক সেনা মোতায়েনকে তুরস্ক একটি সরাসরি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করছে।
তিনটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ভৌগোলিক ক্ষতির মুখে পড়েছে মিসর। যে সুয়েজ খাল থেকে হুতি হামলা শুরু হওয়ার আগের বছর ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল, সাম্প্রতিক অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে। ২০২৩ সালে ৩৮ শতাংশের শীর্ষ অবস্থান থেকে লড়াই করে নামিয়ে আনা মূল্যস্ফীতি এ বছরের গ্রীষ্মেই আবার ১৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
কিন্তু সুয়েজ খালের পতনই কায়রোর একমাত্র চিন্তা নয়। পূর্বে সিনাই উপদ্বীপের সামরিকীকরণ নিরসন অঞ্চল নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা কয়েক মাস ধরেই বাড়ছে।
যদিও গাজা থেকে সিনাইয়ে ফিলিস্তিনিদের গণবাস্তুচ্যুতির সম্ভাবনা আপাতত কমেছে বলে মনে হচ্ছে, তবে কিছু চরমপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রীর মাথায় তা এখনো জীবিত রয়েছে।
দক্ষিণ ও পশ্চিমে পরিস্থিতি মোটেও শান্ত নয়। সুদানের গৃহযুদ্ধ এখন পুরো উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার জন্য সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পোর্ট সুদান এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে লিবিয়ার রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা মিসরের পশ্চিম সীমান্তে আরেকটি বড় নিরাপত্তাঝুঁকি।
মিসর ও লিবিয়া এই জ্বালানিসংকটে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ জ্বালানির দাম বাড়লেই তা খুব দ্রুত সামাজিক অসন্তোষে রূপ নেয়। তা ছাড়া সুদান ও সোমালিয়ার অস্থিতিশীলতা কায়রোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
এই সবকটি ঘটনাকে আলাদা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এগুলো একটি সুনির্দিষ্ট সংকটের রূপ। হরমুজ, বাব আল-মানদেব এবং সুয়েজ খালের অস্থিতিশীলতার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিককে।
প্রতিটি অর্থনৈতিক ধাক্কা এসে পড়ছে এমন সব রাষ্ট্রের ওপর, যারা ইতিমধ্যেই নিজেদের সীমান্তে নতুন করে নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত। পাকিস্তান ভারত ও আফগানিস্তানের চাপের মাঝখানে থেকে ইরানের যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছে; তুরস্ক ইউরোপের সেতু হতে গিয়ে ন্যাটো সহযোগী গ্রিসের সঙ্গে ইজিয়ান সাগরে উত্তেজনায় কাটাচ্ছে; আর মিসর ইসরায়েল ও উত্তর আফ্রিকার অস্থিতিশীলতার মাঝখানে পুরোপুরি কোণঠাসা।
আসল আশঙ্কা কোনো একক পণ্যের দাম বৃদ্ধি, সাময়িক শিপিং জট বা সীমান্ত সংঘাত নিয়ে নয়—আসল আশঙ্কা হলো এই অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক ধাক্কাগুলো একই সঙ্গে এসে আঘাত হানছে এমন কিছু রাষ্ট্রের ওপর, যেগুলো যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই চরম সংকটের মধ্যে ছিল।
শাদি ইব্রাহিম ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সহযোগী। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।