
বাংলাদেশের সামনে নতুন দরজা খুলছে। কিন্তু সব দরজা দিয়ে ঢুকতে হবে, এমন নয়। কোথায় লাভ, কোথায় নতুন দায়—সেই হিসাব-নিকাশ আগে দরকার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পটভূমিতে সরকারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার
২০১৩ সালের মার্চে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের সময় বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি হরতাল ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে বাতিল হয়ে যায়। ৪ মার্চ ভারতের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত ‘প্রণব মুখার্জি ভিজিট রানস ইনটু বাংলাদেশ টারময়েল, খালেদা জিয়া ক্যানসেলস মিট’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সাংবাদিক স্বরাজ থাপা বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। বৈঠকটি বাতিলের ঘটনায় দিল্লিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল।
১৩ বছর পর সেই ঘটনা নিয়ে কে ঠিক বা কে ভুল ছিলেন, সেই বিচার এ লেখার বিষয় নয়। বরং ঘটনাটি মনে করার কারণ হলো, ২০১৩ সালের বিএনপি আর ২০২৬ সালের বিএনপি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাই প্রশ্ন শুধু তারেক রহমান ভারতে যাবেন কি না, তা নয়। এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বদলে যাওয়া এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে যাবে, আর তিনি সেটি কীভাবে এগিয়ে নেবেন?
গত কিছুদিনের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, দুই দেশই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়; কিন্তু সেই সম্পর্কের শর্ত নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। গত ২১ আগস্ট রয়টার্স ‘নো ডিসিশন ইয়েট অন বাংলাদেশ পিএমস ভিজিট টু ইন্ডিয়া, ঢাকা সেজ’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহকে উদ্ধৃত করে জানায়, তারেক রহমানের ভারত সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। ২২ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের ‘নো রাশ ফর পিএমস ভিজিট টু ইন্ডিয়া: হুমায়ুন’ প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ভারতের সঙ্গে ভালো ও কার্যকর সম্পর্ক দরকার, তবে জাতীয় স্বার্থ বাদ দিয়ে নয়।
এরপর ২৩ আগস্ট দিল্লি থেকেও একই ধরনের কথা আসে। ‘দিল্লি-ঢাকা চিল: জয়শঙ্কর ফ্ল্যাগস মিউচুয়াল ইন্টারেস্টস, কমন গ্রাউন্ড’ শিরোনামে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, প্রতিবেশীরা শুধু ভারতের স্বার্থ দেখবে, এটা ঠিক নয়। ভারতকেও তাদের স্বার্থ বুঝতে হবে। সম্পর্ক ভালো রাখতে হলে দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য দরকার।
তাহলে ছবিটা কী দাঁড়াল? ঢাকা বলছে, বাংলাদেশের স্বার্থ দেখতে হবে। দিল্লি বলছে, দুই দেশের স্বার্থই দেখতে হবে। অর্থাৎ প্রশ্ন এখন সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না, তা নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কী চায়, ভারত কী চায় আর কোথায় দুই দেশের চাওয়া মেলানো সম্ভব। সম্ভবত ২০২৬ সালের নতুন হিসাব এখান থেকেই শুরু।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশে বাংলাদেশ, দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত আর বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের বিকল্প যত বাড়বে, দিল্লির সঙ্গে দর-কষাকষির জায়গাও বাড়তে পারে। কিন্তু ভারতকে চাপ দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে সেই বিকল্পকে ব্যবহার করলে উল্টো ফল হতে পারে।
সম্ভবত আছে। কারণ, বাংলাদেশ এখন শুধু দিল্লির দিকে তাকিয়ে নেই। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে। সৌদি আরব বড় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন পর নতুন করে যোগাযোগ হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক আছে।
সিঙ্গাপুরের ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ’-এর গবেষক ইমরান আহমেদ ২৩ জুলাই ২০২৬ ‘রিক্যালিব্রেটিং ফরেন পলিসি: ইমপ্লিকেশনস অব তারেক রহমানস চায়না ভিজিট’ শিরোনামের বিশ্লেষণে একে বাংলাদেশের ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ হিসেবে দেখেছেন। সহজ কথায়, কোনো এক দেশের দিকে পুরোপুরি না ঝুঁকে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ দেখা। তবে তাঁর সতর্কতা হলো নতুন সম্পর্ক যেন আবার নতুন নির্ভরতা তৈরি না করে।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশে বাংলাদেশ, দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, আর বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান। নদী, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তায় দুই দেশ একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। তাই ভারতের যেমন বাংলাদেশকে দরকার, বাংলাদেশেরও ভারতকে দরকার।
কিন্তু নতুন সুযোগ এসেছে বলে ভৌগোলিক অবস্থান বদলে যায়নি। চীন বড় অর্থনৈতিক অংশীদার, কিন্তু তিস্তার উজানে চীন নেই। সৌদি আরব বড় শ্রমবাজার, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়। তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগী হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের নদী তুরস্ক থেকে আসে না। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়তে পারে, কিন্তু সেটিও পাশের দেশ নয়। তাই বাংলাদেশের বিকল্প বেড়েছে, কিন্তু ভারত কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। একইভাবে দিল্লিরও মনে করা ঠিক হবে না যে বাংলাদেশের আর কোনো বিকল্প নেই, শেষ পর্যন্ত তাকে ভারতের কাছেই আসতে হবে।
এখানেই তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি। শেখ হাসিনার বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরেকটি বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। তাই এটিকে শুধু কূটনৈতিক দর-কষাকষির একটি ‘তাস’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব ছোট হয়ে যায়।
১৬ আগস্ট রয়টার্স ‘বাংলাদেশ সেজ বেটার এনভায়রনমেন্ট নিডেড ফর ইন্ডিয়া ভিজিট অ্যামিড রিফট ওভার আউস্টেড লিডার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধকে দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পেয়েছে এবং নিজের আইনি কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি দেখছে।
২১ আগস্ট রয়টার্স আবার জানায়, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে ঢাকা। ২২ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি নতুন কোনো শর্ত নয়; এটি দুই দেশের চলমান আলোচনার অংশ এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও অনুভূতির সঙ্গেও যুক্ত।
২৩ আগস্ট জয়শঙ্করকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। এই নীরবতার অর্থ কী, তা নিয়ে অনুমান না করাই ভালো। কূটনীতিতে সব কথা প্রকাশ্যে বলা হয় না, এটুকুই বলা যায়।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এখানেও ভারসাম্য দরকার। শেখ হাসিনা ইস্যু পুরো বাদ দিয়ে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দেশের মানুষের বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আবার বাংলাদেশের পুরো ভারতনীতিকে যদি শুধু শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার প্রশ্নে আটকে রাখা হয়, তাহলে তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ও আটকে যাবে। অর্থাৎ বিচারের দাবি চলবে, আবার রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় যোগাযোগও রক্ষা করতে হবে; একটির জন্য অন্যটি পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি নয়।
মালদ্বীপের একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এখানে সীমিতভাবে কাজে লাগে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামদ মুইজ্জু ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের সরানোর কথা বলেছিলেন। এতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। পরে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সামরিক সদস্যদের জায়গায় বেসামরিক প্রযুক্তিবিদ রাখার ব্যবস্থা করে। এরপর ২০২৪ সালের অক্টোবরে মুইজ্জু দিল্লি সফর করেন এবং অর্থনীতি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা এগিয়ে নেন।
শেখ হাসিনার ইস্যু অবশ্য মালদ্বীপের ওই বিরোধের মতো নয়। এখানে বিচার ও জবাবদিহির বিষয় অনেক বেশি গুরুতর। মালদ্বীপের উদাহরণ শুধু এটুকু দেখায় যে বড় বিরোধ থাকলেও দুই রাষ্ট্রের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা যায়। বাংলাদেশের জন্য কঠিন কাজ হলো, বিচারের দাবি, ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থ—তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলানো।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আরেকটি বড় বিষয় হলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। বড় প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া শুধু সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সংসদ, প্রতিরক্ষানীতি ও মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ জড়িত। আজ একটি সরকার যে নিরাপত্তা দায় নেবে, কাল অন্য সরকারকেও তা বহন করতে হতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক লাভের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মূল্যও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে নতুন দরজা খুলছে। কিন্তু সব দরজা দিয়ে ঢুকতে হবে, এমন নয়। কোথায় লাভ, কোথায় নতুন দায়—সেই হিসাব-নিকাশ আগে দরকার। সাম্প্রতিক উদাহরণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট তিন দেশ এই চুক্তি করে। চুক্তির মূলকথা, একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে। ২৩ আগস্ট নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ‘বাংলাদেশ ওপেন টু জয়েনিং সৌদি অ্যারাবিয়া-পাকিস্তান-তুরকিয়ে ডিফেন্স প্যাক্ট, মিনিস্টার্স সে’ শিরোনামে জানায়, বাংলাদেশ এতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে; তবে সিদ্ধান্ত হবে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়।
এখানে ভারত কী ভাববে, তা প্রথম প্রশ্ন বা বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী পাবে, কী দায় নেবে? সৌদি আরব বড় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ আছে, পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখাও বাংলাদেশের অধিকার। কিন্তু ভালো সম্পর্ক আর যৌথ নিরাপত্তার দায় এক কথা নয়। বন্ধুদেশের সঙ্গে ব্যবসা করা এক কথা, কিন্তু বন্ধুদেশের সব ঝামেলায় নিজের নাম জড়ানো আরেক কথা।
তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দরকার। বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা কী করবে? পাকিস্তান-ভারত সংঘাত হলে বাংলাদেশের দায়িত্ব কী হবে? মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধ হলে কোনো পক্ষ নিতে হবে কি না? আর ৫ বা ১০ বছর পর পরিস্থিতি বদলালে বাংলাদেশ কি নিজের অবস্থান বদলাতে পারবে? জোটে ঢোকার আগে ঢোকার দরজার সঙ্গে বের হওয়ার দরজাটাও দেখতে হবে।
এখানেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ ধারণাটি কাজে আসে। সহজ বাংলায়, কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং নিজের সিদ্ধান্তের জায়গা ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ড্যারেন লিম ও রোহান মুখার্জি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অব দ্য এশিয়া-প্যাসিফিক সাময়িকীতে তাঁদের ‘হেজিং ইন সাউথ এশিয়া: ব্যালান্সিং ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি ইন্টারেস্টস অ্যামিড সাইনো-ইন্ডিয়ান কম্পিটিশন’ গবেষণায় শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের অভিজ্ঞতায় দেখিয়েছেন, ছোট রাষ্ট্র বড় শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে সুবিধা নিতে পারে; কিন্তু এক দিকে বেশি ঝুঁকলে নিজের পরিসরও ছোট হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আরেকটি বড় বিষয় হলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। বড় প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া শুধু সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সংসদ, প্রতিরক্ষানীতি ও মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ জড়িত। আজ একটি সরকার যে নিরাপত্তা দায় নেবে, কাল অন্য সরকারকেও তা বহন করতে হতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক লাভের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মূল্যও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের বিকল্প যত বাড়বে, দিল্লির সঙ্গে দর-কষাকষির জায়গাও বাড়তে পারে। কিন্তু ভারতকে চাপ দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে সেই বিকল্পকে ব্যবহার করলে উল্টো ফল হতে পারে। দিল্লি তখন বাংলাদেশের নতুন সম্পর্কগুলোকে নিজের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে দেখতে পারে। দর-কষাকষির শক্তি আর কাউকে কোণঠাসা করা এক কথা নয়।
তারেক রহমানের পরীক্ষাটা তাই খুব সহজ নয়। শত্রু নয়, নতুন বন্ধু তৈরি করতে হবে। সুযোগ নিতে হবে, কিন্তু এমন দায় নয়, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের হাত বেঁধে দেবে। দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, আবার অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার স্বাধীনতাও থাকবে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর আসল পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।
● মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
* মতামত লেখকের নিজস্ব