নির্বাচনে যাঁদের ভোট পেয়েছেন ও যাঁদের পাননি—সবার অভিভাবক আপনারা।
নির্বাচনে যাঁদের ভোট পেয়েছেন ও যাঁদের পাননি—সবার অভিভাবক আপনারা।

আলতাফ পারভেজের কলাম

বিএনপির কর্মীরা বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন কি 

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী কর্মী-সংগঠক বন্ধুদের অভিনন্দন।

সরকারের সাংগঠনিক ভিত্তি হিসেবে আপনারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। আগেও আপনাদের দল অন্তত চারবার নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৫০ ভাগ এবং দুই শতাধিক সংসদীয় আসন পেয়েছে। দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এখন আপনাদের সঠিক ভাবনা ও পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।

নাগরিক হিসেবে স্বস্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আপনাদের মুখাপেক্ষী হওয়ার বিকল্প নেই। এই চিঠি তার বিনীত ব্যক্তিগত প্রকাশ। নির্বাচনে যাঁদের ভোট পেয়েছেন এবং যাঁদের পাননি—সবার অভিভাবক আপনারা। দল যার যার হলেও—সরকার সবার। অন্তত হওয়ার কথা। হওয়া প্রয়োজন।

পণ্ডিতেরা না চাইলেও এ দেশে সরকার ও দল একাকার হয়ে যায়—সুতরাং আপনারাই নাগরিকদের একমাত্র পোস্ট অফিস। উপরন্তু এ দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা ও তার অনুশীলন এমন, কোনো দলের ১৫০-এর বেশি আসন পাওয়া মানে বিরোধী দল কাগুজে বাঘে পরিণত হওয়া। তখন সরকার যা চায়, যেভাবে চায় সংসদে সেভাবে ‘হ্যাঁ’-‘না’ জয়যুক্ত হয়। ইতিহাস বলছে, এর পরিণতি সুখকর নয়।

অতীতে যখন এ দেশ বিরোধী দলশূন্য ছিল বা তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি—তখন সরকার বিপদে পড়েছে, দেশবাসীও মুশকিলে পড়েছে।

পুরোনো শাসক দলের কর্মী-সংগঠক হিসেবে আপনাদের জানা, বাংলাদেশে প্রশাসনতন্ত্রের যা চরিত্র, তাতে এটা সত্যি যে তাঁরা মাঠের প্রকৃত বাস্তবতা জানানোর সাহস রাখেন না—হয়তোও চানও না। এ রকম অবস্থায় প্রান্ত থেকে হরেক বিষয়ে বিরোধী দলের চিৎকার-চেঁচামেচি সরকারের মেঠো বাস্তবতা জানা-বোঝার কাজ এগিয়ে দেয়।

এভাবে গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের সুরক্ষার কাজ করে। আমাদের ‘ঐতিহ্য’ সে রকম নয়। বারবার যে এ দেশে সরকার অমর্যাদাকর ও সহিংস পথে বিদায় নেয়, তার কারণ সবল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের অভাব বা সেভাবে বিরোধীদের কাজ করতে না দেওয়া। আবার আমরা সেই ধরনের শঙ্কার মুখে পড়ছি কি না—আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখছি।

বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে ডজন ডজন এয়ারবাস ও বোয়িং বিমান দরকার নাকি কৃষি, পোলট্রি, মৎস্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার—সেটা আপনাদেরই সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা। এমপি-মন্ত্রীদের সেসব জানাতে পারেন আপনারা। এসব বিষয়ে নিজেদের কথা এখনই জেলা, উপজেলা কমিটির বৈঠকে জানান।

এটা সত্য, ভোটে এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার রায় পেয়েছে বিএনপি। কিন্তু দলের নীতিনির্ধারকেরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে নিচ্ছেন কি না, সেটা মূল্যায়ন ও পুনর্ভাবনার দায়িত্ব আপনাদের। দলহীন নাগরিক সমাজের সেসব মূল্যায়ন শেষে সচিবালয় বা জাতীয় সংসদে পৌঁছানোর কার্যকর কোনো রাস্তা নেই। এ ক্ষেত্রে আপনাদেরই গঠনমূলক বিরোধী দলের হিম্মত দেখাতে হবে।

এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত, পছন্দ, অপছন্দ—সবই ওপর থেকে আসে। ছোট একই গ্রুপ বা গোষ্ঠীই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতীয় সিদ্ধান্ত নেয়। এ রকমভাবে নেওয়া সিদ্ধান্তে কোনো খারাপ ফল এলে অন্য সবার সঙ্গে বিপদে পড়েন শাসক দলের কর্মীরাও।

২০২৪-এ ক্ষমতাচ্যুত শাসকদের সব সিদ্ধান্তে নিশ্চয়ই তাদের মেঠো কর্মীদের মতামত রাখার সুযোগ ছিল না। কিন্তু নিদারুণভাবে সেই শাসন-সংস্কৃতির ভুক্তভোগী এখন তাঁরা। কবে তাঁদের এই ভোগান্তি কাটবে, কেউ জানে না। অথচ তাঁদের ‘নেতা’রা ইউরোপ-আমেরিকায় খারাপ নেই। এ থেকে পরবর্তীকালের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে।

আবার একই অবস্থা তৈরি হতে না দেওয়ার উপায় হলো শাসক দলের কর্মীদের প্রতিনিয়ত স্বাধীন মতামত তুলে ধরা। সরকারি কাজে ভুল হলে আগেভাগে নীতিকর্তাদের থামতে প্ররোচিত করা এবং পারলে থামানো।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যে এমন এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গেছে—শাসক দলের সিদ্ধান্তের জন্য কর্মীদের ভয়ংকরভাবে দায় মেটাতে হয়। সুতরাং দলের সবকিছুকে প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন করে গেলে তা হবে আত্মঘাতী। নিশ্চয়ই আজ ও আগামী দিনের কোনো শাসক দলের কর্মীরা বিগত ক্ষমতাচ্যুত দলটির কর্মীদের মতো পালিয়ে বাঁচতে চাইবেন না। সে জন্য প্রয়োজন দলীয় নেতৃত্বকে জবাবদিহির চাপে রাখা। এটা নিজস্ব রাজনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থেও কর্তব্য হয়ে উঠেছে। ইতিহাস আমাদের সে রকম নতুন এক অধ্যায়ে নিয়ে এসেছে।

কথাটা রূঢ় শোনাবে হয়তো, রাজনীতিবিদেরা রাজনীতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে ফেলেছেন। ফলে রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এখন দলীয় ঊর্ধ্বতনদের কাজকর্ম নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন থাকা ও প্রকাশ করা দরকার। আওয়ামী লীগ-উত্তর সময়ের বড় শিক্ষা হলো অন্ধ ‘সহমতে’র চেয়ে সৎ ভিন্নমত বেশি নিরাপত্তাদায়ী।

গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার আইন কিংবা সম্ভাব্য সাইবার আইন নিয়ে কি আপনারা আরেকবার ভাববেন না? এসব আইন ক্ষমতার পালাবদল হলেও থাকবে! যেভাবে আপনাদের অতীত সরকারের তৈরি র‍্যাব পরের আমলে থেকেছিল এবং তার পার্শ্বফল আপনারা ভালোভাবে টের পেয়েছেন।

বিএনপি সরাসরি ভোটে দুই শর বেশি আসন পেয়েছে। সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে বিপুল এমপি আপনাদের। কিন্তু সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্বে অনির্বাচিতরাও আছেন। বিদেশফেরত অনেকেও আছেন। এটা এ দেশে নতুন ঐতিহ্য নয়। যদি নীতিনির্ধারক কারও সমাজের সঙ্গে দীর্ঘকালের নিবিড় সম্পৃক্ততা না-ও থাকে, সেটা পুষিয়ে দিতে পারেন মাঠপর্যায়ের কর্মী-সংগঠক-সহযোগী আপনারা। তৃণমূলে সক্রিয় থাকার কারণে আপনারা জানেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য কোন পদক্ষেপ আগে নেওয়া দরকার।

বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে ডজন ডজন এয়ারবাস ও বোয়িং বিমান দরকার নাকি কৃষি, পোলট্রি, মৎস্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার—সেটা আপনাদেরই সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা। এমপি-মন্ত্রীদের সেসব জানাতে পারেন আপনারা। এসব বিষয়ে নিজেদের কথা এখনই জেলা, উপজেলা কমিটির বৈঠকে জানান।

নিশ্চয়ই আপনারা দেখেছেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সম্প্রতি বেশ নিম্নমুখী। খবরগুলো ছোট হলেও বৃহৎ বার্তা থাকে তাতে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে এ বছর বাংলাদেশ এক ধাক্কায় ৫৫ ধাপ পড়ে গেছে। নারীরা আমাদের জনসংখ্যার ৯-১০ কোটি। তাদের দুরবস্থা বাড়া মানে পুরো দেশের সমৃদ্ধি কমা। আপনাদের বহুল আলোচিত ‘৩১ দফা’র ২৩তম দফার সঙ্গে এই সংবাদ একদম মিলছে না।

গেল সপ্তাহেই বিশ্বব্যাংক জানাল, দারিদ্র্যসীমার কাছে কোনোভাবে টিকে আছে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ—যারা যেকোনো অর্থনৈতিক সমস্যায় নিচে পড়ে যেতে পারে। বাড়তি বিপদের কথা—চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক সঙ্গে এ-ও বলছে, ২০২৬ সালে ২১ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়ে গেছেন।

বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব প্রতিবেদন দেশের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই দেখছেন। বিরোধী দলের নেতারাও হয়তো দেখছেন। সংসদের আলাপ-আলোচনা-সিদ্ধান্তে তার ছাপ আছে কি?

বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমান দারিদ্র্য হার ও ভবিষ্যতের উদ্বেগজনক দারিদ্র্য-শঙ্কা কমাতে বাংলাদেশের দরকার বিপুল কর্মসংস্থান। কিন্তু সরকার গত আট মাসে খরচপাতির বড় খাতা খুলল মেট্রোরেল, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন ও উড়োজাহাজ কেনায়। মাঠের চাহিদার সঙ্গে এসব বাস্তব অগ্রাধিকারের ঠিকঠাক মিলছে কি? শাসক দলের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কর্মী হিসেবে আপনাদের কাছেই আমরা এসব জানতে চাইব!

৩ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন আপনাদের। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কর্মচারী কত, আর বেকার তরুণ-তরুণী, শ্রমিক-কৃষক কত—সেসব বিশ্লেষণ নিশ্চয়ই আপনারা করবেন।

এ-ও আপনাদের সুচিন্তিত বিবেচনার জন্য পেশ করছি, রেল থেকে বন্দর—সব যদি বিদেশি ও বেসরকারি খাতে পরিচালনার জন্য দিতে হয়, তাহলে এত বৃহৎ মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর খরচপাতি কেন বইবে দেশবাসী। শুরুতে ছোট মন্ত্রিসভার কথা শোনা গেলেও ইতিমধ্যে সেটা ৫০ অতিক্রম করেছে। আছেন আরও অনেক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী। নেপালে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেশে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ১৮-তে নামিয়ে ফেলেছিল। তাতে রাজস্ব খরচ কমার পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাড়তি গতি এসেছে।

এসব বিষয়ে না হোক, গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার আইন কিংবা সম্ভাব্য সাইবার আইন নিয়ে কি আপনারা আরেকবার ভাববেন না? এসব আইন ক্ষমতার পালাবদল হলেও থাকবে! যেভাবে আপনাদের অতীত সরকারের তৈরি র‍্যাব পরের আমলে থেকেছিল এবং তার পার্শ্বফল আপনারা ভালোভাবে টের পেয়েছেন।

আমরা জানি, বুদ্ধিমানেরা অতীত থেকে শেখে আর জ্ঞানীরা অন্যের ভুল থেকে শেখে। আমাদের পেছনে ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুতদের অতীতটুকুও আছে। আর রয়েছে শুভ ভবিষ্যতের ১৭ কোটি আশাবাদ। এ রকম সবকিছু সঁপে দেওয়া আছে আপনাদের হাতে। শুভকামনা।

  • আলতাফ পারভেজ: গবেষক ও লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব